ভূমিকাটি বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ হতে প্রকাশিত জন্মশতবার্ষিক সংস্করণে মুদ্রিত, এটি বঙ্কিমচন্দ্রের রচনা নয়।
ভূমিকা
বঙ্কিমচন্দ্র স্বয়ং ‘কৃষ্ণচরিত্র’ সম্বন্ধে তাঁহার মূল কথা এইরূপে ব্যক্ত করিয়াছেন–
“অনুশীলন ধর্ম্মে” যাহা তত্ত্ব মাত্র, কৃষ্ণচরিত্রে তাহা দেহবিশিষ্ট। অনুশীলনে যে আদর্শে উপস্থিত হইতে হয়, কৃষ্ণচরিত্র কর্ম্মক্ষেত্রে সেই আদর্শ। আগে তত্ত্ব বুঝাইয়া, তার পর উদাহরণের দ্বারা তাহা স্পষ্টীকৃত করিতে হয়। কৃষ্ণচরিত্র সেই উদাহরণ। –১ম সংস্করণ, ১৮৮৬, “বিজ্ঞাপন”।
‘কৃষ্ণচরিত্র’ রচনার একটু ইতিহাস আছে। ‘বঙ্গদর্শনে’র দ্বিতীয় বৎসরে ১২৮০ বঙ্গাব্দের পৌষ মাসে বঙ্কিমচন্দ্র ‘মানস বিকাশ’ নামক একটি কাব্যের সমালোচনা করেন। তাহাতে তিনি বলেন–
জয়দেব, বিদ্যাপতি উভয়েই রাধাকৃষ্ণের প্রণয় কথা গীত করেন। কিন্তু জয়দেব যে প্রণয় গীত করিয়াছেন, তাহা বহিরিন্দ্রিয়ের অনুগামী। বিদ্যাপতির কবিতা বহিরিন্দ্রিয়ের অতীত। –পৃ. ৪০৫।
এই ভাবে নিতান্ত সামান্য ব্যাপার লইয়া আরম্ভ হইলেও কৃষ্ণচরিত্র প্রসঙ্গে বঙ্কিমচন্দ্রের মনে প্রভাব বিস্তার করিতে থাকে। ‘বঙ্গদর্শনে’র তৃতীয় বৎসরে ১২৮১ বঙ্গাব্দের চৈত্র মাসে বঙ্কিমচন্দ্র পুনরায় অক্ষয়চন্দ্র সরকার কর্ত্তৃক সম্পাদিত ‘প্রাচীন কাব্য সংগ্রহে’র সমালোচনা উপলক্ষ্যে “কৃষ্ণচরিত্র” প্রসঙ্গের অবতারণা করেন। ইহাতে তিনি বলেন–
বিদ্যাপতি এবং তদনুবর্ত্তী বৈষ্ণব কবিদিগের গীতের বিষয়, একমাত্র কৃষ্ণ ও রাধিকা। বিষয়ান্তর নাই। তজ্জন্য এই সকল কবিতা অনেক আধুনিক বাঙ্গালির অরুচিকর। তাহার কারণ এই যে, নায়িকা কুমারী বা নায়কের শাস্ত্রানুসারে পরিণীতা পত্নী নহে, অন্যের পত্নী; অতএব সামান্য নায়কের সঙ্গে কুলটার প্রণয় হইলে যেমন, অপবিত্র, অরুচিকর এবং পাপে পঙ্কিল হয়, কৃষ্ণলীলাও তাঁহাদের বিবেচনায় তদ্রূপ–অতি কদর্য্য পাপের আধার। বিশেষ এ সকল কবিতা অনেক সময় অশ্লীল, এবং ইন্দ্রিয়ের পুষ্টিকর–এতএব ইহা সর্ব্বদা পরিহার্য্য। যাঁহারা এইরূপ বিবেচনা করেন, তাঁহারা নিতান্ত অসারগ্রাহী। যদি কৃষ্ণলীলার এই ব্যাখ্যা হইত, তবে ভারতবর্ষে কৃষ্ণভক্তি এবং কৃষ্ণগীতি কখন এত কাল স্থায়ী হইত না। কেন না, অপবিত্র কাব্য কখন স্থায়ী হয় না। এ বিষয়ের যথার্থ্য নিরূপণ জন্য আমরা এই নিগূঢ় তত্ত্বের সমালোচনায় প্রবৃত্ত হইব।
