কৃষ্ণকান্তের উইল

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

এই পাতাটি মূলগ্রন্থের অংশ নয়, এটি তাহের আলমাহদী লিখিত ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ উপন্যাসের পর্যালোচনা।

সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জাদুকরী কলমে বাংলা উপন্যাস তার পূর্ণ যৌবনশক্তি ও সৌন্দর্যের আভিজাত্য খুঁজে পেয়েছে। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য আদর্শের এক অপূর্ব সমন্বয় সাধন করেও তিনি যে স্বতন্ত্র সৃজনধারা নির্মাণ করেছিলেন, তার শ্রেষ্ঠ নির্দশন হলো 'কৃষ্ণকান্তের উইল'। এটি কেবল বঙ্কিমচন্দ্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিই নয়, বরং সমকালীন ও উত্তরকালীন সাহিত্যে এক বিতর্কিত ও মনস্তাত্ত্বিক আখ্যান হিসেবে স্বীকৃত। উপন্যাসের পরতে পরতে শিল্পবোধ এবং নৈতিক আদর্শের যে দ্বন্দ্ব আমরা দেখি, তা মূলত ঔপন্যাসিকের নিজস্ব জীবনদর্শনেরই প্রতিফলন।

১৮৭৮ সালে প্রথম প্রকাশের পর তাঁর জীবদ্দশায় আরও চারটি সংস্করণ বের হওয়া প্রমাণ করে, সমকালীন সমাজমানসে এই উপন্যাসের অভিঘাত ছিল সুদূরপ্রসারী। বঙ্কিমচন্দ্র এই উপন্যাসে একটি ত্রিভুজ প্রেমের জটিল সমীকরণ এঁকেছেন, যেখানে একদিকে রয়েছে শ্যামবর্ণ গুণবতী সহধর্মিণী ভ্রমরের উথালপাথাল নিঃস্বার্থ প্রেম, আর অন্যদিকে বিধবা রোহিনীর মোহনীয় রূপের দুর্নিবার আকর্ষণ। গোবিন্দলাল এই দুই নারীর টানাপোড়েনে পড়ে যে বিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়, তাই এই উপন্যাসের মূল উপজীব্য।

রোহিনী চরিত্রটি নিয়ে আলোচনা করতে গেলে দেখা যায়, সে কেবল একজন বিধবা নারী নয়, বরং সে বঙ্কিমচন্দ্রের শিল্পবোধ ও রক্ষণশীল নৈতিকতার যুদ্ধের একটি রণক্ষেত্র। বঙ্কিমচন্দ্র নিজে একজন রক্ষণশীল ব্রাহ্মণ ছিলেন এবং সমাজের শৃঙ্খলা রক্ষা করাকে তিনি তাঁর অন্যতম ধর্ম মনে করতেন। তাই তিনি সমাজের কুসংস্কারগুলো সাহসের সাথে তুলে ধরলেও শেষ পর্যন্ত সমাধান দিয়েছেন রক্ষণশীলতার পথেই। রোহিনী চরিত্রটিকে তিনি সরলা-অবলা বিধবা হিসেবে গড়তে চাননি; বরং তার ভেতরে এক ধরনের দহন ও আকাঙ্ক্ষা ছিল। কিন্তু তার আকস্মিক ও মর্মান্তিক মৃত্যু উপন্যাসের জটিল সমস্যার এক সহজ অথচ নিষ্ঠুর সমাধান হিসেবে সামনে আসে।

রোহিনী গোবিন্দলালকে সত্যিকারের ভালবাসলেও সামাজিক বাস্তবতায় তাকে পাওয়ার কোন বৈধ পথ ছিল না, ফলে সে অনৈতিকতার আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। ভ্রমরকে নকল গয়না দেখিয়ে যখন সে দাবি করে এগুলো গোবিন্দলাল দিয়েছে, তখন ঔপন্যাসিক কঠোরভাবে বলেন—"রোহিনী না পারে এমন কাজ নাই!" এই উক্তিটি মূলত রোহিনীর প্রতি বঙ্কিমচন্দ্রের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিরই বহিঃপ্রকাশ। দ্রুত কাহিনী সমাপ্ত করার প্রয়োজনেই হয়ত তিনি রোহিনীকে পিস্তলের মুখে সঁপে দিয়েছিলেন, যার ফলে চরিত্রটির ভেতরে এক দ্বৈত-সত্তার অবস্থান লক্ষ্য করা যায়।

উপন্যাসটির নামকরণ নিয়ে অনেক পাঠকের মনেই সংশয় জাগতে পারে। বাহ্যিক বিচারে এটি একটি প্রেমের কাহিনী মনে হলেও, এর গভীরে প্রোথিত আছে উইল কেন্দ্রিক সূক্ষ্ম কলাকৌশল। জমিদার কৃষ্ণকান্ত তাঁর সারাজীবনের অর্জিত সম্পদ সন্তানদের মধ্যে ভাগ করে দিতে চান, কিন্তু বড় ছেলে হরলালের ষড়যন্ত্র পুরো ঘটনাপ্রবাহকে পাল্টে দেয়। কৃষ্ণকান্ত তাঁর ভাইপো গোবিন্দলালকে আট আনা সম্পত্তির উইল করে যাওয়ার মাধ্যমেই মূলত কাহিনীর মূল সংঘাত শুরু হয়।

