বঙ্কিমচন্দ্র নিজে লিখিয়া গিয়াছেন, “দুর্গেশনন্দিনী বা চন্দ্রশেখর বা সীতারামকে ঐতিহাসিক উপন্যাস বলা যাইতে পারে না। পাঠক মহাশয় অনুগ্রহপূর্ব্বক আনন্দমঠ বা দেবী চৌধুরাণীকে ‘ঐতিহাসিক উপন্যাস’ বিবেচনা না করিলে বড়ই বাধিত হইব। …এই রাজসিংহ প্রথম ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখিলাম।”
এই কথাগুলিতে তাঁহার অভিপ্রায় কি? ঐতিহাসিক উপন্যাস বলিতে আমরা কি বুঝিব? তাহাতে কি কি উপাদান থাকা চাই? এ বিষয়ে পণ্ডিতেরা একমত হইতে পারেন নাই। অল্প দিন হইল, গত ২৫ ডিসেম্বরের বিলাতী ‘টাইম্স্’ পত্রিকায় পড়িলাম :–
“It is not easy to define a historical novel. Professor Nield’s definition, ‘A novel is rendered historical by the introduction of dates, personages or events to which identifiestion can be given, seems too severe….Soribner’s [of New York] have, justifiably, interpreted the subject more liberally by the inclusion of novels the background of which is laid in a recognizable historical period, even though no single character in the book may have a genuine historical prototype.”
এই দ্বিতীয় কথাটি যদি আমরা স্বীকার করি, তবে ‘দুর্গেশনন্দিনী’ হইতে ‘সীতারাম’ পর্যন্ত ঐ শ্রেণীর উপন্যাস সাতখানিকে নিশ্চয়ই ঐতিহাসিক উপন্যাস নাম দিতে হয়। তাহাদের কোনটায় কল্পিত চরিত্র বেশী, কোনটায় ইতিহাসে পরিচিত চরিত্র বেশী (যেমন ‘রাজসিংহে’), কিন্তু সবগুলিতেই সেই অতীত যুগের সমাজের, ঘর-বাড়ীর, মানবচিন্তার আচার-ব্যবহারের অনেকাংশে সত্য চিত্র প্রতিবিম্বিত হইয়াছে। কিন্তু এগুলিতে পদে পদে খাঁটি ঐতিহাসিক সত্য রক্ষা করা হয় নাই, কারণ এরূপ সত্যের চিত্রের উপর বঙ্কিম ইচ্ছা করিয়া এক ‘অলোক আলোকের’ রং ফলাইয়া দিয়াছেন, তাহার কথা পরে বলিব।
বঙ্কিম নিজে এই শ্রেণীর সাহিত্যকে একটি বড়ই সঙ্কীর্ণ গণ্ডীর মধ্যে আবদ্ধ করিয়াছিলেন। বোধ হয়, তাঁহার বিশ্বাস এইরূপ ছিল যে, ইতিহাসের সত্য ঘটনা মাত্র উপন্যাসের ভাষায় বিবৃত করিলে তবেই তাহা ঐতিহাসিক উপন্যাস নামের যোগ্য; অর্থাৎ তাহাতে অধিকাংশ পুরুষগুলি ইতিহাসে পরিচিত ব্যক্তি হইবে, এবং অতি কম সংখ্যায় কাল্পনিক চরিত্র থাকিবে; কথাবার্ত্তাগুলি প্রায়শঃ তাঁহার নিজের রচিত, কিন্তু বর্ণিত ঘটনা এবং বিষয়-পরিকল্পনা (প্লট) একেবারে নিছক সত্য, ইতিহাস হইতে তোলা।
তাঁহার এই সঙ্কীর্ণ সংজ্ঞায় ‘রাজসিংহ’ ভিন্ন ঐ অপর ছয়টি গ্রন্থ ঐতিহাসিক উপন্যাস হইতে পারে না। তবে, তিনি এগুলি লিখিলেন কেন? তাঁহার গার্হস্থ্য উপন্যাসগুলিই তো তাঁহার অতুলনীয় প্রতিভা, প্লট গাঁথিবার, চরিত্র সৃষ্টির, কথোপকথন রচিবার শক্তি প্রমাণ করিয়াছিল। সেই শ্রেণীর আরও নভেল লিখিয়া গেলে তাঁহার যশের কিছুমাত্র হ্রাস হইত না। তাঁহার মস্তিষ্ক তো জীবনের শেষ দিন পর্য্যন্ত অটুট তেজ দেখাইয়া গিয়াছিল।
