এই পাতাটি মূলগ্রন্থের অংশ নয়, এটি পর্ষদ্ প্রকাশিত বঙ্কিম শতবর্ষ সংস্কলনের মুদ্রিত বিজ্ঞানরহস্যের ভূমিকা।
বিজ্ঞানরহস্য
অর্থাৎ
বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধসংগ্রহ
ভূমিকা
‘বঙ্গদর্শন’ সম্পাদন করিতে বসিয়া বঙ্কিমচন্দ্রকে সব্যসাচীর মত উপন্যাস ও প্রবন্ধাস্ত্র নিক্ষেপ করিতে হইত। পত্রিকার একঘেয়েমিত্ব দূর করিতে হইলে বহুবিষয়িণী প্রতিভার প্রয়োজন। বঙ্কিমচন্দ্রের তাহা ছিল। ‘বঙ্গদর্শনে’র প্রথম সংখ্যা হইতেই তিনি ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব, ভাষাতত্ত্ব, সঙ্গীত, সাহিত্য-সমালোনা ও ব্যঙ্গকৌতুক স্বয়ং লিখিয়া প্রকাশ করিতে থাকেন। তিনি ইউরোপীয় বিজ্ঞানের একান্ত ভক্ত ছিলেন, সুতরাং বিজ্ঞান-বিষয়ক প্রবন্ধও বাদ দিতে পারেন নাই। প্রথম বৎসরের দ্বিতীয় সংখ্যায় (অর্থাৎ জ্যৈষ্ঠ, ১২৭৯) “বিজ্ঞান-কৌতুক” নাম দিয়া বিজ্ঞান আলোচনার সূত্রপাত সুরু হয়। পুস্তকাকারে প্রবন্ধগুলি প্রকাশিত হইবার কালে এই প্রথম নিবন্ধটিই শেষ নিবন্ধ হয়; দ্বিতীয় সংস্করণে ইহা পরিত্যক্ত হয়। দ্বিতীয় আলোচনা (জ্যৈষ্ঠ, ১২৭৯) “আশ্চর্য্য সৌরোৎপাত” ‘বিজ্ঞানরহস্যে’র প্রথম প্রবন্ধ। “আকাশে কত তারা আছে?” ১২৭৯ সালের অগ্রহায়ণ মাসে, এবং “ধূলা” ঐ সালের ফাল্গুন মাসে বাহির হয়। “ধূলা” যে আকারে পুস্তকে প্রকাশিত হইয়াছে, পত্রিকায় ঠিক সেই আকারে বাহির হয় নাই, গোড়ায় একটু ভূমিকা ছিল। যথা–
আমাদিগের দেশে অন্য যে বিষয়েরই অভাব থাকুক না কেন, কেবল এক বিষয়ের অভাব নাই– বড়২ বিষয়ে ক্ষুদ্র২ প্রবন্ধ। আমাদের দেশে অন্ন বস্ত্রের অভাব আছে, কিন্তু দর্শন, বিজ্ঞান, পুরাবৃত্ত, রাজনীতি, সমাজনীতি, ও ধর্ম্মনীতি, এ সকলের অভাব নাই, চাঁদনীর চকে জুতা কিনিলে বিনামূল্যে অনায়াসে শিখিতে পারা যায়। জুতা বাঁধা কাগজ পড়িলেই হইল। স্কুলের ছেলে বিস্তর, উমেদারও অনেক; সকলের চাকরি জুটে না; কাগজ কলম ধার চাহিলে পাওয়া যায়, কেন না কেহ পরিশোধের প্রত্যাশা করে না, মুদ্রাযন্ত্র অতি সুলভ। লিখিতে হইলে ছোট বিষয়ে লেখা অযুক্তি–সুতরাং অন্ন বস্ত্রের যাদৃশ অভাব–বড়২ বিষয়ে প্রবন্ধের তাদৃশ অভাব নাই। আমাদিগের ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে বিবেচনা হইয়াছিল যে, দর্শন বিজ্ঞানাদির কথা যাহাই হউক, কাব্য সমালোচনা কিছু কঠিন; কেন না দর্শনাদি শিখিলে তদ্বিষয়ে লেখা যায়, কিন্তু কাব্যের সমালোচনা কেবল শিক্ষার বশীভূত নহে। কিন্তু আমাদিগের দেশের সৌভাগ্য যে, তাহারই কিছু ছড়াছড়ি অধিক। মা সরস্বতীর অনুগ্রহ!
