কমলাকান্ত

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

বর্তমান প্রবন্ধটি পর্ষদ্ সংস্করণে ‘ভূমিকা’ হিসাবে মুদ্রিত আছে।

‘কমলাকান্ত’ বঙ্কিমচন্দ্রের বিচিত্রতম সৃষ্টি; বস্তুতঃ স্বয়ং বঙ্কিমচন্দ্র তাঁহার কমলাকান্ত চরিত্রের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়াইয়া গিয়াছেন, কমলাকান্ত বলিতে আমরা বঙ্কিমচন্দ্রকেই বুঝিয়া থাকি। ইতিপূর্বে ইউরোপে এই ভাবে সৃষ্ট চরিত্রের সহিত স্রষ্টার মিলন একাধিক কবি ও ঔপন্যাসিকের ক্ষেত্রে ঘটিয়াছে, কিন্তু বাংলা দেশে ও সাহিত্যে, বোধ হয় আধুনিক ভারতীয় সাহিত্যেই, সৃষ্টি ও সৃষ্টিকর্তার অভিন্নহৃদয়তা এই প্রথম। কল্পনার ক্ষেত্রে বঙ্কিমচন্দ্র এই এক নূতন পদ্ধতির আমদানি করিলেন। কমলাকান্তের পূর্বগামী ‘হুতোম’ অবশ্য কালীপ্রসন্ন সিংহের অভিন্নহৃদয়, কিন্তু সে মাত্র বেনামীর খাতিরে স্বতন্ত্র চরিত্রসৃষ্টি হিসাবে নয়। উহা আলোক প্রার্থী কালীপ্রসন্নেরই অন্ধকার দিক্। হুতোমের দৃষ্টি নিম্নগামী অথবা প্রত্যক্ষ বীভৎস বাস্তবের সঙ্গেই তাহার কারবার; কমলাকান্ত আইডিয়ালিস্ট্, আদর্শবাদী এবং বাস্তবের উর্দ্ধলোকে তাহার কল্পনাবিহার। কমলাকান্ত কবি, প্রেমিক এবং বাংলা সাহিত্যে যাহা প্রথম–স্বদেশপ্রেমিক। পাতালমুখী হুতোম আকাশমুখী কমলাকান্তের ঠিক উল্টা পিঠ।

কৈশোরে কবি এবং যৌবনে ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্র ১৮৭২ খ্রীষ্টাব্দে (৩৪ বৎসর বয়সে) সম্পাদক হইয়া বিপন্ন হইলেন। তাঁহার মাপকাঠিতে তৌল হইয়া পাসমার্কা পাইতে পারে, এমন জবরদস্ত লেখক ‘বঙ্গদর্শনে’র সূচনার যুগে বাংলা দেশে বেশী ছিল না। বঙ্কিম-সূর্য্যের গ্রহ হিসাবে গণ্য করিয়া পরবর্তী কালে আমরা যে সকল লেখকের নাম শ্রদ্ধার সহিত উচ্চারণ করিয়া থাকি, তাহা অনেকটা ‘বঙ্গদর্শন’ এবং বঙ্কিমের খাতিরেই। বঙ্কিম-নিরপেক্ষ তাঁহাদের নিজস্ব মূল্য তত বেশী নয়। সুতরাং ডেপুটি বঙ্কিমচন্দ্রকে মুস্কিলে পড়িতে হইল। উপন্যাস-কথাসাহিত্যে নিজের উপর তাঁহার বিশ্বাস ছিল, নিজের কবিতার প্রতিও তখন পর্যন্ত তাঁহার অশ্রদ্ধা জন্মায় নাই, তাহা ছাড়া রঙ্গলাল দীনবন্ধু হেমচন্দ্র নবীনচন্দ্র ছিলেন; প্রবন্ধ-লেখক হিসাবে প্রফুল্লচন্দ্র যোগেন্দ্রচন্দ্ৰ জগদীশনাথ রামদাস রাজকৃষ্ণ অক্ষয়চন্দ্র ছিলেন এবং তাঁহাদের রচনায় আর্টিস্টের হাত বুলাইয়া বাজার-চল করিবার জন্য তিনি নিজে ছিলেন, কিন্তু মাসিক-পত্রিকার বিরাট্ উদর এই সামান্য উপাদানে ভরানো যায় না। বঙ্কিমচন্দ্রকে সর্বদাই নানা ফন্দি-ফিকির আঁটিতে হইত। নিজের রুচি ও প্রবৃত্তি অনুযায়ী পাঠক ভুলাইবার জন্য তাহাকে প্রায়শঃই ভোল বদলাইতে হইত। কখনও তিনি সমালোচক সাজিয়া ভারতীয় সঙ্গীত ও ‘উত্তররামচরিতে’র সমালোচনা করিতেন, কখনও বৈজ্ঞানিক হইয়া পরমাণু ও ধুলা লইয়া ঘাটাঘাটি করিতেন, কখনও আত্মবিস্মৃত বাঙালীকে আত্মসচেতন করিবার জন্য তাহার কলঙ্ক-কাহিনী শুনাইতেন, কখনও গল্পকাব্য রচনা করিয়া পাঠকের তৃপ্তিসাধন করিতে চাহিতেন, আবার কখনও বা বঙ্গদেশের কৃষককে কেন্দ্র করিয়া সাম্যের নামে পলিটিক্‌স্ লিখিতেন।