এই প্রশ্নের উত্তর তাঁহার নিকট হইতেই পাইয়াছি। বঙ্কিম মর্ম্মে মর্ম্মে, শরীরের সূক্ষ্মতম স্নায়ুতে পর্য্যন্ত, স্বদেশ-প্রেমী স্বজাতি-ভক্ত। ‘বঙ্গদর্শনে’র সর্বপ্রথম সংখ্যায় নবীন বঙ্কিম, ‘প্রচারে’র সর্ব্বপ্রথম সংখ্যায় প্রবীণ বঙ্কিম, সেই একই কথা বলিতেছেন:– “অহঙ্কার অনেক স্থলে মনুষ্যের উপকারী। … জাতীয় গর্ব্বের কারণ লৌকিক ইতিহাসের সৃষ্টি বা উন্নতি। ইতিহাস-বিহীন জাতির দুঃখ অসীম। … বাঙ্গালীর ইতিহাস চাই। নহিলে বাঙ্গালী কখন মানুষ হইবে না। যাহার মনে থাকে যে, এ বংশ হইতে কখন মানুষের কাজ হয় নাই, তাহা হইতে কখন মানুষের কাজ হয় না।” “যে বলে যে, … বাঙ্গালী চিরকাল দুর্ব্বল, চিরকাল ভীরু, স্ত্রীস্বভাব, … তাহার কথা মিথ্যা। …বাঙ্গালী যে পূর্ব্বকালে বাহুবলশালী, তেজস্বী, বিজয়ী ছিল, তাহার অনেক ঐতিহাসিক প্রমাণ পাই। অধিক নয়, আমরা এক শত বৎসর পূর্ব্বের বাঙ্গালী পহলয়ানের, বাঙ্গালী লাঠি শড়ওয়ালার… বলবীর্য্যের কথা বিশ্বস্তসূত্রে শুনিয়াছি।”
পরদেশের নানা উৎকৃষ্ট ইতিহাস পড়িয়া যেমন তাঁহার মনের বিকাশ ও উদারতা জন্মিল, তেমনি দুঃখ হইল যে, “হায়! ভারতের অতীত কাহিনী তো এমন সুন্দর এমন বিপুল করিয়া লেখা হয় নাই; বিশেষতঃ আমাদের নিজস্ব বঙ্গজননীর ইতিহাস নাই বলিলেই হয়, আর যাহা ইতিহাস বলিয়া চলিতেছে তাহা লজ্জা ও হীনতার কারণ মাত্র।” ‘আনন্দমঠে’র ভাব অন্তঃসলিলা গঙ্গার মত ‘আনন্দমঠে’র স্রষ্টাকে আদি যৌবন হইতেই অনুপ্রাণিত করিয়াছিল, যদিও এই ভাব তাঁহার লেখনীমুখে প্রকাশ পাইতে অনেক বৎসর বিলম্ব ঘটে। তাই, তিনি প্রথম হইতেই বাঙ্গলার ইতিহাস খুঁজিতে লাগিলেন, অনেক গ্রন্থ পড়িলেন, কিন্তু ইতিহাস গড়িতে পারিলেন না, কারণ সে সময়ে উহার উপাদানগুলি হাতে পাওয়া যাইত না, তাহার মধ্যে অনেকগুলির অস্তিত্ব, এমন কি নাম পর্য্যন্ত, তখন জানা ছিল না। সুতরাং বঙ্কিমের পক্ষে মনের মত ভারত-ইতিহাস রচনা করা অসম্ভব হইল। কিন্তু তিনি তাহাতে বিরত হইলেন না। “ভারতকলঙ্গ”, “বাঙ্গালার ইতিহাস”, “বাঙ্গালার ইতিহাস সম্বন্ধে কয়েকটি কথা” নামক প্রবন্ধগুলিতে মনের ক্ষোভ ও আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করিলেন। তাহার পর, অপর দিকে ফিরিয়া মনশ্চক্ষু দিয়া আমাদের অতীত যুগকে নিজের সম্মুখে সৃষ্টি করিয়া তাহার জীবনপ্রবাহ আমাদের কাছে আনিয়া দেখাইলেন। এই অন্তর্নিহিত ভাবধারাই তাঁহার ঐতিহাসিক উপন্যাসগুলির–বিশেষতঃ শেষের তিনখানির–সৃষ্টিরহস্য এবং সাহিত্যিক