বঙ্কীয় সাহিত্য পরিষদ্ কর্তৃক প্রকাশিত ‘জন্মশতবর্ষবার্ষিক’ সংস্করণ, দ্বিতীয় মুদ্রণ, ভাদ্র ১৩৫৭-এ প্রকাশিত “ভূমিকা (সম্পাদকীয়)”।
শ্রীযুক্ত হীরেন্দ্রনাথ দত্ত তাঁহার ‘দার্শনিক বঙ্কিমচন্দ্র’ গ্রন্থের (১৩৪৭) ৬১ পৃষ্ঠায় লিখিয়াছেন— “বঙ্কিমচন্দ্রের সর্বোত্তম দার্শনিক অবদান তাঁহার ‘ধর্মতত্ত্ব’।” এই ‘ধর্ম্মতত্ত্বে’র ইতিহাস বঙ্কিমচন্দ্র স্বয়ং এই পুস্তকের একাদশ অধ্যায়ে গুরুর মুখ দিয়া বলিয়াছেন—
অতি তরুণ অবস্থা হইতেই আমার মনে এই প্রশ্ন উদিত হইত, “এ জীবন লইয়া কি করিব?” “লইয়া কি করিতে হয়?” সমস্ত জীবন ইহারই উত্তর খুঁজিয়াছি। উত্তর খুঁজিতে খুঁজিতে জীবন প্রায় কাটিয়া গিয়াছে। অনেক প্রকার লোক-প্রচলিত উত্তর পাইয়াছি, তাহার সত্যাসত্য নিরূপণ জন্য অনেক ভোগ ভুগিয়াছি, অনেক কষ্ট পাইয়াছি। যথাসাধ্য পড়িয়াছি, অনেক লিখিয়াছি, অনেক লোকের সঙ্গে কথোপকথন করিয়াছি, এবং কার্য্যক্ষেত্রে মিলিত হইয়াছি। সাহিত্য, বিজ্ঞান, ইতিহাস, দর্শন, দেশী বিদেশী শাস্ত্র যথাসাধ্য অধ্যয়ন করিয়াছি। জীবনের সার্থকতা সম্পাদন জন্য প্রাণপাত করিয়া পরিশ্রম করিয়াছি। এই পরিশ্রম, এই কষ্ট ভোগের ফলে এইটুকু শিখিয়াছি যে, সকল বৃত্তির ঈশ্বরানুবর্ত্তিতাই ভক্তি, এবং সেই ভক্তি ব্যতীত মনুষ্যত্ব নাই। “জীবন লইয়া কি করিব?” এ প্রশ্নের এই উত্তর পাইয়াছি। ইহাই যথার্থ উত্তর, আর সকল উত্তর অযথার্থ। লোকের সমস্ত জীবনের পরিশ্রমের এই শেষ ফল; এই এক মাত্র সুফল। তুমি জিজ্ঞাসা করিতেছিলে, আমি এ তত্ত্ব কোথায় পাইলাম। সমস্ত জীবন ধরিয়া, আমার প্রশ্নের উত্তর খুঁজিয়া এত দিনে পাইয়াছি। (পৃ. ৬৮-৬৯)
‘ধর্ম্মতত্ত্বে’র বিষয় পুরাতন, কিন্তু ভাষা ও বর্ণনাভঙ্গি নূতন। ইহার জবাবদিহিস্বরূপ বঙ্কিমচন্দ্র বলিয়াছেন—
আমার ন্যায় ক্ষুদ্র ব্যক্তির এমন কি শক্তি থাকিবার সম্ভাবনা যে, যাহা আর্য্য ঋষিগণ জানিতেন না—আমি তাহা আবিষ্কৃত করিতে পারি। আমি যাহা বলিতেছিলাম, তাহার তাৎপর্য্য এই যে, সমস্ত জীবন চেষ্টা করিয়া তাঁহাদিগের শিক্ষার মর্ম্মগ্রহণ করিয়াছি। তবে, আমি যে ভাষায় তোমাকে ভক্তি বুঝাইলাম, সে ভাষায়, সে কথায় তাঁহারা ভক্তিতত্ত্ব বুঝান নাই। তোমরা ঊনবিংশ শতাব্দীর লোক—ঊনবিংশ শতাব্দীর ভাষাতেই তোমাদিগকে বুঝাইতে হয়। ভাষায় প্রভেদ হইতেছে বটে, কিন্তু সত্য নিত্য। (পৃ. ৬৯)