তাঁহার স্বভাবতঃ রহস্যপ্রিয় মন প্রথমটা ‘লোকরহস্যে’র সহজ পথে একটা মুক্তির উপায় আবিষ্কার করিয়া কতক সান্ত্বনা লাভ করিয়াছিল। কিন্তু মাসের পর মাস নিছক রহস্য সৃষ্টি করিয়া তৃপ্ত থাকিবার মত পল্লবগ্রাহী মন বঙ্কিমচন্দ্রের ছিল না। প্রবহমান সংসার-স্রোতের উপরিভাগে আপাতমনোহর তরঙ্গভঙ্গে ভাসিতে ভাসিতে তীক্ষ্ণধী বঙ্কিমচন্দ্র কখনও গভীর রহস্য-গহনে তলাইয়া যাইতেন, এবং মরণশীল মানবের এবং বিশেষ করিয়া যে সকল হতভাগ্য জীব তাঁহার আশেপাশে চিন্তাহীন নিঃশষভায় ভাসমান, তাহাদের ভয়াবহ পরিণতির কথা আপন অন্তরে অনুভব করিয়া হালকা হাসির বুদ্বুদ-বিলাসে তাঁহার মন সায় দিত না। অর্দ্ধোম্মাদ নেশাখোর কমলাকান্তের শরণাপন্ন হওয়া ছাড়া তখন তাঁহার উপায় ছিল না। সোজাসুজি সজ্ঞানে যে সকল কথা বলিতে তিনি সঙ্কোচ বোধ করিতেন, কমলাকান্তের মুখ দিয়া সেই সকল কথা তিনি অসঙ্কোচে বলিতে পারিতেন, এবং এই রহস্যময় পাগলকে কেন্দ্র করিয়া মাসের পর মাস পাঠক ভুলাইতে তাঁহাকে বেগ পাইতে হইত না। এক আধারে ব্যঙ্গের শর্করামণ্ডিত কাব্য, পলিটিক্‌স্, সমাজ-বিজ্ঞান এবং দর্শন পরিবেশনের উপায় সৃষ্টি করিয়া সম্পাদক এবং প্রচারক বঙ্কিমচন্দ্র নিজের কাজ অনেকটা সহজ করিয়া লইলেন। কমলাকান্তু-জন্মের ইহাই ইতিহাস। কমলাকান্তের দর্শনকে অর্থসঙ্গতি দেওয়ার জন্য নসীরামবাবু ও প্রসন্ন গোয়ালিনী এবং পৃথিবীতে প্রচারের জন্য ভীষ্মদেব খোশনবীসকেও সৃষ্টি করিতে হইল।

১২৮০ বঙ্গাব্দের ভাদ্র মাসের ‘বঙ্গদর্শনে’ কমলাকান্তের প্রথম আবির্ভাব। ভীষ্মদেব খোশনবীস ভূমিকায় লিখিলেন—

[কমলাকান্ত। লেখাপড়া না জানিত, এমত নহে। কিছু ইংরাজি কিছু সংস্কৃত জানিত। কিন্তু যে বিদ্যায় অর্থোপার্জ্জন হইল না সে বিদ্যা কি বিদ্যা? কমলাকান্তের মত বিদ্বান্ যাহারা কেবল কতকগুলা বহি পড়িয়াছে, তাহারা আমার মতে গণ্ডমূর্খ।

“গণ্ডমূর্খ” কমলাকান্তের দপ্তর হইতে “অত্যুৎকৃষ্ট অনিদ্রার ঔষধ” খোশনবীস মহাশয় লোকহিতার্থ প্রচার করিতে লাগিলেন। ‘বঙ্গদর্শনে’ দপ্তর-প্রকাশের তালিকা এইরূপ—

  1. একা— “কে গায় ওই?”    – ভাদ্র, ১২৮০
  2. মনুষ্য ফল                          –  আশ্বিন, ১২৮০
  3. ইউটিলিটি বা উদরদর্শন     – কার্ত্তিক, ১২৮০
  4. পতঙ্গ                                 – অগ্রহায়ণ, ১২৮০
  5. আমার মন                          – মাঘ, ১২৮০
  6. চন্দ্রলোকে                          – ফাল্গুন, ১২৮০
  7. বসন্তের কোকিল                – চৈত্র, ১২৮০
  8. স্ত্রীলোকের রূপ                  – জ্যৈষ্ঠ, ১২৮১
  9. বিবাহ                                 – আষাঢ়, ১২৮১
  10. বড়বাজার                        – আশ্বিন, ১২৮১
  11. আমার দুর্গোৎসব             – কার্ত্তিক, ১২৮১
  12. একটি গীত                      – ফাল্গুন, ১২৮১
  13. বিড়াল                             – চৈত্র, ১২৮১
  14. মশক                               – বৈশাখ, ১২৮২

ভীষ্মদেব খোশনবীসের মারফৎ প্রাপ্ত দপ্তরে এই ১৪টির অধিক রচনা ছিল না। ইহার মধ্যে “চন্দ্রালোকে,” “স্ত্রীলোকের রূপ” ও “মশক” বঙ্কিমচন্দ্রের লেখা নয়। “চন্দ্রালোকে” ও “মশক” অক্ষয়চন্দ্র সরকারের এবং “স্ত্রীলোকের রূপ” রাজকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের রচনা। ১৮৭৫ খ্রীষ্টাব্দে বঙ্কিমচন্দ্র কাঁঠালপাড়া হইতে স্বরচিত ১১টি নিবন্ধ লইয়া ‘কমলাকান্তের দপ্তর’ প্রকাশ করেন, আখ্যাপত্রে “প্রথম খণ্ড” কথা দুইটি ছিল– অর্থাৎ তখনই কমলাকান্তকে লইয়া আরও কিছু কাল কারবার করিবার মতলব বঙ্কিমচন্দ্রের ছিল। কিন্তু ১২৮২ বঙ্গাব্দের চৈত্র পর্য্যন্ত কোনও প্রকারে প্রকাশিত হইয়া[note]এ বৎসর বঙ্গদর্শনের প্রতি আমি তাদৃশ যত্ন করি নাই, এবং সন ১২৮২ সালের বঙ্গদর্শন পূর্ব্ব পূর্ব্ব বৎসরের তুল্য হয় নাই…।” –বঙ্কিমচন্দ্র, “বঙ্গদর্শনের বিদায়গ্রহণ” প্রবন্ধ, চৈত্র, ১২৮২।[/note] বঙ্কিমচন্দ্র-সম্পাদিত ‘বঙ্গদর্শন’ বিদায় গ্রহণ করাতে কমলাকান্তও বিদায় হয়।

১২৮৪ সালের বৈশাখ হইতে সঞ্জীবচন্দ্রের সম্পাদনায় ‘বঙ্গদর্শন’ পুনঃপ্রকাশিত হইতে থাকে। প্রারম্ভেই বঙ্কিমচন্দ্র লেখেন, “প্রয়োজন আছে বলিয়া, ইহা পুনর্জীবিত হইল।” কিন্তু কমলাকান্তের পুনর্জ্জীবনের কথা বঙ্কিমচন্দ্রের সেই সময়ে মনে হয় নাই, হইলে, বৈশাখ সংখ্যাতেই (১২৮৪) “বুড়া বয়সের কথা” কমলাকান্ত নাম-বিবর্জ্জিতভাবে স্বতন্ত্র প্রবন্ধাকারে প্রকাশিত হইত না। অগ্রহায়ণ পর্য্যন্ত কমলাকান্তের পুনরাবির্ভাব ঘটিল না। পৌষে সম্ভবতঃ জ্যেষ্ঠের তাগিদে “কমলাকান্তের পত্র” প্রকাশিত হইল। কিন্তু কমলাকান্ত-বঙ্কিমচন্দ্রের মন তখন বিরূপ হইয়াছে, চারি বৎসরের সম্পাদকত্ব করিয়া তিনি অনেক কিছু শিখিয়াছেন। কমলাকান্তের জবানিতে তিনি এই পত্রে লিখিলেন–