আকারের কারণ দেখাইয়া দেয়। এগুলিতে ঘটনা, চরিত্র, আচার-ব্যবহার ও কথাবার্ত্তার পরিকল্পনায় বঙ্কিম অনেকটা ঐতিহাসিক সত্য দিয়াছেন বটে, কিন্তু তিনি ইচ্ছা করিয়াই এই গ্রন্থগুলিতে সেই সেই কালের জ্ঞাত জীবন ও ঘটনার নিচক সত্য ফোটোগ্রাফ আঁকেন নাই। প্রায় সকল ফোটোগ্রাফই মানুষের বাহ্য আকৃতির প্রাণহীন ছবি হয়; আর শ্রেষ্ঠ শিল্পীর অঙ্কিত চিত্র–যেমন লিউনার্দো দা ভিঞ্চি, রেম্ব্রাণ্ট অথবা স্যর্ জোশুয়া রেনল্ডসের হাতের বিখ্যাত প্রতিকৃতিগুলি যেন সেই সব স্ত্রীপুরুষের অন্তর তাহাদের মুখের ভঙ্গিতে চোখের চাহনিতে প্রকাশ করিয়া দেয়; একবার দেখিলে ভুলা যায় না, যতই বেশী দেখা যায়, ততই যেন নূতন নূতন ভাব দর্শকের মনে জাগাইয়া দেয়। বঙ্কিমের উপন্যাসে এই গুণটি আছে বলিয়াই এগুলি অমর হইবে।
‘আনন্দমঠে’র মধ্যে ঐতিহাসিক সত্য কতটুকু? যদিও ইহাতে বর্ণিত লোকগুলি ইতিহাস হইতে তুলিয়া লওয়া নহে, তথাপি এ কথা স্বীকার করিতেই হইবে যে, এই গ্রন্থে সেই যুগের রাজনৈতিক এবং সামাজিক অবস্থা ঠিক প্রতিফলিত হইয়াছে, এবং ইহার প্রধান ঘটনাটি নিছক সত্য, ইতিহাস হইতে আগাগোড়া ধার করা। পলাশীর যুদ্ধের দুই শত বৎসর আগে হইতে দিল্লীর বাদশাদের প্রবল শক্তির সময়ে ভূভারত জুড়িয়া অতি সুন্দর শাসনপ্রণালী, শান্তি (ঠিক Pax Britannica-র পূর্ব্বাভাষ) এবং সভ্যতার বিকশিত হয়, এ কথা আমি কত কত ইংরেজী গ্রন্থে প্রমাণ পাইয়াছি। আবার ইংরেজী আমল দৃঢ়বদ্ধ হইবার পর আমরা এই দানগুলি ততোধিক পরিমাণে পাইতেছি। কিন্তু যখন মুঘল শাসন ও সভ্যতার অর্দ্ধচন্দ্র ডুবিয়াছে, অথচ ব্রিটিশেরা নিজ হাতে সাম্রাজ্যশাসন লইতে কুণ্ঠিত, শুধু বাণিজ্য এবং টাকা-আদায় ছাড়া বাঙ্গলায় কোন কাজ করিবেন না, সেই আঠার বৎসর–পলাশীর যুদ্ধ হইতে হেষ্টিংস কর্ত্তৃক শাসন-সংস্কার আরম্ভ পর্য্যন্ত– বাঙ্গলার পক্ষে যে কি ভীষণ কাল ছিল, তাহা সকল সাহেব-লেখকই স্বীকার করিয়া গিয়াছেন। মেকলের চক্ষে বাঙ্গালীরা– কি হিন্দু, কি মুসলমান–সমান ঘৃণার পাত্র, মনুষ্য নামের উপযুক্ত কি না সন্দেহ। অথচ তিনি তাঁহার “লর্ড ক্লাইভ” এবং “ওয়ারেন্ হেষ্টিংস” নামক দুইটি জগদ্বিখ্যাত প্রবন্ধে এই অত্যাচার-অবিচারের জ্বলন্ত চিত্র দিয়াছেন। “Then was seen what we believe to be the most frightful of all spectacles, the strength of civilisation without its mercey.” (পাঠক Everyman’s Library edition, Macaulay’s Essays, vol i, pp. 560, 541, 555 ইত্যাদি দেখিবেন।) অতি আধুনিক অধ্যাপক রাম্জে মূয়র সেই সময়কে Power without responsibility-র যুগ বলিয়া নিন্দা করিয়াছেন।