হরলালের মত চরিত্রেরা সমাজে স্বার্থসিদ্ধির জন্য কতটা অধম হতে পারে, তা বঙ্কিমচন্দ্র নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। হরলালের কাছে গুরুতর অন্যায়টাই ন্যায়, আর শঠতাই স্বভাব। আবার ব্রহ্মানন্দের মত কিছু মানুষ আছে যারা মুনিবভক্তি নয়, বরং বিপদের ভয়ে মুনিবের অনুগত থাকে, অথচ লোভ সংবরণ করতে পারে না। উপন্যাসের কাহিনী যখন এগিয়ে চলে, আমরা দেখি গোবিন্দলাল ভ্রমরের মত একনিষ্ঠ পত্নীকে উপেক্ষা করে রোহিনীর রূপের মোহে অন্ধ হয়ে যায়।

ভ্রমর চরিত্রে আমরা দেখি এক অসাধারণ গাম্ভীর্য; সে ভাগ্যের রূপান্তর নীরবে সহ্য করেছে, অপমান বা লাঞ্ছনায় ভেঙে পড়েনি, যা তাকে রোহিনীর চেয়ে শ্রেষ্ঠতর স্থানে অধিষ্ঠিত করে। তবে ভ্রমরের চরিত্রে অভিমান ও ভিত্তিহীন সন্দেহ কাহিনীকে মাঝেমধ্যে তরঙ্গায়িত করেছে। গোবিন্দলাল যখন ভ্রমরকে ছেড়ে রোহিনীর সাথে পালিয়ে যায়, তখন সে মূলত রূপের মোহে মোহগ্রস্ত ছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পর এবং নানাবিধ ঘাত-প্রতিঘাতের শেষে সে বুঝতে পারে যে, ক্ষণিকের রূপের আকর্ষণ আসলে এক কানাগলি। সংসারে প্রকৃত সুখের জন্য গুণের উপাসনাই মুখ্য, বাহ্যিক মোহ চিরস্থায়ী নয়। যখন সে রোহিনীকে নিশাকরের প্ররোচনায় পা দিতে দেখে, তখন তার ভ্রম ভেঙে যায়। সে বুঝতে পারে, এ তো গুণ নয় রূপ, এ তো ভ্রমর নয় রোহিণী, এ তো ভালবাসা নয় মোহ। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। তার সতের বছরের বালিকাবধূ ভ্রমর স্বামীর শোকে এবং অনাদরে মৃত্যুমুখে পতিত হয়। ভ্রমরের অকাল মৃত্যু এবং রোহিনীর হত্যা উপন্যাসটিকে এক চরম ট্র্যাজেডির আখ্যানে পৌঁছে দেয়।

বঙ্কিমচন্দ্র এই উপন্যাসের মাধ্যমে আমাদের শিখিয়েছেন যে, সময়ের কথা সময়ে বলে ফেলার মূল্য অপরিসীম। গোবিন্দলাল যদি সেই ঝড়ের রাতে উদ্যানগৃহে ঘটে যাওয়া ঘটনা ভ্রমরকে স্পষ্টভাবে বলত, তবে হয়ত কাহিনী এমন করুণ পরিণতির দিকে যেত না।

মানুষের মন অদ্ভুতভাবে রূপের পূজারী হয়, আর এই রূপের মোহই মানুষের জীবনের বিপর্যয় ডেকে আনে। 'কৃষ্ণকান্তের উইল' উপন্যাসে নায়ক আর খলনায়ক যেন একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। গোবিন্দলাল যে অপরাধ করেছে, তার প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে তাকে ১২ বছর গৃহহীন সন্ন্যাস জীবন কাটাতে হয়। বারো বছর পর সে একবার বাড়ির সামনে এসে ভ্রমরের স্মৃতিতে হাহাকার করে চিরতরে হারিয়ে যায়। এই গৃহত্যাগ ও বিসর্জনই যেন বঙ্কিমচন্দ্রের দর্শনে এক ধরনের নৈতিক শুদ্ধি।

যদিও উপন্যাসের ভাষা সাধু এবং শব্দচয়ন অত্যন্ত আভিজাত্যপূর্ণ, তবুও এর ভেতরের চিরন্তন মানবিক আবেগগুলো আজও পাঠকদের হৃদয়ে সমভাবে নাড়া দেয়। ভ্রমরের সেই নিঃশব্দ কান্না আর রোহিনীর জীবন যুদ্ধের যে জটিলতা বঙ্কিমচন্দ্র এঁকেছেন, তা কেবল ১৮ শতকের হিন্দু সমাজের ছবি নয়, বরং তা চিরকালীন মানব মনের অন্ধকার ও আলোর খেলা। ভালবাসা যেখানে স্নিগ্ধ ও পবিত্র, মোহ সেখানে ধ্বংসাত্মক। ভ্রমরের মৃত্যু যেন প্রমাণ করে দেয় যে, শুদ্ধ ভালবাসা কেবল জীবন নয়, মৃত্যুর পরেও তার গৌরব বজায় রাখে।

এই সাহিত্যকর্মটি পাঠ করলে বোঝা যায়, বঙ্কিমচন্দ্র কেন সাহিত্যসম্রাট। তিনি কেবল গল্প বলেননি, তিনি একটি সমাজের নীতি-নৈতিকতা ও মানুষের মনের গভীর গহীনের প্রবৃত্তিকে ব্যবচ্ছেদ করেছেন। প্রতিটি নতুন পাঠক যখন এই উপন্যাসটি পাঠ করবেন, তারা নিজেদের মত করে এর চরিত্রের বিশ্লেষণ করবেন এবং গোবিন্দলালের ভুল ও ভ্রমরের ত্যাগের মাঝে জীবনকে নতুনভাবে খুঁজে পাবেন।

বঙ্কিমচন্দ্রের এই অমর সৃষ্টি বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ যা যুগ যুগ ধরে প্রেমের সংজ্ঞাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে এবং গুণের জয়গান গেয়ে যাবে।