চন্দ্রশেখর

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

'তাহের আল-মাহদী' কর্তৃক লিখিত এই প্রবন্ধ মূল গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত নয়।

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'চন্দ্রশেখর' (১৮৭৫) বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক অনন্যসাধারণ সৃষ্টি। এটি এমন একটি উপন্যাস যা ইতিহাস, রোমান্স, এবং মনস্তাত্ত্বিক জটিলতার এক অভূতপূর্ব সংমিশ্রণ। এখানে আমরা উপন্যাসের কাহিনী বিন্যাস, চরিত্রায়ন, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, এবং বঙ্কিমচন্দ্রের শিল্পরীতির গভীরে প্রবেশ করব।

উপন্যাসের পটভূমি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

'চন্দ্রশেখর' উপন্যাসটি অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগের পটভূমিতে রচিত, যখন বাংলার রাজনৈতিক ভাগ্যাকাশে চরম অনিশ্চয়তা। একদিকে দিল্লির মুঘল শাসন দুর্বল হয়ে পড়ছে, অন্যদিকে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার বুকে তাদের আধিপত্য বিস্তারে মরিয়া। উপন্যাসের কালখণ্ড নবাব মীর কাসিমের শাসনকাল এবং ইংরেজদের সাথে তার যুদ্ধের সময়কালকে ধারণ করে আছে।

বঙ্কিমচন্দ্র এখানে ইতিহাসকে কেবল একটি ফ্রেম হিসেবে ব্যবহার করেননি, বরং ইতিহাসের মহানায়কদের সাথে তার সৃষ্ট কাল্পনিক চরিত্রদের একাকার করে দিয়েছেন। নবাব মীর কাসিম, তকী খাঁ, এবং গুর্গন খাঁর মতো ঐতিহাসিক চরিত্ররা এখানে রক্ত-মাংসের মানুষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। মুঙ্গেরের কেল্লা, গঙ্গা নদীর তট এবং অরণ্যসংকুল বাংলার যে চিত্র বঙ্কিম এঁকেছেন, তা পাঠককে সরাসরি সেই উত্তাল সময়ে নিয়ে যায়।

কাহিনী সংক্ষেপ: প্রেম ও ত্যাগের এক জটিল আখ্যান

উপন্যাসের কাহিনী তিনটি প্রধান ধারায় বিভক্ত হলেও তারা একে অপরের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত।

প্রথম ধারা: শৈবালিনী ও প্রতাপের বাল্যপ্রেম। তাদের ভালোবাসা ছিল গভীর, কিন্তু সামাজিক নিয়মে তাদের বিয়ে হওয়া অসম্ভব ছিল। প্রতাপ ও শৈবালিনীর একসময় মনে হয় তাদের ভালবাসা পরিপূর্ণতা পাবে না। তারা দুইজন নদীতে ডুবে আত্মহত্যা করতে গেলেও শৈবালিনী ফিরে আসে; কিন্তু প্রতাপ ঝাপ দেয় ও ডুবে যায়। চন্দ্রশেখর নামক এক নৌচারির হস্তক্ষেপে প্রতাপ উদ্ধার হয়।

শৈবালিনীর বিবাহ হয় বেদজ্ঞ পণ্ডিত চন্দ্রশেখরের সাথে। কিন্তু শৈবালিনী চন্দ্রশেখরকে ভালবাসতে পারেনি; তার হৃদয়ে প্রতাপের স্মৃতি অম্লান থাকে। এই অতৃপ্ত প্রেমই উপন্যাসের মূল চালিকাশক্তি।

দ্বিতীয় ধারা: চন্দ্রশেখর সারাদিন বই পড়া ও পাণ্ডিত্য চর্চায় ব্যস্ত থাকে। এই সুযোগে শৈবালিনী তার প্রতি অনুরক্ত ইংরেজ লরেন্স ফক্টরের সহায়তায় গৃহ ত্যাগ করে বা লরেন্স ফস্টার তাকে অপহরণ করে। এই ঘটনাটি উপন্যাসে এক নাটকীয় মোড় নিয়ে আসে। শৈবালিনীর গৃহত্যাগ এবং পরবর্তীকালে ইংরেজদের কুঠিতে তার অবস্থান তাকে সমাজের চোখে কলঙ্কিত করে তোলে।