১২৯১ বঙ্গাব্দের শ্রাবণ মাসের প্রারম্ভে অক্ষয়চন্দ্র সরকার-সম্পাদিত মাসিক পত্র ‘নবজীবন’ প্রকাশিত হয়। শ্রাবণ-সংখ্যার প্রথম প্রবন্ধ বঙ্কিমচন্দ্রের “ধর্ম্ম-জিজ্ঞাসা”। ইহাই ‘ধর্ম্মতত্ত্বে’র আদি। ১২৯৫ সালে “ধর্ম্মতত্ত্ব” যখন পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়, প্রথম প্রবন্ধ “ধর্ম্ম-জিজ্ঞাসা”টিই তখন বিভক্ত এবং স্থানে স্থানে পরিত্যক্ত ও পরিবর্ত্তিত হইয়া পুস্তকশেষে ক্রোড়পত্র ক ও খ হিসাবে মুদ্রিত হইয়াছিল। ১২৯১ সালের শ্রাবণ হইতে ১২৯২ সালের চৈত্র-সংখ্যা পর্য্যন্ত বঙ্কিমচন্দ্র ‘নবজীবনে’ বিবিধ প্রবন্ধে ধারাবাহিক ভাবে (মাঝে মাঝে দুই এক মাস বাদ দিয়া) অনুশীলন ধর্ম্ম বুঝাইতে চেষ্টা করেন। প্রবন্ধগুলি নাম ও প্রকাশত্রম এইরূপ—
| ধর্ম্ম-জিজ্ঞাসা |
শ্রাবণ |
১২৯১ |
পৃ. ৬-২৬ |
| মনুষ্যত্ব |
ভাদ্র |
,, |
পৃ. ৭৬-৮৫ |
| অনুশীলন |
আশ্বিন |
,, |
পৃ. ১৩৭-১৪৯ |
| সুখ |
কার্ত্তিক |
,, |
পৃ. ২৩৮-২৫২ |
| ভক্তি |
মাঘ |
,, |
পৃ. ৪১০-৪২০ |
| ঐ |
বৈশাখ |
১২৯২ |
পৃ. ৫৯৭-৬০৫ |
| ঐ |
আষাঢ় |
,, |
পৃ. ৭৩৭-৭৪৯ |
| ঐ |
শ্রাবণ |
,, |
পৃ. ১-১০ |
| ঐ |
ভাদ্র |
,, |
পৃ. ৯৩-১০৫ |
| ঐ |
আশ্বিন |
,, |
পৃ. ১৪৬-১৫৪ |
| প্রীতি |
অগ্রহায়ণ |
,, |
পৃ. ২৭৩-২৮১ |
| দয়া |
চৈত্র |
,, |
পৃ. ৫৫৫-৫৬০ |
১২৯৫ বঙ্গাব্দে বঙ্কিমচন্দ্র উপরি উক্ত প্রবন্ধগুলিকেই ভাঙিয়া চুরিয়া এবং কয়েকটি নূতন প্রবন্ধ যোগ করিয়া ‘ধর্ম্মতত্ত্ব’ প্রথম ভাগ প্রকাশ করেন। ইহাতেই অনুমান হয় তাঁহার বক্তব্য এখানেই সমাপ্ত হয় নাই, আরও কিছু বলিবার ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, দ্বিতীয় ভাগ প্রকাশিত হয় নাই। প্রথম সংস্করণের পৃষ্ঠা-সংখ্যা ছিল ৷৷৴৹+৩৫৯। আখ্যাপত্রটি এইরূপ—
ধর্ম্মতত্ত্ব। / প্রথম ভাগ। / অনুশীলন। / শ্রীবঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় / প্রণীত। / কলিকাতা/ শ্রীউমাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় / ৫নং প্রতাপ চাটুর্য্যের লেন। / ১২৯৫। / মূল্য ১৷৷৹ টাকা।
‘কৃষ্ণচরিত্র’ প্রথম সংস্করণের “বিজ্ঞাপন” ও দ্বিতীয় সংস্করণের “উপক্রমণিকা”য় ‘ধর্ম্মতত্ত্ব’ সম্বন্ধে বঙ্কিমচন্দ্রের বক্তব্য নিম্নে উদ্ধৃত হইল—
