এই পাতাটি মূল গ্রন্থের অংশ নয়! ‘গ্রন্থপরিচয়’ লিখেছেন তাহের আলমাহদী।
সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮–১৮৯৪) ছিলেন আধুনিক বাংলা উপন্যাসের পথপ্রদর্শক। তাঁর রচিত ‘ত্রয়ী’ উপন্যাসের (আনন্দমঠ, দেবী চৌধুরাণী ও সীতারাম) অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হলো ‘দেবী চৌধুরাণী’। ১৮৮৪ সালে প্রকাশিত এই উপন্যাসটি কেবল একটি রোমাঞ্চকর দস্যু-কাহিনী নয়, বরং এটি তাত্ত্বিক হিন্দুধর্ম, যবন (মুসলিম) ও ব্রিটিশ বিরোধী সশস্ত্র সংগ্রাম এবং নারী শক্তির এক অনন্য দলিল। আনন্দমঠের ‘বন্দে মাতরম’ মন্ত্র যদি দেশের রাজনৈতিক মুক্তি চেয়ে থাকে, তবে দেবী চৌধুরাণী চেয়েছে ব্যক্তির আত্মিক ও নৈতিক মুক্তি।
বঙ্কিমচন্দ্র যখন এই উপন্যাসটি লিখছেন, তখন ভারত সদ্য মুসলিম শাসন থেকে বেরিয়ে ব্রিটিশ শাসনে জর্জরিত। ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১৭৭০ খ্রিস্টাব্দ) পরবর্তী বাংলার যে অরাজক পরিস্থিতি, সন্ন্যাসী ও ফকির বিদ্রোহ—এই সবই উপন্যাসের পটভূমি হিসেবে কাজ করেছে।
উপন্যাসটি ব্রিটিশ বিরোধী মনোভাব উসকে দেওয়ার অপরাধে ঔপনিবেশিক সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ হয়েছিল। বঙ্কিমচন্দ্র এখানে সরাসরি দেখিয়েছেন যে, ব্রিটিশদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াই অপরিহার্য। স্বাধীনতার পর ভারত সরকার এই ঐতিহাসিক অবিচার দূর করতে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয়।
উপন্যাসটির মূল আকর্ষণ এর প্রধান চরিত্র ‘প্রফুল্ল’। এক অতি সাধারণ দরিদ্র ঘরের মেয়ে থেকে বাংলার দোর্দণ্ড প্রতাপশালী ডাকাত রাণী ‘দেবী চৌধুরাণী’ হয়ে ওঠার যাত্রাটি বঙ্কিমচন্দ্র অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ফুটিয়ে তুলেছেন।
প্রফুল্ল বিবাহিত হলেও তার বিত্তশালী শ্বশুর হরবল্লভ রায়ের সংকীর্ণমনা মনোভাবের কারণে তাকে সমাজচ্যুত হতে হয়। বিধবা মায়ের মৃত্যুর পর নিঃস্ব প্রফুল্ল যখন আশ্রয় খুঁজতে শ্বশুরালয়ে যায়, তখন তাকে কেবল প্রত্যাখ্যানই করা হয় না, বরং তাকে ‘চুরি করে খাওয়ার’ পরামর্শ দিয়ে অপমান করা হয়। এই অপমানই প্রফুল্লর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
ভবানী পাঠক ছিলেন তৎকালীন সময়ের এক বিদ্রোহী নেতা বা দস্যু সর্দার। তিনি প্রফুল্লের মধ্যে লুকিয়ে থাকা তেজ অনুধাবন করেন। তিনি তাকে কেবল অস্ত্রচালনা বা কুস্তিই শেখাননি, বরং গণিত, দর্শন, বিজ্ঞান ও ধর্মশাস্ত্রে উচ্চশিক্ষিত করে তোলেন। ভবানী পাঠকের লক্ষ্য ছিল প্রফুল্লকে ‘নিষ্কাম ধর্ম’ পালনের উপযোগী করে গড়ে তোলা।
শিক্ষার পূর্ণতা লাভের পর প্রফুল্ল হয়ে ওঠেন ‘দেবী চৌধুরাণী’। তিনি ধনীদের লুণ্ঠন করে গরীবদের সাহায্য করতেন। তাঁর নৌবাহিনী ছিল ব্রিটিশদের ত্রাস। তবে তিনি ব্যক্তিগত বিলাসিতার উর্ধ্বে থেকে এক কঠোর তপস্বিনীর জীবন যাপন করতেন।