একবার বাজ দেখি, হৃদয়! এই জগৎ সংসারে–বধির, অর্থচিন্তায় বিব্রত, গূঢ় জগৎ সংসারে, সেইরূপ আবার মনের লুকান কথাগুলি তেমনি করিয়া বল্ দেখি? বলিলে কেহ শুনিবে কি? তখন বয়স ছিল–কত কাল হইল সে দপ্তর লিখিয়াছিলাম–এখন সে বয়স, সে রস নাই–এখন সে রস ছাড়া কথা কেহ শুনিবে কি? আর সে বসন্ত নাই–এখন গলা-ভাঙ্গা কোকিলের কুহুরব কেহ শুনিবে কি?

ফাল্গুনে (১২৮৪) “পলিটিকস্” শীর্ষক আর একটি পত্র বাহির হইল, এবং ১২৮৫ সালের শ্রাবণ মাসে “বাঙ্গালির মনুষত্ত্ব" নামীয় পত্র প্রকাশিত হইয়া কমলাকান্তের জীবন-নাটকে প্রকৃতপক্ষে যবনিকা পড়িল। এই পত্রের শেষে লিখিত ছিল–

আপাতত ঘ্যান ঘ্যানানি বন্ধ করিলাম–কিছু মধু সংগ্রহের আশাটা রহিল।

ইহার পর ১২৮৮ সালের মাঘ মাস পর্যন্ত কমলাকান্তের সাক্ষাৎ পাওয়া যায় না। সঞ্জীবচন্দ্রের সম্পাদনায় ‘বঙ্গদর্শনে’র তখন অত্যন্ত দুরবস্থা, শ্রাবণ মাসের পত্রিকা মাঘ মাসে প্রকাশিত হইতেছে। ১২৮৮ সালের ৫ই ফাল্গুন (১৮৮২ খ্রীষ্টাব্দে, ১৬ই ফেব্রুয়ারি) তারিখে বঙ্কিমচন্দ্রের কলিকাতার বাসায় কাঁঠালপাড়ার পণ্ডিত রামচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও দিগম্বর বিশ্বাসের পুত্র তারকনাথ বিশ্বাস তাঁহার সহিত দেখা করিতে আসেন। কথায় কথায় বঙ্কিমচন্দ্র প্রশ্ন করেন, ‘বঙ্গদর্শন’ কেমন চলিতেছে? উভয়ে কমলাকান্তের অভাবের উল্লেখ করিয়া ‘বঙ্গদর্শনে’র দুরবস্থার কথা বলেন।

তিনি “বটে” বলিয়া একমনে তামাকু খাইতে লাগিলেন। তখন তাহার চিত্ত অবিচলিত, স্থির, গম্ভীর। তাহারই কিছুক্ষণ পরে তিনি পার্শ্বস্থ কক্ষে ঢুকিয়া কি একটা বস্তু পান করিয়া আসিলেন …আমাদিগকে বিদায় দিয়া লিখিতে বসিলেন। –তারকনাথ বিশ্বাস : ‘বঙ্কিম বাবুর জীবনকথা’।

সেই দিন সন্ধ্যা হইতে কলিকাতায় সাংঘাতিক ঝড়বৃষ্টি হয়। সেই প্রাকৃতিক বিপর্য্যয়ের মধ্যে বঙ্কিমচন্দ্র “কমলাকান্তের জোবানবন্দী” রচনা করেন। ১২৮৮ সালের ভাদ্র সংখ্যা ‘বঙ্গদর্শনে’ (ফাল্গুন মাসে প্রকাশিত) উহা বাহির হয়। খোশনবীস জুনিয়রের জবানিতে আদালতে কমলাকান্তের বিচিত্র সাক্ষ্য-বৃত্তান্ত দিয়াই পর্ব শেষ– কমলাকান্ত তখন “নিতান্ত ক্ষেপিয়া গিয়াছে।”

কিন্তু শেষ হইয়াও শেষ হয় না। ইহারও পরে দুইবার কমলাকান্তের সাক্ষাৎ পাই; দপ্তরের ঝড়তি-পড়তি দুইটি লেখা কোনও কমলাকান্ত-ভক্ত সংগ্রহ করিয়া ‘বঙ্গদর্শন’-সম্পাদকের নিকট পাঠাইয়াছেন—রকমটা এই। “ঢেঁকি” বাহির হয় ১২৮৯ সালের বৈশাখে এবং “কাকাতুয়া” কার্ত্তিকে। এখানে সত্য সত্যই শেষ।

‘কমলাকান্তের দপ্তর’ পরিবর্ধিত হইয়া ‘কমলাকান্ত’ নামে সর্বপ্রথম ১২৯২ সালে (সেপ্টেম্বর ১৮৮৫) প্রকাশিত হয়। ইহার তিন অংশ– “কমলাকান্তের দপ্তর,” “কমলাকান্তের পত্র” ও “কমলাকান্তের জোবানবন্দী”। দপ্তরাংশে ১ম সংস্করণে পরিত্যক্ত “চন্দ্রালোকে” (অক্ষয়চন্দ্র সরকার)  ও “স্ত্রীলোকের রূপ” (রাজকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়) পুনঃসন্নিবিষ্ট হয়; “মশক” (অক্ষয়চন্দ্র) পরিত্যক্ত হয়। “মশক” পরবর্ত্তী কালে অক্ষয়চন্দ্রের ‘মোতিকুমারী’তে প্রকাশিত হয়। “কমলাকান্তের দপ্তরের এই সংস্করণে বঙ্কিমচন্দ্র কিছু কিছু পরিবর্জ্জন ও সংশোধন করেন। “কমলাকান্তের পত্র”-অংশে ‘বঙ্গদর্শনে’ প্রকাশিত (পৌষ, ১২৮৪) “কমলাকান্তের পত্র” দুই ভাগে বিভক্ত হইয়া “কি লিখিব?” ও “কমলাকান্তের বিদায়” শিরোনামায় প্রকাশিত হয়। “পলিটিক্স” ও “বাঙ্গালির মনুষ্যত্ব” নামক পত্র দুইটিও এই অংশে স্থান পায়। “বুড়া বয়সের কথা” নামক প্রবন্ধটিও পত্রাকারে ইহার সহিত যুক্ত হয়। অর্থাৎ, এই সংস্করণে “কমলাকান্তের পত্র”-অংশ নিম্নলিখিত ক্রমে প্রকাশিত হয়। যথা– ১। কি লিখিব? ২। পলিটিক্‌স্, ৩। বাঙ্গালির মনুষ্যত্ব, ৪। বুড়া বয়সের কথা, ৫। কমলাকান্তের বিদায়। শেষ অংশ “কমলাকান্তের জোবানবন্দী” দিয়া ‘কমলাকান্ত’ গ্রন্থ শেষ হয়।