ধর্ম্ম সম্বন্ধে আমার যাহা বলিবার আছে, তাহার সমস্ত আনুপূর্ব্বিক সাধারণকে বুঝাইতে পারি, এমন সম্ভাবনা অল্পই। কেন না, কথা অনেক, সময় অল্প। সেই সকল কথার মধ্যে তিনটি কথা, আমি তিনটি প্রবন্ধে বুঝাইতে প্রবৃত্ত আছি। ঐ প্রবন্ধ তিনটি দুইখানি সাময়িক পত্রে ক্রমান্বয়ে প্রকাশিত হইতেছে।
উক্ত তিনটি প্রবন্ধের একটি অনুশীলন ধর্ম্মবিষয়ক; দ্বিতীয়টি দেবতত্ত্ব বিষয়ক; তৃতীয়টি কৃষ্ণচরিত্র। প্রথম প্রবন্ধ “নবজীবনে” প্রকাশিত হইতেছে; দ্বিতীয় ও তৃতীয় “প্রচার” নামক পত্রে প্রকাশিত হইতেছে। প্রায় দুই বৎসর হইল এই প্রবন্ধগুলি প্রকাশ আরম্ভ হইয়াছে; কিন্তু ইহার মধ্যে একটিও আজি পর্য্যন্ত সমাপ্ত করিতে পারি নাই।…
আগে অনুশীলন ধর্ম্ম পুনর্মুদ্রিত হইয়া তৎপরে কৃষ্ণচরিত্র পুনর্মুদ্রিত হইলেই ভাল হইত। কেন না, “অনুশীলন ধর্ম্মে” যাহা তত্ত্ব মাত্র, কৃষ্ণচরিত্রে তাহা দেহবিশিষ্ট। অনুশীলনে যে আদর্শে উপস্থিত হইতে হয়, কৃষ্ণচরিত্র কর্ম্মক্ষেত্রস্থ সেই আদর্শ। আগে তত্ত্ব বুঝাইয়া, তার পর উদাহরণের দ্বারা তাহা স্পষ্টীকৃত করিতে হয়। কৃষ্ণচরিত্র সেই উদাহরণ; কিন্তু অনুশীলন ধর্ম্ম সম্পূর্ণ না করিয়া পুনর্মুদ্রিত করিতে পারিলাম না। সম্পূর্ণ হইবারও বিলম্ব আছে।
— ‘কৃষ্ণচরিত্র,’ ১ম সংস্করণ, ১৮৮৬, “বিজ্ঞাপন”।
ইতিপূর্বে “ধর্মতত্ত্ব” নামে গ্রন্থ প্রকাশ করিয়াছি। তাহাতে যে কয়টী কথা বুঝাইবার চেষ্টা করিয়াছি, সংক্ষেপে তাহা এই:—
১। মনুষ্যের কতকগুলি শক্তি আছে। আমি তাহার বৃত্তি নাম দিয়াছি। সেইগুলির অনুশীলন, প্রস্ফুরণ ও চরিতার্থতায় মনুষ্যত্ব।
২। তাহাই মনুষ্যের ধর্ম্ম।
৩। সেই অনুশীলনের সীমা, পরস্পরের সহিত বৃত্তিগুলির সামঞ্জস্য।
৪। তাহাই সুখ।
এক্ষণে আমি স্বীকার করি যে, সমস্ত বৃত্তিগুলির সম্পূর্ণ অনুশীলন, প্রস্ফুরণ, চরিতার্থতা ও সামঞ্জস্য একাধারে দুর্লভ।
— ‘কৃষ্ণচরিত্র’ ২য় সংস্করণ, ১৮৯২, “উপক্রমণিকা”।
১৮৯৪ খ্রীষ্টাব্দে বঙ্কিমচন্দ্রের মৃত্যুর অব্যবহিত পরে ‘ধর্ম্মতত্ত্বে’র দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়। এই সংস্করণে অনেক পরিবর্ত্তন দৃষ্ট হয়। সম্ভবতঃ বঙ্কিমচন্দ্র স্বয়ং সংশোধন করিয়া গিয়াছেন। দ্বিতীয় সংস্করণের পাঠান্তর পরিশিষ্টে প্রদর্শিত হইয়াছি।