গৃহত্যাগী শৈবালিনীকে খুঁজতে চন্দ্রশেখর দেশান্তরী হয়। এদিকে প্রতাপ তার স্ত্রী রূপসীর বোন সুন্দরীর কাছ থেকে সব ঘটনা শোনে এবং সেও শৈবালিনীকে খুঁজতে বেরিয়ে পড়ে। প্রতাপ লরেন্সের নৌবহরে হামলা করে এবং শৈবালিনীকে উদ্ধার করে নিয়ে যায়। ইংরেজদের বহরে হামলা করায় প্রতাপের বাড়িতে ইংরেজ বাহিনী আক্রমণ করে। তারা শৈবালিনী ভেবে প্রতাপের বাড়িতে আশ্রিত দালনী বেগম ও দাসী কুলসুমসহ প্রতাপ ও রামচন্দ্রকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। শৈবালিনী এ ঘটনা নবাব মীর কাসিমকে জানায়। বিস্তারিত শুনে নবাব মুর্শিদাবাদের সেনাপতিকে ইংরেজদের আটকের নির্দেশ দেন। শৈবালিনী প্রতাপকে বাঁচাতে নিজে ছদ্মবেশে ইংরেজদের নৌকায় যায় এবং পালানোর জন্য দুজন নদীতে ঝাঁপ দেয়। প্রতাপ ও শৈবালিনী পালানোর সময় নদীতে একসাথে সাঁতার কাটতে গিয়ে তাদের পুরনো কথা মনে পড়ে যায়। কিন্তু শৈবালিনী যেন তার স্বামীকে ভালবাসতে পারে সেজন্য প্রতাপ তাকে ভুলে যাওয়ার অনুরোধ করে। এরপর শৈবালিনী সন্ন্যাসিনী ভেক ধারণ করে এবং পাপমুক্ত হওয়ার জন্য জঙ্গলে-পাহাড়ে ঘুরে বেড়ায়। একজন অদৃশ্য সাধু পুরুষের দিকনির্দেশনা অনুযায়ী শৈবালিনী সন্ন্যাসব্রতী হয়। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে সে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। একসময় দেখা যায় সেই অদৃশ্য সাধুপুরুষ আসলে চন্দ্রশেখর। সে শৈবালিনীকে নিয়ে নিজ গৃহে ফিরে আসে। কিছুদিন পর শৈবালিনী জ্ঞান ফিরে আসে এবং সব বিস্তারিত বলে। চন্দ্রশেখর সব ভুলে গিয়ে তাকে আপন করে নেয়।

তৃতীয় ধারা: রাজনৈতিক সংঘাত। নবাব মীর কাসিমের সাথে ইংরেজদের যুদ্ধ এবং এই যুদ্ধের ডামাডোলে চরিত্রগুলোর ভাগ্য বিপর্যয়।

তৎকালীন বাংলার মহান অধিপতি মীর কাসিম এর সাথে ইংরেজদের যুদ্ধ আসন্ন। কিন্তু বেগম দালানী নবাব মীর কাসিমকে যুদ্ধে না জড়ানোর অনুরোধ করে। কিন্তু মীর কাসিম অতিমাত্রায় তার সেনাপতি গুরগণ খাঁ এর সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করেন। গুরগণ খাঁ বেগমের ভাই হলেও রাজ্যের ক্ষমতা দখলের ষড়যন্ত্র করছিল। তার ষড়যন্ত্রে বাঁধা হয়ে দাড়ানোয় সে বেগম দালানী ও দাসী কুলসুমকে কৌশলে দরবার থেকে বের করে দেয়। স্বামী রমানন্দের সহায়তায় প্রতাপের বাড়িতে তাদের আশ্রয় হয়।

এদিকে ইংরেজরা বেগমের পরিচয় পায় এবং আসন্ন আক্রমণের ভয়ে তাদের ছেড়ে দেয়। ইতোমধ্যে মোহাম্মদ তকি নবাবের কাছে বেগমের নামে বেশ্যাবৃত্তি ও ইংরেজদের উপপত্নী হওয়ার মিথ্যা সংবাদ দেয়। নবাব কষ্ট পেয়ে বেগমকে হত্যার আদেশ দেন। নবাবের হুকুম অনুযায়ী মোহাম্মদ তকি বেগমকে বিষ পান করানোর জন্য গেলেও তার মন পরিবর্তন হয়। সে নিজের ভুল স্বীকার করে বলে সে নিজেই নবাবের কাছে বলবে যে বেগম ইংরেজদের উপপত্মী নন। বেগম ব্যথিত হয় এবং তীব্র ঘৃণা থেকে একজন দাসীর সহায়তায় বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করে। বেগম আত্মহত্যার পূর্বে ত্বকীকে বলেন তোর মত কুলাঙ্গারের উচিত আমার সাথে বিষপানে আত্মহত্যা করা। দাসী কুলসুম নবাবের কাছে গিয়ে বিস্তারিত বললে নবাব আফসোস করেন এবং ব্যথিত হন।