কৃষ্ণ যেমন আধুনিক বৈষ্ণব কবিদিগের নায়ক, সেইরূপ জয়দেবে, ও সেইরূপ শ্রীমদ্ভাগবতে। কিন্তু কৃষ্ণচরিত্রের আদি, শ্রীমদ্ভাগতেও নহে। ইহার আদি মহাভারতে। জিজ্ঞাস্য এই যে, মহাভারত যে কৃষ্ণচরিত্র দেখিতে পাই, শ্রীমদ্ভাগতেও কি সেই কৃষ্ণের চরিত্র? জয়দেবেও কি তাই? এবং বিদ্যাপতিতেও কি তাই? চারি জন গ্রন্থকারই কৃষ্ণকে ঐশিক অবতার বলিয়া স্বীকার করেন, কিন্তু চারি জনেই কি এক প্রকার সে ঐশিক চরিত্র চিত্রিত করিয়াছেন? যদি না করিয়া থাকেন, তবে প্রভেদ কি? যাহা প্রভেদ বলিয়া দেখা যায়, তাহার কি কিছু কারণ নির্দ্দেশ করা যাইতে পারে? সে প্রভেদের সঙ্গে, সামাজিক অবস্থার কি কিছু সম্বন্ধ আছে?…
কাব্য-বৈচিত্রের তিনটি কারণ–জাতীয়তা, সাময়িকতা, এবং স্বাতন্ত্র্য। যদি চারি জন কবি কর্ত্তৃক গীত কৃষ্ণচরিত্রে প্রভেদ পাওয়া যায়, তবে সে প্রভেদের কারণ তিন প্রকারই থাকিবার সম্ভাবনা। বঙ্গবাসী জয়দেবের সঙ্গে, মহাভারতকার বা শ্রীমদ্ভাগবতকারের জাতীয়তা জনিত পার্থক্য থাকিবারই সম্ভাবনা; তুলসীদাসে এবং কৃত্তিবাসে আছে। আমরা জাতীয়তা ও স্বাতন্ত্র্য পরিত্যাগ করিয়া, সাময়িকতার সঙ্গে চারিটি কৃষ্ণচরিত্রের কোন সম্বন্ধ আছে কি না, ইহারই অনুসন্ধান করিব। –পৃ. ৫৪৮-৫৪৯।
এই অনুসন্ধানের ফলই বঙ্কিমচন্দ্রের ‘কৃষ্ণচরিত্র’। এই ফল সম্পূর্ণ ফলিতে অনেক দেরি হইয়াছিল। বঙ্কিমচন্দ্র এই প্রসঙ্গ কিছু কালের জন্য পরিত্যাগ করেন। ১৮৭৬ খ্রীষ্টাব্দে প্রকাশিত তাঁহার ‘বিবিধ সমালোচন’ গ্রন্থে উক্ত ‘কৃষ্ণচরিত্র’ নিবন্ধটি মুদ্রিত হয় (পৃ. ১০১-১১০); ‘বিবিধ প্রবন্ধ’ প্রকাশের সময় প্রবন্ধটি পরিত্যক্ত হয়।
কিন্তু এই প্রসঙ্গ বঙ্কিমচন্দ্র পরিত্যাগ করেন নাই। তিনি ভিতরে ভিতরে আপনাকে প্রস্তুত করিতেছিলেন। ১২৯১ বঙ্গাব্দে ‘প্রচার’ ও ‘নবজীবন’ প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে তিনি হিন্দুধর্ম্মের বিস্তৃত আলোচনায় বিশেষভাবে মনোনিবেশ করেন ও ‘প্রচারে’র আশ্বিন সংখ্যা হইতে পুনরায় ‘কৃষ্ণচরিত্র’ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হইতে থাকে। ১২৯১ সালের আশ্বিন, কার্ত্তিক, মাঘ, ফাল্গুন, চৈত্র; ১২৯২ সালের বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন, কার্ত্তিক, অগ্রহায়ণ-পৌষ, মাঘ, ফাল্গুন-চৈত্র; ১২৯৩ সালের বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ়ে ইহা প্রকাশিত হয়। ঐ বৎসরেই (১৮৮৬ খ্রীষ্টাব্দে) বঙ্কিমচন্দ্র এই পর্য্যন্ত লিখিত অংশকে ‘কৃষ্ণচরিত্র। প্রথম ভাগ’ আখ্যা দিয়া পুস্তকাকারে প্রকাশ করেন। ইহার পৃষ্ঠা-সংখ্যা ছিল ১৯৮।
১২৯৩ বঙ্গাব্দের অগ্রহায়ণ-পৌষ সংখ্যা ‘প্রচারে’ বঙ্কিমচন্দ্র ‘কৃষ্ণচরিত্রে’র দ্বিতীয় ভাগ বা দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশ আরম্ভ করেন। এই সংখ্যায় “ভগবদ্যানপর্ব্বাধ্যায়ে”র দুই পরিচ্ছেদ (“প্রস্তাব” ও “যাত্রা”) মাত্র প্রকাশিত হয়। যে কারণেই হউক, ইহার পর গ্রন্থ আর অগ্রসর হয় নাই। ‘প্রচারে’ “কৃষ্ণচরিত্র” আর বাহির হই নাই। একেবারে ১৮৯২ খ্রীষ্টাব্দে ‘কৃষ্ণচরিত্র (সম্পূর্ণ গ্রন্থ)’ প্রকাশিত হয়। পৃষ্ঠা-সংখ্যা ছিল ৸৵৹ + ১২ + ৪৯২ + ১০। এই সংস্করণে পূর্ব্ব-প্রকাশিত অংশও আমূল পরিবর্ত্তিত হয়। বঙ্কিমচন্দ্রের জীবিতকালে ‘কৃষ্ণচরিত্রে’র এই দুইটি মাত্র সংস্করণ হইয়াছিল। প্রথম সংস্করণের আখ্যা-পত্রটি এখানে মুদ্রিত হইল–
কৃষ্ণচরিত্র। / প্রথম ভাগ। / শ্রীবঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। / প্রণীত। / Calcutta : / Printed By Jodu Nath Seal, / Hare Press, ? 55, Amherst Street. / Published by Umacharan Banerjee / 2, Bhowani Charan Dutt’s Lane. / 1886. /
পূর্ব্বের রচিত “কৃষ্ণচরিত্রে”র সহিত দ্বিতীয় সংস্করণে সম্পর্ক বিষয়ে “দ্বিতীয় বারের বিজ্ঞাপনে” বঙ্কিমচন্দ্রের নিজের উক্তি সর্ব্বদা স্মরণীয়। তাহা এই–
বঙ্গদর্শনে যে কৃষ্ণচরিত্র লিখিয়াছিলাম, আর এখন যাহা লিখিলাম, আলোক অন্ধকারে যত দূর প্রভেদ, এতদুভয়ে তত দূর প্রভেদ। মতপরিবর্ত্তন, বয়োবৃদ্ধি, অনুসন্ধানের বিস্তার, এবং ভাবনার ফল। যাঁহার কখন মত পরিবর্ত্তিত হয় না, তিনি হয় অভ্রান্ত দৈবজ্ঞানবিশিষ্ট, নয় বুদ্ধিহীন এবং জ্ঞানহীন।
‘কৃষ্ণচরিত্র’ লইয়া বাংলা দেশে যথোপযুক্ত আলোচনা হয় নাই। মাত্র সেদিন শ্রীযুক্ত হীরেন্দ্রনাথ দত্ত মহাশয় তাঁহার ‘দার্শনিক বঙ্কিমচন্দ্র’ গ্রন্থে ইহা লইয়া বিস্তারিত আলোচনা করিয়াছেন।