‘কমলাকান্তে’র দ্বিতীয় সংস্করণ বাহির হয় ১৮৯১ খ্রীষ্টাব্দের জুলাই মাসে। ইহাতে দপ্তরাংশের চতুর্দ্দশ সংখ্যারূপে পরিত্যক্ত “ঢেঁকি” নিবন্ধটি স্থান পায়। বাকী সমস্তই প্রথম সংস্করণের অনুরূপ থাকে।

বঙ্কিমচন্দ্রের জীবিতকালে ‘কমলাকান্তে’র আর সংস্করণ হয় নাই। “কাকাতুয়া” নিবন্ধটি ‘কমলাকান্তে’ স্থান পায় নাই।

‘বঙ্গদর্শন’ হইতে পুস্তকাকারে প্রকাশের সময় যে সামান্য সামান্য বর্জ্জন ও সংশোধন হইয়াছে, তাহার উল্লেখ না করিয়া প্রধান দুইটি পরিবর্ত্তন ও বৃহত্তম পরিবর্জ্জনের কথা বলা আবশ্যক।

“কমলাকান্তের পত্র”কে “কি লিখিব?” ও “কমলাকান্তের বিদায়”–এই দুইটি অংশে ভাগ করিবার সময় শেষাংশে কিছু পরিবর্ত্তনের প্রয়োজন হইয়াছিল। “কি লিখিব?” অংশ ঠিকই আছে। তাহার পরেই ছিল–

তবে আর একবার লেখ দেখি লেখনি! চল দেখি, পাখীর পাখা!

এই অংশ পরিবর্ত্তিত হইয়া এইরূপ দাঁড়াইয়াছে–

সম্পাদক মহাশয়!

বিদায় হইলাম, আর লিখিব না। বনিল না। আপনার সঙ্গে বনিল না, পাঠকের সঙ্গে বনিল না, এ সংসারের সঙ্গে আমার বনিল না। আমার আপনার সঙ্গে আর আমার বনিল না। আর কি লেখা হয়? বেসুরে কি এ বাঁশী বাজে? বাঁশী বাজি বাজি করে, তবু বাজে না– বাঁশী ফাটিয়াছে।

‘বঙ্গদর্শনে’ শেষে ছিল–

কি লিখিব, সম্পাদক মহাশয় আজ্ঞা করিবেন। সে রস আর নাই—কিছু আজিও আছি

নিতান্ত আজ্ঞানুবর্ত্তী

বর্তমানে দাঁড়াইয়াছে–

এখন কাঁদিব, লিখিব না।

অনুগত, স্বগত এবং বিগত

‘বঙ্গদর্শনে’ “বুড়া বয়সের কথা”র গোড়ায় ছিল–

আমি বুড়া বয়সের কথা লিখি লিখি মনে করিতেছি,…

পুস্তকে এই অংশ এইরূপ দাড়াইয়াছে---

সম্পাদক মহাশয় ! আফিঙ্গ পৌঁছে নাই, বড় কষ্ট গিয়াছে। আজ যাহা লিখিলাম, তাহা বিস্ফারিত লোচনে লেখা। নিজ বুদ্ধিতে, অহিফেন প্রসাদাৎ নহে। একটা মনের দুঃখের কথা লিখিব।

বুড়া বয়সের কথা লিখিব। লিখি লিখি মনে করিতেছি,…

“কাকাতুয়া” কাহার লেখা, জোর করিয়া বলা যায় না; তথাপি যখন “শ্রীকমলাকান্ত চক্রবর্ত্তী প্রণীত” বলিয়া ‘বঙ্গদর্শনে’ উল্লেখ আছে এবং ঐ বৎসরেই প্রকাশিত “শ্রীকমলাকান্ত চক্রবর্ত্তী প্রণীত” “ঢেঁকি” যখন ‘কমলাকান্তে’ স্থান পাইয়াছে এবং যখন “চন্দ্রালোকে” “স্ত্রীলোকের রূপ” ও “মশকে”র মত অপর কোন লেখকের উপর ইহার রচনা-দায়িত্ব অর্পণ করা যাইতেছে না, তখন কমলাকান্তের সর্বশেষ রচনা বলিয়া “কাকাতুয়া”র সম্মান হওয়া উচিত। এই বিবেচনায় এই বিস্মৃত রচনাটি “পাঠভেরে”র পর “পরিশিষ্টে” সম্পূর্ণ উদ্ধৃত হইল।

বঙ্কিমচন্দ্রের প্রায় সকল উপন্যাস লইয়াই বহু সমালোচক বহু ভাবে আলোচনা করিয়াছেন, ‘কৃষ্ণচরিত্র’ ও ‘ধর্ম্মতত্ত্ব’ সম্পর্কেও অনেক বাদানুবাদ হইয়াছে, কিন্তু আশ্চর্য্যের বিষয়, তাঁহার ‘লোকরহস্য’ ও ‘কমলাকান্ত’ লইয়া সমসাময়িক অথবা পরবর্ত্তী সমালোচকেরা বিশেষ মাথা ঘামান নাই। ‘কমলাকান্ত’কে কেন্দ্র করিয়া সাময়িক পত্রে কিছু কিছু প্রবন্ধ প্রকাশিত হইয়াছিল বটে, কিন্তু ‘কমলাকান্তে’র মূল্য অনুযায়ী তাহা নগণ্য। মনে হয়, সমসাময়িক সাহিত্যিকেরা নূতনত্বের অপরাধে ‘কমলাকান্ত’কে ঠিকমত ধরিতে পারেন নাই; বঙ্কিমচন্দ্রের বহুমুখী প্রতিভার অপেক্ষাকৃত লঘু বিকাশ–অবসর বিনোদনের একটা খেলামাত্র কল্পিত হইয়া ‘কমলাকান্ত’ উপেক্ষিত হইয়াছে।

“শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ” শিরোনামায় শচীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মহাশয় তাঁহার ‘বঙ্কিম-জীবনী’তে (৩য় সংস্করণ, পৃ ২৫৮-৫৯) এই গল্পটি দিয়াছেন–

আমার বেশ স্মরণ আছে, সান্‌কিভাঙ্গাব বাটীতে একদিন আমার ভগিনীপতি পূজ্যপাদ স্বৰ্গীয় কৃষ্ণধন মুখোপাধ্যায় (সব জজ) মহাশয় বঙ্কিমচন্দ্রকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, “আপনার রচনার মধ্যে আপনি কোন্ পুস্তকখানিকে শ্রেষ্ঠ মনে করেন?”

