মুচিরাম গুড়ের জীবনচরিত

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

পাতাটি মূলগ্রন্থের অংশ নয়।

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের “মুচিরাম গুড়ের জীবনচরিত” বাংলা সাহিত্যের একটি কালজয়ী ব্যঙ্গাত্মক উপন্যাস। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মূলত তাঁর গাম্ভীর্যপূর্ণ ঐতিহাসিক ও সামাজিক উপন্যাসের জন্য সুপরিচিত। কিন্তু “মুচিরাম গুড়ের জীবনচরিত” একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন স্বাদের বই। এটি তাঁর অন্যতম সেরা ব্যঙ্গাত্মক (satirical) উপন্যাস, যা প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮৮৪ সালে।

উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র মুচিরাম গুড়, একজন স্বল্পশিক্ষিত, ধূর্ত এবং চরম সুবিধাবাদী ব্যক্তি। কাহিনীতে দেখানো হয়েছে কিভাবে সে কোন বিশেষ মেধা বা যোগ্যতা ছাড়াই কেবল চাটুকারিতা, ভণ্ডামি এবং সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের (বিশেষ করে ইংরেজ সাহেবদের) তোষামোদ করে গ্রামের এক সাধারণ মানুষ থেকে অবশেষে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের মত বড় পদ লাভ করে। তার এই উত্থানের পথটি নৈতিকতা ও যোগ্যতার কোন বালাই ছাড়াই কিভাবে তৈরি হয় এবং কিভাবে সে নিজের আখের গুছিয়ে নেয়, তাই নিয়ে এই কাহিনী আবর্তিত হয়।

বঙ্কিমচন্দ্র অত্যন্ত দক্ষতার সাথে উনিশ শতকের বাংলা সমাজের আমলাতন্ত্র ও ইংরেজি শাসনের পদলেহনকারী বাঙালি সমাজের এক শ্রেণীর তীব্র সমালোচনা করেছেন। মুচিরাম গুড় হলো সেই শ্রেণীর প্রতীক, যারা নিজের স্বার্থের জন্য আত্মসম্মান বিক্রি করতে দ্বিধা করে না। ইংরেজ শাসকদের সন্তুষ্ট করার জন্য তার আচরণ একদিকে যেমন হাস্যকর, তেমনি সমাজ বাস্তবতার এক নিষ্ঠুর প্রতিফলন।

উপন্যাসের সবচেয়ে বড় স্যাটায়ার হলো কিভাবে মেধার চেয়ে চাটুকারিতা বেশি প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। মুচিরামের মত লোক, যার কোন শিক্ষাগত বা প্রশাসনিক যোগ্যতা নেই, সে দেশের মানুষের শাসনকর্তা হয়ে বসে। বঙ্কিমচন্দ্র দেখিয়েছেন যে, সেই সময়েও মেধা ও যোগ্যতার চেয়ে প্রভাব খাটিয়ে বা তোষামোদ করে উচ্চপদ পাওয়া সম্ভব ছিল। ছবিতে দেওয়া লোকটির রূপক ব্যঙ্গচিত্রটি ঠিক এই অযোগ্য অথচ ক্ষমতাশালী ব্যক্তির রূপ ফুটিয়ে তোলে।

বঙ্কিমচন্দ্রের অন্যান্য গম্ভীর উপন্যাসের তুলনায় এটি অত্যন্ত হালকা এবং হাস্যরসাত্মক ভাষায় লেখা। তাঁর ধারালো সংলাপ, বুদ্ধিদীপ্ত কৌতুক এবং কষাঘাতমূলক বর্ণনা কাহিনীটিকে উপভোগ্য করে তুলেছে। পাঠকরা মুচিরামের কর্মকাণ্ডে হাসলেও এর ভেতরের গভীর সত্যটি সহজেই অনুধাবন করতে পারেন।

“মুচিরাম গুড়ের জীবনচরিত” কেবল একটি উনিশ শতকের কাহিনী নয়, এটি একটি চিরন্তন গল্প। আজও আমরা দেখি কিভাবে ক্ষমতা ও চাটুকারিতার মেলবন্ধন সমাজের অযোগ্যদের শিখরে বসিয়ে দেয়। বঙ্কিমচন্দ্রের এই তীক্ষ্ণ স্যাটায়ার আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। হাস্যরসের মোড়কে সমাজবাস্তবতার এমন সার্থক উপস্থাপন বাংলা সাহিত্যে বিরল। এটি কেবল একটি উপন্যাস নয়, এটি একটি সমাজ সমালোচনামূলক দলিল। যাঁরা বঙ্কিমচন্দ্রকে কেবল গম্ভীর ঔপন্যাসিক মনে করেন, তাঁদের অবশ্যই এই বইটি পড়া উচিত তাঁর বহুমুখী প্রতিভার পরিচয় পাওয়ার জন্য।