দেখিয়া শুনিয়া আমরা স্থির করিয়াছি, আমরা কোন গুরুতর বিষয়ের আলোচনা করিব না। আমরা ক্ষুদ্রবুদ্ধি এবং অল্পজ্ঞান, সুতরাং গুরুতর বিষয়ের সমালোচনায় অক্ষম। কোন সামান্য বিষয় অবলম্বন করিয়া একটি প্রস্তাব লিখিব। এই প্রতিজ্ঞা করিয়া সামান্য বিষয়ের অনুসন্ধান করিতেছিলাম। অনুসন্ধান কালে আমাদের সম্মুখে একজন “ঝাড়ুদার” সম্মার্জ্জনী হস্তে, রাজপথ পরিষ্কার করিতেছিল, বড় ধূলা উড়াইতেছিল। দেখিয়া আমরা স্থির করিলাম যে, যাহার তত্ত্ব করিতেছিলাম, তাহা পাইয়াছি–আমরা ধূলা সম্বন্ধেই লিখিব। ধূলার মত সামান্য পদার্থ আর সংসারে নাই।
ভাবিলাম যে, ধূলার সম্বন্ধে অনেক নূতন কথা লিখিতে পারিব, যথা: প্রথমতঃ, ধূলায় জল ঢালিলে কাদা হয়; দ্বিতীয়তঃ, ধূলা চক্ষে গেলে কর্কর্ করে; তৃতীয়তঃ, ধূলা দাঁতে গেলে কিচ্কিচ্ করে; চতুর্থতঃ, রেইলে বড় ধূলা লাগে ইত্যাদি নানাবিধ নূতন এবং বিস্ময়জনক তত্ত্বের আবিষ্ক্রিয়া করিব, ইচ্ছা করিয়াছিলাম। সকল স্থানে রাস্তা ঘাটে ভাল জল দেওয়া হয় না বলিয়া মিউনিসিপাল কর্ম্মচারীদিগকে কিঞ্চিৎ সুসভ্য গালিগালাজ করিব, এমতও ইচ্ছা ছিল। মনে করিয়াছিলাম, কাব্যালঙ্কারেও ধূলার প্রয়োজন দেখাইতে পারিব, যথা “ধূলায় ধূসর অঙ্গ,” “ধূলায় মিশাবে দেহ” ইত্যাদি। বস্তুতঃ আমরা কল্পনা করিয়াছিলাম যে, কোন প্রকারে পাঠক মহাশয়ের “চক্ষে ধূলা” দিব। পারি ত, আপনারাও কিছু “ধূলা বাকস পাতা” উপার্জ্জন করিব।
দুর্ভাগ্যক্রমে আমাদিগের স্মরণ হইল যে, আচার্য্য টিণ্ডলও ধূলা সম্বন্ধে একটি দীর্ঘ প্রস্তাব লিখিয়াছেন। এবং তাহা পাঠ করিয়া ধূলা সামান্য তত্ত্ব বলিয়া বোধ হয় না, অতি গুরুতর এবং দুর্জ্ঞেয় বিষয় বলিয়া স্বীকার করিতে হয়। আচার্য্য স্বয়ং এক জন ইউরোপের মান্য বিজ্ঞানবিৎ মহামহোপাধ্যায়। তিনি বহুদিন অবধি পরিশ্রম করিয়া ধূলাতত্ত্বের কিয়দংশ জানিতে পারিয়াছেন। সুতরাং সামান্য বিষয় বলিয়া ধূলার উপর যে আদর হইয়াছিল, তাহার লাঘব হইল। আমাদিগের কপাল ক্রমে ধূলাও সামান্য বিষয় নহে।
“গগন পর্য্যটন”– ‘বঙ্গদর্শন’, পৌষ ১২৮৯, “চঞ্চল জগৎ”– ভাদ্র ১২৮০, “কতকাল মনুষ্য”– ফাল্গুন ১২৮০, “জৈবনিক”– কার্ত্তিক ১২৮০, “পরিমাণ রহস্য”–চৈত্র ১২৮০ ও আষাঢ় ১২৮১– “বিজ্ঞানরহস্যে’র প্রথম সংস্করণের প্রবন্ধগুলির প্রথম প্রকাশকাল এইরূপ। ঐ সংস্করণের আখ্যাপত্রে লিখিত ‘১২৭৯|৮৯ শালের বঙ্গদর্শন হইতে উদ্ধৃত’ কথাগুলি অংশতঃ সত্য, কারণ দেখিতেছি, “পরিমাণ রহস্য” প্রবন্ধের শেষাংশ ১২৮১ বঙ্গাব্দে বাহির হইয়াছে। দ্বিতীয় সংস্করণের শেষ প্রবন্ধ “চন্দ্রলোক” ১২৮১ ‘ভ্রমর’ মাসিক পত্রের চৈত্র সংখ্যায় প্রকাশিত হয়।
বঙ্কিমচন্দ্রের মন যে গতানুগতিক ছিল না, সময়ের সঙ্গে তাল রাখিয়া তিনি যে চলিতে জানিতেন, ইউরোপীয় বিজ্ঞানের এই প্রাথমিক প্রবন্ধগুলির মধ্যে তাহার পরিচয় আছে। পাশ্চাত্য বিজ্ঞান-বিষয়ে অবশ্য তাঁহার পূর্ব্বে বহু পণ্ডিত পুস্তক ও প্রবন্ধ রচনা করিয়া প্রচার করিয়াছিলেন, কিন্তু বিজ্ঞানের রহস্য এ ভাবে কেহ উদ্ঘাটিত করিয়া দেখান নাই; তাঁহারা তথ্য মাত্র প্রকাশ করিয়াছিলেন।