তিনি বলিলেন, “তুমি বল দেখি?”

কৃষ্ণধনবাবু হাসিয়া বলিলেন, “আমি বলিব না– লিখিয়া রাখিতেছি। আমি জানিতে চাই, আপনার সহিত আমার মতের মিল হয় কি না।”

কৃষ্ণধনবাবু লিখিয়া রাখিলেন; বঙ্কিমচন্দ্র পরমুহূর্ত্তে একটুও চিন্তা না করিয়া হাসিতে হাসিতে বলিলেন, “কমলাকাঙ্কের দপ্তর।”

কৃষ্ণধনবাবু কাগজ উল্টাইয়া দেখাইলেন; তাহাতে লেখা রহিয়াছে– কমলাকান্তের দপ্তর।

শ্ৰীযুক্ত অক্ষয়চন্দ্র দত্তগুপ্ত তাঁহার ‘বঙ্কিমচন্দ্র’ পুস্তকের ১৯৬-৯৭ পৃষ্ঠায় ‘কমলাকান্ত’ সম্বন্ধে যে সামান্য আলোচনা করিয়াছেন, তাহার মূলকথা এই–

কি ভাষার মাধুর্য্যে, কি ভাবের মনোহারিত্বে, কি অভ্র সংযত সরস রসিকতায়, কি অকৃত্রিম স্বদেশপ্রেমে কমলাকান্ত বঙ্গদর্শনের গৌরব। কমলাকান্ত একাধারে কবি, দার্শনিক, সমাজ শিক্ষক, রাজনীতিজ্ঞ ও স্বদেশপ্রেমিক; অথচ তাহাতে কবির অভিমান, দার্শনিকের আড়ম্বর, সমাজ শিক্ষকের অরসজ্ঞতা, রাজনৈতিকের কল্পনাহীনতা, স্বদেশপ্রেমিকের গোঁড়ামি নাই। হাসির সঙ্গে করুণের, অদ্ভুতের সঙ্গে সত্যের, তরলতার সহিত মর্ম্মদাহিনী জ্বালার, নেশার সঙ্গে তত্ত্ববোধের, ভাবুকতার সহিত বস্তুতন্ত্রতার শ্লেষের সহিত উদারতার এমন মনোমোহন সমন্বয় কে কবে দেখিয়াছে? কেহ কেহ এখনও জিজ্ঞাসা করে, কমলাকাণ্ডের দপ্তরের মৌলিকতা কতখানি? হায় রে অদৃষ্ট! “মৌলিকতা মৌলিকতা” করিয়া অথবা আপনাদের দেশের সৃষ্টিমাত্রেরই মৌলিকতা সন্দেহ করিতে করিতে দেশটা অধঃপাতে বাইতে বসিয়াছে। কৈশোরে “কমলাকান্ত” প্রথম পাঠ করিবার পর যখন বিস্ময়ে আত্মহারা হইয়াছিলাম, তখন ইংরাজী সাহিত্যে জ্ঞানাভিমানী এক ব্যক্তি বড় গভীরভাবে বলিয়াছিলেন, “ওটা De Quinceyর Confessions of an English Opiam Eater-এর অনুকরণ।” বড় হইয়া বুঝিয়াছি, উহা পণ্ডিতের যোগ্য উক্তি নয়। কমলাকান্তের দুই দশটা উক্তির অনুরূপ উক্তি বিশাল ইংরাজী সাহিত্যের কোথাও নাই, এমন কথা বলিব না, কমলাকান্তের জোবানবন্দী Pickwick Papers-এর Sam-এর জোবানবন্দীর আদর্শে রচিত হইয়াছে, তাহাও বিশ্বাস করি, তবু বলিব, উহাতে কমলাকান্তের মৌলিকতার হানি হয় নাই।

বঙ্কিম-সহোদর পূর্ণচন্দ্র “কমলাকান্তের এস এস বঁধু এস!” শীর্ষক একটি প্রবন্ধে (‘বঙ্কিম-প্রসঙ্গ’ পৃ. ৫৪-৬৪ ) “এস এস বঁধু এস” এই গানটি বঙ্কিমচন্ত্রকে প্রথম কবে কি ভাবে মুগ্ধ করিয়াছিল, তাহার ইতিহাস দিয়াছেন।

উপন্যাসগুলির তুলনায় ‘কমলাকান্তে’র বিশেষ প্রচার হয় নাই; প্রথম প্রকাশকাল (১৮৭০) হইতে বঙ্কিমের মৃত্যুকাল (১৮৯৪) পর্য্যন্ত ‘কমলাকান্তে’র মাত্র দুইটি (দপ্তরাংশের তিনটি) সংস্করণ হইয়াছিল। বঙ্কিমের মৃত্যুর পর কমলাকাণ্ডের খ্যাতি উত্তরোত্তর বাড়িতে থাকে এবং টঙটারও অনুকরণ হয়। বঙ্কিমপার্ষদ রাজকৃষ্ণ অক্ষয়চন্দ্র ‘বঙ্গদর্শনে’ এবং চন্দ্রশেখর মুখোপাধ্যায় ‘জ্ঞানাঙ্কুরে’ যাহা করিয়াছিলেন, পরবর্তী কালে কবি দেবেন্দ্রনাথ সেন ‘প্রবাসী’র প্রথম-দ্বিতীয় বৎসরে (১৩০৮-৯) তাহা কৃতিত্বের সহিত করিতে পারিয়াছিলেন। তিনিই কমলাকান্তী ঢঙের পুনঃপ্রবর্তন করেন। পরে চন্দননগরের চারুচন্দ্র রায়ও এই ঢঙে লিখিয়াছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ‘ব্যঙ্গকৌতুকে’ (“কি লিখিব?” প্রবন্ধের অনুকরণে) এবং চন্দ্রশেখর মুখোপাধ্যায় ‘উদ্‌ভ্রান্ত প্রেমে’ (“একা” প্রবন্ধের অনুকরণে) কমলাকান্তী ঢঙ ব্যবহার করিয়াছেন। এতদ্ব্যতীত বাংলা দেশে যাঁহারাই ব্যঙ্গ ও রসিকতার বেসাতি করিতে চাহিয়াছেন, তাঁহাদের প্রত্যেককেই কমলাকান্তের নিকট অল্পবিস্তর ঋণ স্বীকার করিতে হইয়াছে। তবে রাজকৃষ্ণই হউন, অথবা অক্ষয়চন্দ্রই হউন, আসল কমলাকান্তের নাগাল বঙ্কিমচন্দ্র ছাড়া কেহু পান নাই।