আর সেই মন্বন্তরের সময় দেশের হর্ত্তাকর্ত্তা মুহম্মদ রজা খাঁ কি কাজ করিলেন? স্বয়ং হেষ্টিংস তাঁহার বিলাতের প্রভুদের জানাইতেছেন:– “The effects of the dreadful Famine which visited these Provinces in the year 1770 and raged during the whole course of that year, have been made known to you. … Notwithstanding the loss of at least one-third of the inhabitants of the Province, and the consequent decrease of the cultivation, the nett collction of the year 1771 exceeded even those of 1768 [অর্থাৎ দুর্ভিক্ষের পূর্ব্বে ষোল আনা ফসল জন্মানর বৎসর]…. It was to be naturally expected that the diminution of the Revenue shou’d have kept an equal pace with the other Consequences of so great a Calamity. That it did not, was owing to its being violently kept up to its former Standard. One tax [called Najay নাজাই]…equally impolitic in its Institution and oppressive in the mode of exacting it,” ইত্যাদি। – W. Hastings to the Court of Directors, dated 3 Nov. 1772. Forrest, London ed., ii 263 et seq.][১]
হেষ্টিং এই পত্রে দেখাইয়াছেন যে–
| বাঙ্গালা সাল | বাঙ্গলা দেশে রাজস্ব টাকা আদায় | ||
| ১১৭৫ | [দুর্ভিক্ষ হইতে সম্পূর্ণ মুক্ত] | ১ ক্রোড় ৫২ লক্ষ | |
| ১১৭৬ | [অল্প অল্প অজন্মা, শস্যের দাম চড়িল] | ১ ক্রোড় ৩১ লক্ষ | |
| ১১৭৭ | [সমস্ত বৎসর দুর্ভিক্ষ] | ১ ক্রোড় ৪০ লক্ষ | |
| ১১৭৮ | [প্রায় অর্দ্ধেক দেশ উজাড়, চাষী নাই, চাষ বন্ধ] | ১ ক্রোড় ৫৭ লক্ষ | |
ভিন্সেণ্ট স্মিথ্ (নিতান্ত নেটিভ-প্রেমী নহেন) লিখিতেছেন— “The revenue affairs were solely in charge of Md. Raza Khan, who did not worry about the sufferings of the people. He collected the revenue almost in full and added 10 per cent for 1771.”–(Oxford History, p. 508.)
ভারতে মুসলমান-শাসনের সেই অবনতির যুগে রাজকর্ম্মচারীদের অসহ্য অত্যাচারের ফলে হিন্দু প্রজারা ক্ষেপিয়া বিদ্রোহী ও দলবদ্ধ হইয়া উঠিল, এটা ঐতিহাসিক সত্য। বিখ্যাত লেখক সৈয়দ ঘুলাম হুসেন তবাতবাই (সিয়র্-উল্-মুতাখ্খরীন-রচয়িতা) তাঁহার সেই সৰ্ব্বজন-আদৃত ইতিহাসে ইহার আর একটি দৃষ্টান্ত দিয়াছেন; তিনি লিখিয়াছেন– “আজ্ আহদ্-ই মুইন্-উল-মুলক” হইতে “বহম্ রসীদ্” পর্য্যন্ত (ঐ মূল ফারসী গ্রন্থ, ১৮৩৩ খ্রীষ্টাব্দে মুদ্রিত আদি সংস্করণ, ৩য় ভাগ, ৫০-৫১ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য); অর্থাৎ “মুইন্-উল্-মুল্ক্ (পঞ্জাবের সুবাদার)এর সময় হইতে…এই সুবাগুলির আয়ে ব্যয় পোষাইত না। সে জন্য প্রজাদের উপর অত্যাচার চলিতে লাগিল। তাহারা দুর্ব্বল, কোন আশ্রয় বা পলাইবার স্থান পাইল না। শিখ সম্প্রদায় মধ্যে পরস্পরকে সাহায্য করা কর্ত্তব্য– এমন কি, ধর্ম্মের অংশ বলিয়া গণ্য হইত। সুতরাং যেখানেই অত্যাচার হইত, সেই বাড়ীর লোক মাথার চুল লম্বা রাখিয়া, ‘[শ্রী] অকাল, অকাল!’ এই রব করিয়া গুরুগোবিন্দের পন্থ গ্রহণ করিবার ইচ্ছা প্রকাশ করিত, এবং অপর শিখগণ তাহাদের সমর্থন করিতে প্রবৃত্ত হইত।”
ঠিক সেই কারণে, সেই শতাব্দীতে, বাঙ্গলায়ও জোট বাঁধিয়া “সন্তানেরা” বিদ্রোহী হয়, ইহা বঙ্কিম দেখাইয়াছেন।
সত্য বটে, লোক তারিখ ও ঘটনার খুঁটিনাটি দেখিতে গেলে তাঁহার এই শ্রেণীর উপন্যাসে অনেক অভাব, অনেক স্বকপোলকল্পনা ধরা পড়িবে, এমন কি, বর্ত্তমান সময়ে চলিত স্কুলপাঠ্য ইতিহাস হইতেও এগুলি অনেক স্থলে ভুল বা ফাঁকা ফাঁকা বলিয়া মনে হইবে। কিন্তু ইহাতে আছে মানুষের জীবন্ত ছবি। বঙ্কিমের পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় সেই অতীত ভারতের স্থলে স্থলে কল্পিত ব্যক্তিগণ নিজ প্রকৃত চরিত্র দেখাইয়া আমাদের নিকট অতি ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হইতেছেন; আমরা সেই সেই যুগের ভারতের গ্রাম-নগর, নর-নারী, অবিস্মরণীয় কোন কোন মহাপুরুষদের চাক্ষুষ সাক্ষাৎ পাইতেছি; তাঁহাদের এবং তাঁহাদের সময়কে নিজ পাড়াপ্রতিবাসীর, নিজ ঘরের লোকের মত চিনিতে পারিতেছি। তাঁহার এই উপন্যাস কয়টিতে ইতিহাস হইতে জানা পুঙ্খানুপুঙ্খ এবং নিখুঁত সব সত্য নাই কেন? তাহার এক কারণ, বঙ্কিমচন্দ্র সেই সেই যুগের ফোটোগ্রাফ দিতে আদৌ চান নাই; তিনি এগুলিকে গদ্য-কাব্য আকারে সৃষ্টি করিবেন, লোকশিক্ষার যন্ত্র করিবেন বলিয়া কলম ধরিয়াছিলেন। কিছু কিছু বাস্তব সত্য ইতিহাস হইতে লইয়া, তাহাতে তাঁহার অদ্বিতীয় চরিত্রসৃষ্টির কল্পনা যোগ করিয়া, সবটার মধ্যে নিজ ঊর্দ্ধপ্রবাহিণী ভাবধারা[২] ঢালিয়া দিয়া এই গ্রন্থগুলির প্রাণপ্রতিষ্ঠা করিলেন, এক অপুর্ব সামগ্রী বাঙ্গলা সাহিত্যকে দান করিলেন।
দ্বিতীয় কারণ এই যে, আমাদের দেশ সম্বন্ধে ঐতিহাসিক মসলার অভাবে উপন্যাস-লেখক–অনেক স্থলে পেশাদার ঐতিহাসিকও— কল্পনার সাহায্যে ফাঁক পুরাইতে বাধ্য হন। এ কথাটা অতি পরিষ্কার বুঝা যাইবে, যদি আমরা তাঁহার ‘আনন্দমঠে’র সহিত স্কটের ‘ওল্ড্ মর্টালিটি’র তুলনা করি। দুইটি গ্রন্থই বিদ্রোহী সন্ন্যাসী বা ধর্ম্মোন্মত্ত’ যোদ্ধাদের রাজশক্তির সহিত সংঘর্ষের কাহিনী। কিন্তু স্কটের গ্রন্থে কভেনাণ্টারদের বাক্য ও কার্য্যগুলির প্রায় সমস্তই ইতিহাসে পাওয়া যায়, কারণ তাহাদের কথাবার্ত্তার রিপোর্ট এবং তাহাদের লিখিত পুস্তিকা ও অসংখ্য চিঠি বর্ত্তমান আছে; ইতিহাস-লেখক ঐ বিদ্রোহীদের ঘরের কথা তাহাদের মুখ হইতেই