এই উপন্যাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক দিক হলো গীতার ‘নিষ্কাম কর্ম’। ভবানী পাঠক প্রফুল্লকে শিখিয়েছিলেন যে, কর্ম করতে হবে ফলের আশা না করে। দেবী চৌধুরাণী যখন দস্যুবৃত্তি করেন, তখন তিনি কোন ব্যক্তিগত লাভের জন্য তা করেন না; বরং দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনের মাধ্যমে তিনি তাঁর ধর্ম পালন করেন। বঙ্কিমচন্দ্রের মতে, নারী কেবল গৃহের কোণে আবদ্ধ থাকার জন্য নয়, বরং প্রয়োজনবোধে সে সমাজ ও দেশ রক্ষার দণ্ড ধারণ করতে সক্ষম।
উপন্যাসের শেষে আমরা দেখি ব্রিটিশ মেজর ও তাঁর সৈন্যবাহিনীর সাথে দেবীর নৌ-যুদ্ধ। বুদ্ধিমত্তা ও সাহসের জোরে দেবী জয়লাভ করেন। তিনি তাঁর স্বামী ব্রজেশ্বর ও শ্বশুরকে ব্রিটিশদের হাত থেকে রক্ষা করেন।
অনেক সমালোচক ও নারীবাদী মনে করেন, উপন্যাসের শেষে দেবীর আবার ঘর-সংসারে ফিরে যাওয়াটা এক ধরনের পরাজয়। কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্রের দৃষ্টিতে এটি ছিল ‘নিষ্কাম ধর্মের’ চূড়ান্ত পরীক্ষা। দেবী চৌধুরাণী হিসেবে তাঁর যে কর্তব্য ছিল তা সম্পন্ন করে তিনি আবার সাধারণ প্রফুল্ল হিসেবে ফিরে যান। এটি প্রমাণ করে যে, একজন আদর্শ নারী যেমন সমাজ চালাতে পারেন, তেমনি আবার প্রয়োজনে সংসারকেও আদর্শরূপে গড়ে তুলতে পারেন।
চরিত্র বিশ্লেষণ
- প্রফুল্ল/দেবী: ধৈর্যের প্রতীক, শিক্ষার আধার এবং রণনিপুণা নেত্রী।
- ভবানী পাঠক: আদর্শ গুরু ও সমাজ সংস্কারক। তিনি প্রফুল্লর পিতৃতুল্য পথপ্রদর্শক।
- ব্রজেশ্বর: প্রফুল্লর স্বামী। সে পিতার আজ্ঞাবহ হলেও মনে মনে প্রফুল্লকে ভালোবাসে। যদিও তার চরিত্রটি দেবীর তুলনায় অনেকটা ম্লান।
- হরবল্লভ: সংকীর্ণমনা ও ধূর্ত সমাজপতি। তিনি উপন্যাসে নেতিবাচক চিন্তার প্রতিনিধিত্ব করেন।
বিভিন্ন মাধ্যমে দেবী চৌধুরাণী
এই অমর সৃষ্টি বারবার রূপালী পর্দায় ও বিভিন্ন মাধ্যমে ফিরে এসেছে।
- চলচ্চিত্র (১৯৪৯): সুমিত্রা দেবী ও প্রদীপ কুমার অভিনীত প্রথম সফল চলচ্চিত্র।
- চলচ্চিত্র (১৯৭৪): দীনেন গুপ্ত পরিচালিত এই সিনেমাটি কিংবদন্তি হয়ে আছে মহানায়িকা সুচিত্রা সেনের অনবদ্য অভিনয়ের জন্য। রঞ্জিত মল্লিক ও বসন্ত চৌধুরীর অভিনয় আজও মানুষের মনে গেঁথে আছে।
- টিভি সিরিজ (২০১৮): বর্তমান প্রজন্মের কাছে দেবীর বীরত্বগাথা পৌঁছে দিতে স্টার জলসায় এই মেগা সিরিয়ালটি অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়েছিল।
- অমর চিত্রকথা: ভারতীয় শিশুদের মাঝে দেশপ্রেম ও বীরত্বের কথা ছড়িয়ে দিতে কমিক আকারে এটি প্রকাশিত হয়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, ‘দেবী চৌধুরাণী’ কেবল একটি অতীত কাহিনী নয়, এটি এক চিরন্তন প্রেরণা। বঙ্কিমচন্দ্র দেখিয়েছেন যে জ্ঞান, ভক্তি ও কর্মের সমন্বয় ঘটলে একজন মানুষ দেবত্ব অর্জন করতে পারে। প্রফুল্লের কাহিনী আমাদের শেখায় যে নারীর শক্তি অসীম—সে যেমন অন্নপূর্ণা, তেমনি সে দেবী দুর্গার মত অসুর বিনাশী। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে এই উপন্যাসটি যুগ যুগ ধরে পাঠকদের মনে দেশপ্রেম ও মানবিক মূল্যবোধের আলো ছড়িয়ে যাবে।