ইংরেজদের সাথে তখন নবাবের যুদ্ধ চলছে। যুদ্ধে সেনাপতি গুররণ খাঁর বিশ্বাসঘাতকতায় বাংলার নবাব প্রায় হারাতে বসেছেন। নবাব লরেন্সকে শাস্তি দিতে সাক্ষী হিসেবে শৈবালিনীকে দরবারে ডাকেন। শৈবালিনী ও চন্দ্রশেখর যখন দরবারে উপস্থিত ঠিক তখনই ইংরেজ বাহিনী আক্রমণ করে। প্রতাপ এর সহায়তায় চন্দ্রশেখর, শৈবালিনী ও স্বামী রামানন্দ পালিয়ে আত্মরক্ষা করে। শৈবালিনী প্রতাপকে এ জীবনে কোনদিন তার সামনে না আসার অনুরোধ করে। কারণ তার আসাটা হবে শৈবালিনীর সুখ ভঙ্গের জন্য দায়ী। পরিশেষে সবার নিষেধ অমান্য করে প্রতাপ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে একপ্রকার আত্মহত্যা করে।

চরিত্র বিশ্লেষণ: বঙ্কিম-মানসের প্রতিফলন

শৈবালিনী: এক বিদ্রোহী নারী

বঙ্কিমচন্দ্রের সৃষ্ট নারী চরিত্রগুলোর মধ্যে শৈবালিনী সবচেয়ে বিতর্কিত এবং একই সাথে সবচেয়ে আকর্ষণীয়। সে কেবল একজন গৃহবধূ নয়, সে তার কামনার প্রতি সত্যনিষ্ঠ। তার গৃহত্যাগ এবং গঙ্গার জলে আত্মবিসর্জনের চেষ্টা তার ভেতরের তীব্র দহনের বহিঃপ্রকাশ। বঙ্কিম তাকে দিয়ে 'নরক দর্শন' করিয়েছেন, যা ছিল মূলত তার পাপবোধের এক মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসা। শৈবালিনী চরিত্রটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের হৃদয় সবসময় সামাজিক আইনের অনুশাসন মেনে চলে না।

প্রতাপ: নিঃস্বার্থ বীরত্বের প্রতীক

প্রতাপ হলো আদর্শবাদী যৌবনের প্রতিনিধি। শৈবালিনীর প্রতি তার ভালোবাসা ছিল নিষ্কাম। সে জানত শৈবালিনীকে পাওয়া অসম্ভব, তাই সে নিজেকে জনসেবা এবং যুদ্ধে উৎসর্গ করেছিল। প্রতাপের মৃত্যু উপন্যাসের সবচেয়ে ট্র্যাজিক অংশ। বঙ্কিম এখানে দেখিয়েছেন যে, অনেক সময় মৃত্যুই জীবনের সমস্ত জটিলতার একমাত্র সমাধান হয়ে দাঁড়ায়।

চন্দ্রশেখর: জ্ঞান ও ক্ষমা

চন্দ্রশেখর কেবল একজন ব্রাহ্মণ পণ্ডিত নন, তিনি একজন স্থিতপ্রজ্ঞ মানুষ। তার চরিত্রটি বঙ্কিমচন্দ্রের ধর্মতত্ত্ব ও দর্শনের আদর্শে গড়া। শৈবালিনীকে তিনি যেভাবে পুনরায় গ্রহণ করেছেন, তা সেই সময়ের সমাজব্যবস্থায় অভাবনীয় ছিল। তিনি জ্ঞানের মাধ্যমে নিজের রিপুগুলোকে জয় করেছিলেন।

চন্দ্রশেখর চরিত্রটি এখানে অনেকটা অবিচল পাহাড়ের মতো। তিনি যখন জানতে পারেন তার স্ত্রী অন্য একজনের প্রতি অনুরাগী, তখন তিনি যে মানসিক দৃঢ়তা ও ঔদার্য দেখিয়েছেন, তা তাকে এক উচ্চতর স্তরে নিয়ে গেছে। অন্যদিকে প্রতাপের চরিত্রটি আত্মত্যাগের এক চরম উদাহরণ। শৈবালিনীকে ভালোবেসেও সে কখনো নৈতিকতার পথ হারায়নি এবং শেষ পর্যন্ত নিজের প্রাণ বিসর্জন দিয়ে সে তার প্রেমের শুদ্ধতা প্রমাণ করেছে।

মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা ও অলৌকিকতা

'চন্দ্রশেখর' উপন্যাসে বঙ্কিমচন্দ্র মানুষের অবচেতন মনের এক দারুণ বিশ্লেষণ করেছেন। শৈবালিনীর যে 'নরক দর্শন' বা ভ্রম-বিভ্রমের দৃশ্যগুলো রয়েছে, সেগুলো আধুনিক মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে অপরাধবোধের (Guilt complex) চমৎকার চিত্রায়ন। বঙ্কিম এখানে অলৌকিকতাকে ব্যবহার করেছেন মানুষের ভেতরের নৈতিক সংকটকে স্পষ্ট করার জন্য। রামানন্দ স্বামী চরিত্রটি এখানে অনেকটা পথপ্রদর্শকের মতো, যিনি চরিত্রগুলোকে তাদের অন্তরের অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে যান।

শিল্পশৈলী ও ভাষা

উপন্যাসটির ভাষা অত্যন্ত শক্তিশালী এবং চিত্রধর্মী। বঙ্কিমচন্দ্রের সাধুভাষার প্রয়োগ এখানে রাজকীয় গাম্ভীর্য নিয়ে উপস্থিত। যুদ্ধের বর্ণনা যেমন ওজস্বী, তেমনি জ্যোৎস্নারাতে গঙ্গার তটের বর্ণনা অত্যন্ত কাব্যিক। তার বর্ণনাভঙ্গি এতটাই নিখুঁত যে, পাঠক মুঙ্গেরের কেল্লার অন্ধকার প্রকোষ্ঠ বা ঘন অরণ্যের নির্জনতা অনুভব করতে পারেন।

উপন্যাসের গঠনশৈলীও অত্যন্ত আঁটসাঁট। ছোট ছোট পরিচ্ছেদে বিভক্ত কাহিনী দ্রুতলয়ে এগিয়ে চলে, যা পাঠককে শেষ পর্যন্ত ধরে রাখে। বঙ্কিম এখানে 'ড্রামাটিক সাসপেন্স' তৈরিতে মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন।

উপন্যাসের নৈতিক ও সামাজিক বার্তা

বঙ্কিমচন্দ্র সবসময় তার উপন্যাসের মাধ্যমে একটি নৈতিক বার্তা দিতে চেয়েছেন। 'চন্দ্রশেখর'-এ তিনি দেখিয়েছেন যে, প্রেম যখন সমাজ ও ধর্মের সীমা লঙ্ঘন করে, তখন তাকে অনেক কষ্টের ভেতর দিয়ে যেতে হয়। তবে তিনি অত্যন্ত আধুনিক মনস্কতার পরিচয় দিয়েছেন যখন তিনি চন্দ্রশেখরকে দিয়ে শৈবালিনীকে প্রায়শ্চিত্তের পর গ্রহণ করিয়েছেন। এটি ছিল নারীর মর্যাদা ও অধিকার রক্ষার এক নিঃশব্দ লড়াই।

অন্যদিকে, ব্রিটিশ শাসনের নিষ্ঠুরতা এবং দেশীয় শক্তির ভাঙন তিনি ঐতিহাসিকভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। দেশপ্রেমের যে বীজ তিনি 'আনন্দমঠ'-এ বপন করেছিলেন, তার একটি অঙ্কুর আমরা প্রতাপের দেশপ্রেমে দেখতে পাই।

উপসংহার

'চন্দ্রশেখর' কেবল একটি উপন্যাস নয়, এটি একটি মহাকাব্যিক আখ্যান। এটি মানুষের আদিম প্রবৃত্তি, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং আধ্যাত্মিক উত্তরণের এক মিলনস্থল। বঙ্কিমচন্দ্র এখানে প্রেমের যে জয়গান গেয়েছেন, তা কামনার ঊর্ধ্বে ত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল। শৈবালিনীর চপলতা, প্রতাপের আত্মাহুতি এবং চন্দ্রশেখরের প্রশান্তি—এই ত্রয়ীর সংমিশ্রণে বাংলা সাহিত্য পেয়েছে এক কালজয়ী ক্লাসিক।