শুনিতে পাইতেছেন; তাহার উপর প্রতিপক্ষের অর্থাৎ গবর্ণমেন্টের কাগজপত্র কাহিনী তো আছেই। কিন্তু বিদ্রোহী সন্তানগণ নিরক্ষর; তাহারা বা তাহাদের দলের ভিতরে প্রবেশ করিয়া অন্য কেহ সে সময়ে কোন বিবরণ লিখিয়া যায় নাই; তাই আজ আমাদের একমাত্র পুঁজি হেষ্টিংস লাটের কয়খানা চিঠি এবং রেকর্ড অফিসে রক্ষিত নিম্ন ইংরেজ কর্ম্মচারীর কয়খানা রিপোর্ট, সুতরাং এখানে একতরফা অসম্পূর্ণ ব্যাখ্যানের উপর নির্ভর করিয়া ঐ যুগের ঘটনার বিবরণ ও মানবচরিত্র সৃষ্টি করা ভিন্ন আমাদের আর উপায় নাই।
কিন্তু এটা সত্যসত্যই ক্ষতির কারণ নহে। বঙ্কিমের ঐতিহাসিক উপন্যাসগুলিতে এমন পদার্থ আছে যাহা “পাথুরে, বিজ্ঞানসম্মত” ইতিহাসে কখন পাওয়া যায় না। সেটি সেই যুগের প্রাণ। ইহার একটা দৃষ্টান্ত দিতেছি। লীটন যখন তাঁহার “লাষ্ট্ ডেজ্ অব্ পম্পি” লেখেন, তাহার পূর্ব্বে অনেক দিন ধরিয়া পম্পি-নগরী ধ্বংস হইবার সময় যে সব গ্রীক ও রোমান লোক তথায় বাস করিত তাহাদের ঘরকন্না, হাটবাজার, নাট্যশালা, কাছারি, দৈনিক জীবন ও চিন্তা, মন্দির ও গৃহ নির্ম্মাণ প্রভৃতি বিষয়ে পণ্ডিতদের লেখা অনেক অনেক পুস্তক পড়িয়া এগুলির বিস্তৃত অতি নিখুঁত চিত্র আঁকিয়াছিলেন, যেন সেই যুগে সেই শহরের কতকগুলি ফোটোগ্রাফ দিয়াছেন। লীটনের নভেলখানিতে বাহ্য পরিচ্ছদ ঠিক আছে, অবিকল সত্য; কিন্তু উহার মধ্যে প্রাণ কই? উহার মধ্যকার মানবচরিত্রগুলি চিরস্মরণীয় হইয়া থাকে নাই কেন? সমালোচক মেকলে ঠিক বলিয়াছেন যে, এডিসনের মত পণ্ডিত ক্লাসিকাল্ স্কলারের রচিত কেটো নাটকের মহাসম্ভ্রান্ত রোমান্ সিনেটর অপেক্ষা স্কটের উপন্যাসে বর্ণিত বর্ব্বর দরিদ্র ডাকাত মস্টরুপার অনেক বড়, কারণ অধিকতর জীবন্ত, অধিকতর বাস্তব। এই পরীক্ষায় বঙ্কিমের ঐতিহাসিক চরিত্রগুলি অপরাজিত, সাহিত্য সর্ব্বপ্রথম পদ অধিকার করিয়াছে।
বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠে’র প্রথা লীটনের পন্থার বিপরীত। প্রথমেই তো গোড়ায় গলদ; তাহার ‘সন্তানেরা’ বাঙ্গালী ব্রাহ্মণ কায়স্থের ছেলে, গীতা যোগশাস্ত্র প্রভৃতিতে পণ্ডিত; কিন্তু যে সব “সন্ন্যাসী ফকিরেরা” সত্য ইতিহাসের লোক, এবং উত্তরবঙ্গে (বীরভূম নহে) ঐ সব অত্যাচার করে তাহারা এলাহাবাদ কাশী ভোজপুর প্রভৃতি জেলার পশ্চিমে লোক এবং প্রায় সকলেই নিরক্ষর, ভগবদ্গীতার নাম পর্য্যন্ত জানিত না। বঙ্কিমের সন্তানসেনা বৈষ্ণব, আর আসল “সন্ন্যাসী”রা ছিল শৈব, আজ পর্য্যন্ত তাহাদের নাগা-সম্প্রদায় চলিয়া আসিতেছে, যদিও ইংরেজের ভয়ে তাহারা এখন অস্ত্র রাখিতে বা লুঠ করিতে পারে না। এই সব সন্ন্যাসী গোঁসাই যোদ্ধাদের প্রকৃত ইতিহাস “রাজেন্দ্রগিরি গোঁসাই” (মৃত্যু দিল্লীর বাহিরে যুদ্ধে, ১৭৫৩ খ্রীষ্টাব্দে) এবং তাহার চেলা “হিম্মৎ বাহাদুর” সম্বন্ধে রচিত ফারসী গ্রন্থ এবং হিন্দী “হিম্মৎ বাহাদুর বিরুদাবলী” প্রভৃতিতে পাওয়া যায়। বাঙ্গলার বিপ্লবকারী সন্ন্যাসীদের অতি মূল্যবান সত্য বিবরণ ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁহার Dawn of New India (1927)তে এবং রায় সাহেব যামিনীমোহন ঘোষ তাঁহার Sannyasi Fakir Raiders of Bengal গ্রন্থে (Bengal Secretariat Book Depot, 1930) দিয়াছেন। পাঠক উৎসুক হইলে এ দুইখানি ইতিহাস পড়িবেন।
সত্যকার সন্ন্যাসী ফকিরেরা অর্থাৎ পশ্চিমে গিরিপুরীর দল, একেবারে লুঠেড়া ছিল, কেহ কেহ অযোধ্যা সুবায় জমিদারিও করিত; মাতৃভূমির উদ্ধার, দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন উহাদের স্বপ্নেরও অতীত ছিল, এই মহাব্রত চট্টোপাধ্যায় মহাশয়ের কল্পনায় সৃষ্ট কুয়াশা মাত্র। সুতরাং ইতিহাসের দিক্ দিয়া দেখিতে গেলে ‘আনন্দমঠে’ বর্ণিত নরনারী এবং তাহাদের কার্য্য ও কথা (ইংরেজ সৈন্যের সহিত দুইটা খণ্ডযুদ্ধ বাদে) অনেকাংশে অসত্য এবং এ বইখানি কোন মতেই ঐতিহাসিক এই বিশেষণ পাইতে পারে না।
সে কথা মানিলাম। কিন্তু ‘আনন্দমঠ,’ ‘দেবী চৌধুরাণী’ ও ‘সীতারামে’র মধ্যে যে অমৃতরস আছে তাহা এ তিনখানি গ্রন্থ অপেক্ষা শতগুণ বেশী “সত্য” ঐতিহাসিক কোন উপন্যাসে পাওয়া যায় না। সেই রস বঙ্কিমচন্দ্রের হৃদয়ের ঊর্দ্ধপ্রবাহিণী ভাবধারা-রূপ উৎস হইতে অবিরাম ঝরিতেছে। এই গ্রন্থগুলিতে তিনি দৃষ্টান্ত দিয়া দেখাইয়াছেন যে, আত্মসংযম ও ধর্ম্ম-অনুশীলনের ফলে মানব-চিত্ত ক্রমেই উচ্চ হইতে উচ্চতর নৈতিক সোপানে উঠিতে থাকে, অবশেষে এই সব কর্ম্মযোগীরা আর পার্থিব রক্তমাংসের নরনারী থাকে না, নরদেহে দেবতা বা বোধিসত্বে পরিণত হইয়া যায়। এই যোগসাধনা বড় কঠিন, এই ক্রমোন্নতির পথ যেন ফুরায় না; যেমন ‘চৈতন্যচরিতামৃতে’ রামানন্দ ভক্তির ভাবগুলি ব্যাখ্যা করিতেছেন, কিন্তু মহাপ্রভু সন্তুষ্ট হইতে পারিতেছেন না, তিনি ক্রমাগত দাবি করিতেছেন “আরও কহ” অর্থাৎ আরও উঁচুতে উঠ, আরও গভীরতর হৃদয়-স্তরে পৌঁছাও। বঙ্কিমের বর্ণিত আদর্শ ঠিক সেই মত কঠোর সাধনার ফল, ইহাতে সিদ্ধি অতি কম কয় জন পাইয়াছেন; ভবানন্দ জীবানন্দের মত লোক পর্য্যন্ত ব্রতভঙ্গ করিলেন। দেবী চৌধুরাণী “দশ বৎসর ধরিয়া বাঁধ বাঁধিয়াছিল,” কিন্তু তাহাকেও নিশি ঠাকুরাণী বলিতে বাধ্য হইলেন, “এই কি তোমার নিষ্কাম ধৰ্ম্ম? এই কি সন্ন্যাস? তুমি সন্ন্যাস ত্যাগ করিয়া ঘরে যাও।”