“কমলাকান্তের জোবানবন্দী” নাট্টীকৃত হইয়া বহু বার অভিনীত হইয়াছে। ‘কমলাকান্তে’র কোনও অনুবাদ কোনও ভাষায় হইয়াছে বলিয়া আমাদের জানা নাই।

বাহিরের দিক্ হইতে ‘কমলাকান্ত’ কয়েকটি হাল্কা গম্ভীর ব্যঙ্গ হাস্য-দুঃখ বেদনামূলক প্রবন্ধের সমষ্টি, কিন্তু একটু তলাইয়া দেখিলে বুঝা যাইবে, এই বিচ্ছিন্নতার মধ্যেই একটা মূল তত্ত্ব ওৎপ্রোত হইয়া আছে, ইহাই কমলাকান্তের দর্শন। শাখা তত্ত্ব আরও দুই-একটা আছে, কিন্তু সেগুলি প্রসঙ্গতঃ আসিয়াছে।

যৌবনের উদ্দীপনায় ডেপুটি বঙ্কিমচন্দ্র চাকুরি এবং সাহিত্য-জীবনে সার্থকতা অর্জন করিয়া, যশ-মান-অর্থ-প্রভাব-প্রতিপত্তিমণ্ডিত হইয়া নির্বিঘ্নেই চলিতেছিলেন, কিন্তু তাঁহার অন্তরের অন্তস্তলে একটা ক্ষোভ ছিল, পরিণত বয়সের সঙ্গে সঙ্গে তাহা আত্মপ্রকাশ করিতে থাকে। বাঁচিয়া থাকার অর্থাৎ জীবনের উদ্দেশ্য সম্বন্ধে তাঁহার মনে মাঝে মাঝে প্রশ্ন উঠিত, নিজেকে নিঃসঙ্গ একক মনে হইত। হাল্কা হাসির ঢেউ তুলিয়া চাকুরি ও সংসারের স্রোতে আর পাঁচ জনের মত ভাসিয়া চলিবার মধ্যবিত্ত মনোভাব কোনও দিনই তিনি আয়ত্ত করিতে পারেন নাই। তাই ভাবনা জাগিত–

এই বহুজনাকীর্ণ নগরীমধ্যে, এই আনন্দময়, অনন্ত জনস্রোতোমধ্যে আমি একা। আমিও কেন ঐ অনন্ত জনস্রোতোমধ্যে মিশিয়া, এই বিশাল আনন্দতরঙ্গ-তাড়িত জলবুদ্বুদসমূহের মধ্যে আর একটি বুদ্বুদ না হই?… আমি বারিবিন্দু এ সমুদ্রে মিশাই না কেন?

যৌবনের উদ্দামতা নাই, আশার রঙিন কাচ চোখের সম্মুখ হইতে ধীরে ধীরে সঙ্গিয়া যাইতেছে–

যৌবনের অর্জ্জিত সুখ অল্প, কিছু সুখের আশা অপরিমিতা। এখন অর্জ্জিত সুখ অধিক, কিন্তু সেই ব্রহ্মাণ্ডব্যাপিনী আশা কোথায়?…এখন বুঝিয়াছি যে, সংসার-সমুদ্রে সন্তরণ আরম্ভ করিলে, তরঙ্গে তরঙ্গে প্রহত করিয়া আবার আমাকে কূলে ফেলিয়া যাইবে। এখন জানিয়াছি যে এ অরণ্যে পথ নাই, এ প্রান্তরে জলাশয় নাই, এ নদীর পার নাই, এ সাগরে দ্বীপ নাই, এ অন্ধকারে নক্ষত্র নাই।

এই নীরন্ধ্র অন্ধকারে, দিশাহীন ভবার্ণবে যে তত্ত্বকে আশ্রয় করিয়া বঙ্কিমচন্দ্র পথ চলিতে চাহিয়াছেন, তাহা প্রীতি, আত্মপরভেদাভেদশূন্য হইয়া প্রেম, জীবে প্রেম—পরের জন্ম আপনাকে উৎসর্গ করা। ইহাই ‘কমলাকান্তে’র দর্শন এবং সমগ্র ‘কমলাকান্তে’ বারম্বার ফিরিয়া ফিরিয়া বঙ্কিমচন্দ্র এই মূলকথাই শুনাইয়াছেন।

