সীতারাম

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

এই পাতাটি সীতারাম উপন্যাসের অংশ নয়, এটি ‘তাহের আলমাহদী’ কৃত সীতারাম উপন্যাসের সংক্ষিপ্ত মূল্যায়ন।

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অন্তিম উপন্যাস ‘সীতারাম’ (১৮৮৭) বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক মহাকাব্যিক ট্র্যাজেডি এবং হিন্দু রাজত্বের উত্থান-পতনের এক করুণ আখ্যান। এই উপন্যাস সম্পর্কে বলতে গেলে প্রথমেই আমাদের মনে রাখতে হবে যে, এটি বঙ্কিমচন্দ্রের পরিণত মানসের ফসল, যেখানে তিনি কেবল ইতিহাসকে বর্ণনা করেননি, বরং মানুষের চারিত্রিক স্খলন, ধর্মতত্ত্ব এবং নিয়তির অমোঘ বিধানকে ব্যবচ্ছেদ করেছেন। সীতারাম উপন্যাসের বিশালতা এর শব্দসংখ্যার চেয়েও এর ভাবগাম্ভীর্যে এবং দর্শনে নিহিত। উপন্যাসের নায়ক সীতারাম রায় একজন ঐতিহাসিক চরিত্র হলেও বঙ্কিম তাকে কাল্পনিক রঙে রাঙিয়ে এক রক্ত-মাংসের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছেন, যার ভেতরে অমিত সম্ভাবনা ছিল কিন্তু যার পতন ঘটেছিল নিজের রিপুর কাছে পরাজয়ের মাধ্যমে।

উপন্যাসের কাহিনী শুরু হয় মহম্মদপুর নামক এক জনপদকে কেন্দ্র করে, যেখানে সীতারাম এক দুর্ধর্ষ হিন্দু রাজ্য স্থাপনের স্বপ্ন দেখেন। তাঁর এই স্বপ্ন কেবল ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল না, বরং (বঙ্কিমের ভাবনায়) অত্যাচারী মুসলিম শাসকের হাত থেকে প্রজাদের রক্ষার এক মহৎ সংকল্প ছিল। এই যাত্রায় তাঁর সাথে যুক্ত হন ‘গঙ্গাধর স্বামী’র মত ব্যক্তিত্ব, যিনি সর্বদা হিন্দু-রাজ্য স্থাপনের স্বপ্ন দেখতেন এবং তাঁর দুই মহীয়সী নারী—শ্রী ও নন্দা। তবে উপন্যাসের মূল দ্বন্দ্বটি আবর্তিত হয়েছে শ্রীকে কেন্দ্র করে। শ্রী ছিলেন সীতারামের প্রথমা পত্নী; বিবাহের পর তাঁর কুষ্ঠিতে ‘স্বামীহন্ত্রী’ বা ‘প্রিয়জন হন্তারক’ হওয়ার অশুভ যোগ থাকায় সীতারামের পারিবারিক চাপে তাঁকে অকালেই পরিত্যাগ করা হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘকাল পর যখন শ্রী ফিরে আসেন, তখন তিনি আর সেই সাধারণ গৃহবধূ নন, বরং সন্ন্যাসিনী চণ্ডালিনী। সীতারামের পতনের মূল কারণ তাঁর এই স্ত্রীর প্রতি অত্যধিক আসক্তি। যে বীর একসময় সাম্রাজ্য জয়ের নেশায় মত্ত ছিলেন, তিনি ক্রমশ শৌর্য হারিয়ে এক রমণীর মোহে বন্দী হয়ে পড়েন। বঙ্কিমচন্দ্র এখানে অত্যন্ত নিপুণভাবে দেখিয়েছেন যে, একজন শাসকের ব্যক্তিগত নৈতিকতা কীভাবে একটি রাষ্ট্রের ভাগ্য নির্ধারণ করে।

‘সীতারাম’ উপন্যাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল এর ধর্মতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘ধর্ম্মত্ত্ব (অনুশীলন) গ্রন্থের প্রভাব এই উপন্যাসে বিশেষভাবে প্রতিফলিত। তিনি দেখাতে চেয়েছেন যে, কেবল বাহুবল দিয়ে ধর্মরাজ্য স্থাপন সম্ভব নয়; তার জন্য প্রয়োজন ইন্দ্রিয় সংযম। সীতারাম যখন শ্রী-র মোহে অন্ধ হয়ে রাজ্যশাসন ভুলে আমোদ-প্রমোদে মেতে ওঠেন, তখন থেকেই তাঁর দুর্গের ভিত্তি নড়বড়ে হতে থাকে। তাঁর বিশ্বস্ত অনুচররা একে একে সরে যায়, এবং শত্রু পক্ষ সুযোগ নিতে শুরু করে। সীতারামের এই পতন গ্রিক ট্র্যাজেডির বীরদের কথা মনে করিয়ে দেয়, যাঁদের একটি মাত্র ‘ট্র্যাজিক ফ্ল’ বা চারিত্রিক ত্রুটি তাঁদের সর্বনাশের কারণ হয়। সীতারামের ক্ষেত্রে সেই ত্রুটি ছিল তাঁর কামাসক্তি। বঙ্কিম এখানে শ্রীকে কোন সাধারণ খলচরিত্র হিসেবে আঁকেননি; শ্রী বরং এক উদাসীন দেবীমূর্তি, যিনি সীতারামকে বারবার সতর্ক করেছেন, কিন্তু সীতারাম নিজের ধ্বংস নিজেই ডেকে এনেছেন।