  1. প্রীতিই আমার কর্ণে এক্ষণকার সংসারসংগীত। অনন্ত কাল সেই মহাসঙ্গীত সহিত মনুষ্য-হৃদয়-তন্ত্রী বাজিতে থাকুক। মনুষ্যজাতির উপর যদি আমার প্রীতি থাকে, তবে আমি সুখ চাই না।  – একা।
  2. এ সংসারে আমরা কি করিতে আসি, তাহা ঠিক বলিতে পারি না—কিন্তু বোধ হয়, কেবল মন বাঁধা দিতেই আসি। আমি চিরকাল আপনার রহিলাম–পরের হইলাম না, এই জন্যই পৃথিবীতে আমার সুখ নাই।…আমি অনেক অনুসন্ধান করিয়া দেখিতেছি, পরের জন্য আত্মবিসর্জ্জন ভিন্ন পৃথিবীতে স্থায়ী সুখের অন্য কোন মূল নাই।…আমি মরিয়া ছাই হইব, আমার নাম পর্য্যন্ত লুপ্ত হইবে, কিন্তু আমি মুক্তকণ্ঠে বলিতেছি, এক দিন মনুষ্যমাত্রে আমার এই কথা বুঝিবে যে, মনুষ্যের স্থায়ী সুখের অন্য মূল নাই! এখন যেমন লোকে উন্মত্ত ধন মান ভোগাদির প্রতি ধাবিত হয়, এক দিন মনুষ্যজাতি সেইরূপ উন্মত্ত হইয়া পরের সুখের প্রতি ধাবমান হইবে। – আমার মন।
  3. আমি পরের জন্য দায়ী হই নাই, হবে আমার অধিকার কি? – ঐ।
  4. ইহা বুঝিতে পারি যে, মনুষ্য মনুষ্যের জন্য হইয়াছিল– এক হৃদয় অন্য হৃদয়ের জন্য হইয়াছিল– সেই হৃদয়ে সংঘাত, হৃদয়ে হৃদয়ে মিলন, ইহা মনুষ্য-জীবনের সুখ। –একটি গীত।
  5. ধর্ম্ম কি? পরোপকারই পরম ধর্ম্ম। – বিড়াল।
  6. যৌনসে যে কাজ করিয়াছ, সে আপনার জন্য; তার পর যৌবন গেলে যত কাজ করিবে, পরের জন্য। ইহাই আমার পরামর্শ। ভাবিও না যে, আজিও আপনার কাজ করিয়া উঠিতে পারিলাম না–পরের কাজ করিব কি? আপনার কাজ ফুরায় না–যদি মনুষ্যজীবন লক্ষ বর্ষ পরিমিত হইত, তবু আপনার কাজ ফুরাইত না–মনুষ্যের স্বার্থপরতার সীমা নাই–অন্ত নাই। তাই বলি, বার্দ্ধক্যে আপনার কাজ ফুরাইয়াছে, বিবেচনা করিয়া পরহিতে রত হও। এই মুনিবৃত্তি যথার্থ মুনিবৃত্তি। এই মুনিবৃত্তি অবলম্বন কর। – বুড়া বয়সের কথা।

সংসার-আসক্তিশূন্য গৃহহীন আশ্রয়হীন, সুতরাং সর্ববন্ধনযুক্ত কমলাকান্তের মুখ দিয়া মনুষ্যপ্রীতির এই অপূর্ব জয়গান উচ্চারণ করিয়া বঙ্কিমচন্দ্র আপনাকে ধরা দিয়াছেন। এই তত্ত্বই পরবর্তী কালে তাঁহার ‘ধর্ম্মতত্ত্ব’ ও ‘কৃষ্ণচরিত্রে’ সম্যক্‌ বিকাশলাভ করিয়াছে।

‘আনন্দমঠে’র “বন্দে মাতরম্” সঙ্গীতে যাহার পূর্ণ পরিণতি, ‘মৃণালিনী’তে যাহার সূত্রপাত, ‘কমলাকান্তে’ সেই মাতৃমন্ত্রের প্রথম সার্থক প্রকাশ। বাঙালী জাতির পরাধীনতার সুগভীর বিকার এখানেই বঙ্কিমচন্দ্রের মনে নিদারুণ তীব্রতায় ফুটিয়া উঠিয়াছে। কখনও কাতর প্রার্থনা–

কোথা মা! কই আমার মা? কোথা কমলাকান্ত-প্রসূতি বঙ্গভূমি!…আমার জননী জন্মভূমি– এই মুণ্ময়ী–মৃত্তিকারূপিণী— অনন্তরত্নভূষিতা–এক্ষণে কালগর্ভে নিহিতা। …উঠ মা হিরণ্ময়ী বঙ্গভূমি! উঠ মা! এবার সুসন্তান হইব, সৎপথে চলিব–তোমার মুখ রাখিব। –আমার দুর্গোৎসব।

কখনও হতাশা–

সুখের কথাতেই বাঙালির অধিকার নাই। – একটি গীত।

আবার কখনও ধিক্কার–

আমি কমলাকান্ত চক্রবর্ত্তী তোমাদিগের হিতবাক্য বলিতেছি, পিয়াদার শ্বশুরবাড়ী আছে, তবু সপ্তদশ অশ্বারোহী মাত্র যে জাতিকে জয় করিয়াছিল, তাহাদের পলিটিক্‌স্ নাই। “জয় রাধে কৃষ্ণ! ভিক্ষা দাও গো?” ইহাই তাহাদের পলিটিক্‌স্! তদ্ভিন্ন অন্য পলিটিক্‌স্ যে গাছে ফলে, তাহার বীজ এ দেশের মাটিতে লাগিবার সম্ভাবনা নাই। – পলিটিক্‌স্।

বাঙ্গালি হইয়া কে ঘ্যান্ ঘ্যানানি ছাড়া? কোন বাঙ্গালির ঘ্যান্ ঘ্যানানি ছাড়া অন্য ব্যবসা আছে? –বাঙ্গালির মনুষ্যত্ব।

মাতৃপূজার মন্ত্র শিখাইয়া বঙ্কিমচন্দ্র সর্বপ্রথম আমাদের জাতীয়তাবোধ জাগ্রত করিয়া আমাদিগকে সচেতন করিয়াছেন এই ‘কমলাকান্তে’। আধুনিক বাঙালীর রাষ্ট্রীয় সাধনার ইতিহাসে প্রকৃতপক্ষে ‘কমলাকান্ত’ হইতেই আমাদের যাত্রা শুরু।

সুতীব্র ব্যঙ্গের মধ্য দিয়া বঙ্কিমচন্দ্র ‘কমলাকান্তে’ বাংলা সাহিত্যের অকিঞ্চিৎকরত্ব সম্বন্ধে যে মর্ম্মান্তিক রহস্য করিয়া গিয়াছেন, আজও পর্য্যন্ত তাহা সত্য হইয়া আছে। বঙ্কিমচন্দ্র-বিবৃত বাঙালী সাহিত্যিকের এই গ্লানি আজিও সম্পূর্ণরূপে খণ্ডিত হয় নাই। এই কথা কি আমরা এখনও অস্বীকার করিতে পারি যে, এখনও বাংলা দেশে–

বিদ্যার জন্য বিশেষ লিখিতে বা পড়িতে শিক্ষার প্রয়োজন নাই, গ্রন্থ লিখিতে, সম্বাদ পত্রাদিতে লিখিতে জানিলেই হইল। কেহ কেহ তাহাতে আপত্তি করেন যে, যে লিখিতে জানে না, সে পত্রাদিতে লিখিবে কি প্রকারে? আমার বিবেচনায় এরূপ তর্ক নিতান্ত অকিঞ্চিৎকর। কুম্ভীরশাবক ডিম্ব ভেদ করিবামাত্র জলে গিয়া সাঁতার দিয়া থাকে, শিখিতে হয় না। সেইরূপ বিদ্যা বাঙ্গালির স্বতঃসিদ্ধ, তজ্জন্য লেখা পড়া শিখিবার প্রয়োজন নাই। –ইউটিলিটি বা উদর-দর্শন।

বঙ্কিম-বর্ণিত সাহিত্য-বাজার কি কিছুমাত্র উন্নত হইয়াছে? নিম্নলিখিত বর্ণনা এখনও কি আমাদের সাহিত্য-বাজার সম্বন্ধে প্রযোজ্য নয়?–

সাহিত্যের বাজার দেখিলাম। দেখিলাম, বাল্মীকি প্রভৃতি ঋষিগণ অমৃত ফল বেচিতেছেন; বুঝিলাম, ইহা সংস্কৃত সাহিত্য। দেখিলাম, আর কতকগুলি মনুষ্য নীচু পীচ পেয়ারা আনারস আঙ্গুর প্রভৃতি সুস্বাদু ফল বিক্রয় করিতেছেন—বুঝিলাম, এ পাশ্চাত্য সাহিত্য। আরও একখানি দোকান দেখিলাম– অসংখ্য শিশু এবং অবলাগণ তাহাতে ক্রয় বিক্রয় করিতেছে–ভিড়ের জন্য তন্মধ্যে প্রবেশ করিতে পারিলাম না– জিজ্ঞাসা করিলাম, “এ কিসের দোকান?”

বালকেরা বলিল, “বাঙ্গালা সাহিত্য।”

“বেচিতেছে কে?”

“আমরাই বেচি। দুই এক জন বড় মহাজনও আছেন। তদ্ভিন্ন বাজে দোকানদারের পরিচয় পশ্বাবলী নামক গ্রন্থে পাইবেন।”

“কিনিতেছে কে?”

“আমরাই।”

বিক্রেয় পদার্থ দেখিবার বাসনা হইল। দেখিলাম– খবরের কাগজ জড়ান কতকগুলি অপক্ব কদলী। –বড় বাজার।

সৰ্ব্বাপেক্ষা ভয়ানক দেখিলাম লেখক ঢেঁকি, সাক্ষাৎ মা সরস্বতীর মুক্ত ছাপার গড়ে পিষিয়া বাহির করিতেছেন— স্কুলবুক! –ঢেঁকি।

বর্ত্তমান জগৎ, সুতরাং বাংলা দেশও অধুনা ভোগমুখলোলুপতায় উম্মাদের মত যে লেলিহান বাসনাবহ্নির ইন্ধন জোগাইবার জন্য ছুটিতেছে, এবং যে সোশ্যালিজমের প্রচণ্ড আঘাতে ধনী ও দরিদ্রের ব্যবধান প্রায় ভাঙিয়া চুরমার হইয়া গেল, ঊনবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় পাদেই ‘কমলাকান্ত’ তাহারও দুঃস্বপ্ন দেখিয়া “পতঙ্গে” ও “বিড়ালে” যে মতবাদ ব্যক্ত করিয়াছিল, আজও তাহা পুরাতন হইয়া যায় নাই– কমলাকান্ত-মনের এই চিরসজীবতা ও নবীনতা বিস্ময়কর। অদ্ভুত প্রতিভাসম্পন্ন না হইলে কোনও সাহিত্যস্রষ্টা কালের গণ্ডী অতিক্রম করিয়া আসিতে পারেন না; বঙ্কিমচন্দ্র ‘কমলাকান্তে’ যে সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়াছেন, কেহই তাহা অস্বীকার করিতে পারিবেন না। দেশ ও কালের সঙ্কীর্ণ ক্ষেত্রে দাঁড়াইয়া বঙ্কিমচন্দ্ৰ অনাগত ভবিষ্যৎকে প্রত্যক্ষ করিয়া এবং বহিঃপৃথিবীর প্রচণ্ড সংঘাত আশঙ্কা করিয়া বাঙালীকে স্বদেশের স্বল্পপরিসর মৃত্তিকায় সচেতন ও আত্মস্থ হইয়া দাঁড়াইবার যে ইঙ্গিত দিয়া গিয়াছেন, তাহা দিয়াই আমরা তাঁহার প্রাধান্য বিচার করিব। শাশ্বত শিল্পসাধনার ক্ষেত্রে দেশকালপাত্রনিরপেক্ষ বঙ্কিমচন্দ্র তাহার যুগে একক ছিলেন, তাহার সকল দেশপ্রেম ও স্বাজাত্যবোধকে ছাপাইয়া তাঁহার সেই নিঃসঙ্গ মনের আর্ত্তনাদ আমরা আজও শুনিয়া শিহরিয়া উঠিতেছি।

আজিকার বর্ষার দুর্দ্দিনে—আজি এ কালরাত্রির শেষ কূলগ্নে,–এ নক্ষত্রহীন অমাবস্যার নিশির মেঘাগমে,–আমায় আর কে রাখিবে? এ ভবনদীর তপ্ত সৈকতে, প্রখরবাহিনী বৈতরণীর ভীষণ উপকূলে–এ দুস্তর পারাবারের প্রথম তরঙ্গমালার প্রঘাতে, আর আমায় কে রক্ষা করিবে? অতি বেগে প্রবল বাতাস বহিতেছে–অন্ধকার, প্রভো! চারি দিকেই অন্ধকার! আমার এ ক্ষুদ্র ভেলা দুষ্কৃতের ভরে বড় ভারি হইয়াছে। আমায় কে রক্ষা করিবে?

তিনি একা শুরু করিয়াছিলেন, একাই শেষ করিয়া গিয়াছেন–সার্থক শিল্পীমনের এই বিশেষ প্রকাশ বাংলা সাহিত্যে পরম বিস্ময়রূপে বিরাজ করিতেছে। সেখানে বঙ্কিমচন্দ্রের মত কমলাকান্তও একক।

টিকা ও মন্তব্য

  1. এ বৎসর বঙ্গদর্শনের প্রতি আমি তাদৃশ যত্ন করি নাই, এবং সন ১২৮২ সালের বঙ্গদর্শন পূর্ব্ব পূর্ব্ব বৎসরের তুল্য হয় নাই…।” –বঙ্কিমচন্দ্র, “বঙ্গদর্শনের বিদায়গ্রহণ” প্রবন্ধ, চৈত্র, ১২৮২।