উপন্যাসের গঠনশৈলী অত্যন্ত জটিল এবং গতিশীল। যুদ্ধের বর্ণনা থেকে শুরু করে অন্তঃপুরের কথোপকথন—সবকিছুতেই বঙ্কিম তাঁর স্বকীয় রচনা শৈলী বজায় রেখেছেন। তাঁর ভাষা এখানে অনেক বেশি পরিণত, গম্ভীর এবং ব্যঞ্জনাময়।

উপন্যাসের শেষ দৃশ্যে যখন মহম্মদপুরের পতন ঘটে এবং সীতারাম সবকিছু হারিয়ে রিক্ত হস্তে প্রস্থান করেন, তখন পাঠকের মনে এক গভীর হাহাকার সৃষ্টি হয়। এটি কেবল একটি যুদ্ধের পরাজয় নয়, এটি একটি আদর্শের পরাজয়। বঙ্কিমচন্দ্র এই উপন্যাসের মাধ্যমে সমকালীন হিন্দু সমাজকে এক প্রকার সতর্কবার্তা দিতে চেয়েছিলেন। তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, বীরত্ব এবং ধর্ম রক্ষা করতে হলে আগে নিজের ভেতরের রিপুকে জয় করতে হবে। সীতারাম যদি শ্রী-র মোহে অন্ধ না হতেন, তবে বাংলার ইতিহাস হয়ত অন্যভাবে লেখা হত—বঙ্কিমের এই ইঙ্গিত স্পষ্ট।

চরিত্রায়নের দিক থেকে ‘সীতারাম’ বঙ্কিমচন্দ্রের শ্রেষ্ঠ কীর্তিগুলোর একটি। নন্দা চরিত্রটি এখানে নিঃস্বার্থ প্রেমের প্রতীক, যে স্বামীর অধঃপতন দেখেও পাশে থাকে। অন্যদিকে গঙ্গাধর স্বামী বা অন্যান্য সন্ন্যাসী চরিত্রগুলো উপন্যাসে এক আধ্যাত্মিক আবহ তৈরি করে। তবে সবকিছু ছাপিয়ে সীতারাম এক বিশাল মহীরুহের মত দাঁড়িয়ে থাকেন, যার ডালপালা একদিন আকাশ ছুঁতে চেয়েছিল কিন্তু যার শিকড় উইপোকায় কাটা ছিল।

উপন্যাসের রাজনৈতিক দর্শনও অনস্বীকার্য। এখানে হিন্দু জাতীয়তাবাদের এক প্রাথমিক রূপরেখা দেখা যায়, যা বঙ্কিমের ‘আনন্দমঠ’ বা ‘দেবী চৌধুরাণী’র চেয়েও অনেক বেশি বাস্তবধর্মী এবং বিষাদময়। সীতারাম কোন দেবতুল্য পুরুষ নন, বরং ভুল-ত্রুটিতে ভরা এক মানুষ, আর এখানেই এই উপন্যাসের সার্থকতা।

উপন্যাসের প্রতিটি পরিচ্ছেদে ফুটে উঠেছে মানুষের অজেয় সংকল্প এবং তার বিপরীতে প্রকৃতির নিষ্ঠুর পরিহাস। বঙ্কিমচন্দ্র সীতারামকে শেষ করেছেন এক বিশাল ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে, যা আমাদের শেখায় যে—সাম্রাজ্য ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু মানুষের কর্মফল এবং ইতিহাস চিরস্থায়ী।

সীতারাম উপন্যাসটি তাই কেবল এক রাজার গল্প নয়, এটি মানুষের অন্তরের অনন্ত যুদ্ধের এক মহাকাব্যিক প্রতিফলন। সীতারামের পতনের মধ্য দিয়ে বঙ্কিমচন্দ্র যে নৈতিক শিক্ষা দিয়েছেন, তা আজও সমাজ ও রাজনীতির প্রেক্ষাপটে সমভাবে প্রাসঙ্গিক। সব মিলিয়ে ‘সীতারাম’ বাংলা উপন্যাসের ধারায় এক অতুলনীয় ট্র্যাজিক মাস্টারপিস।