এই নিষ্কাম ধর্ম্মের অনুশীলনের যে জীবন্ত দৃষ্টান্তগুলি বঙ্কিম অতুলনীয় তুলি দিয়া আঁকিয়াছেন, তাহা পড়িতে পড়িতে আমাদের মন এক অনির্ব্বচনীয় স্ফুৰ্ত্তিতে সতেজ হইয়া উঠে; আমরাও যেন ইহাদের সঙ্গে সঙ্গে উঁচু হইতেছি; নিজ জীবনে কৃচ্ছ সাধনা করিবার, নৈতিক উন্নতির চরমে উঠিবার আকাঙ্ক্ষা আমাদের মনেও জাগিয়া উঠে; আবার পরক্ষণেই হতাশা ও অবসাদ আসিয়া আমাদিগকে মর্ত্ত্যে নামাইয়া দেয়। আগুনে পোড়াইয়া হাতুড়ি পিটিয়া লোহাকে যেমন ইস্পাত করা হয়, তেমনই বড় দৈন্য, বড় দুঃখ, বড় কঠোর সংযমের ভিতর দিয়া শান্তি ও জীবানন্দ, দেবী ও শ্রী গড়িয়া উঠিয়াছিল। এই মহান্ আদর্শ আকাশের রামধনুর মত চিরদিন দূর হইতে মানবকে আহ্বান করিতে থাকিবে—বিশ্বমানবকে, আমাদের জাতিকে, মৃতসঞ্জীবনী সুধা দিতে থাকিবে। এই গ্রন্থগুলি পড়িতে পড়িতে মনে হয় যেন এই মর্ত্ত্যলোকের অতীত এক নূতন জগতের প্রবেশদ্বার হঠাৎ খুলিয়া গেল, তাহার ভিতর দিয়া ‘অলোক আলোকে’ উদ্ভাসিত এক কল্পনার মায়াপুরী অল্প অল্প দেখা দিতেছে। ইহাই সৰ্ব্বশ্রেষ্ঠ কাব্যের চিহ্ন; ইহার জন্যই ‘আনন্দমঠ, ‘দেবী চৌধুরাণী,’ ‘সীতারামে’র অমরত্ব।
একখানা প্রাচীন প্রস্তরে এই বৌদ্ধ মন্ত্রটি খোদা আছে (সহজ সংস্কৃত আকারে দিলাম):–
ত্রিণি অমৃত-পদানি সু-অনুষ্ঠিতানি
নিয়ন্তি স্বর্গম্–দম ত্যাগ অপ্রমাদঃ ৷
“তিনটি অমৃত-পদ মানুষকে স্বর্গে পৌঁছাইয়া দেয়; সে তিনটি— আত্মসংযম, স্বার্থত্যাগ, এবং স্থির সত্য বুদ্ধি।” ইহাতে গীতার শিক্ষা এক কথায় ব্যক্ত হইয়াছে; ইহাই বঙ্কিমের ঐতিহাসিক উপন্যাসের প্রতিপাদ্য বিষয়; এই জন্যই সেগুলি পাঠকচিত্ত উদ্বেলিত করিয়া দেয়, সুখ দেয় না।
আর এক শ্রেণীর উপন্যাস আছে, অতি প্রতিভাশালী কথাশিল্পীর রচনা; তাহাতে জ্বলন্ত বর্ণে প্রবৃত্তিমার্গ চিত্রিত হইয়াছে; তাহার নায়িকা শ্রীমতী গাভী (মাদাম বোভারি), যেদিকে বাসনা সেই দিকে গা ঢালিয়া দিয়া যান এমন সহজে এমন সুন্দররূপে যে পাঠক-পাঠিকা তাহাতে অজ্ঞাতসারে প্রলুব্ধ হয়। বিশ্ব সাহিত্যে এগুলি হয়তো চিরদিন পড়িবার লোক পাইবে, কিন্তু ইহারা পাঠককে স্বর্গে লইয়া যাইতে পারিবে না, এগুলি
নিয়ন্তি স্বপ্নম্—
অর্থাৎ পড়িয়া আরামে ঘুম পায়, একেবারে মনে ভাবনা-চিন্তার উদ্রেক হয় না, ইহারা বিবেককে নাড়া দেয় না। বঙ্কিম সে পথে যান নাই।
আজ ৪৪[৩] বৎসর হইল বঙ্কিমচন্দ্র আমাদের গগন হইতে অপসৃত। কিন্তু তাঁহার মহাকাব্য ‘আনন্দমঠে’র নিভৃত রস যে পান করিয়াছে, সেই যেন দিব্যচক্ষে দেখিতেছে যে, আমাদের জাতীয়তায় দীক্ষার ঋষি জ্যোতিমর্ণ্ডিত দেহে হিমাচলের শিখরে দাঁড়াইয়া সমগ্র ভারতবাসীকে ডাকিতেছেন–
স্বাৰ্থ হ’তে জাগ, দৈন্য হ’তে জাগ,
সব জড়তা হ’তে জাগ, জাগ রে,
সতেজ উন্নত শোভাতে।
মুক্তি কোন্ পথে, এ প্রশ্নের উত্তর ইহাই।
শ্রীদুনাথ সরকার
টিকা ও মন্তব্য
- ↑ইহার তিন বৎসর পূর্ব্বে মুর্শিদাবাদ হইতে রেসিডেণ্ট বেচা সাহেবের লেখা পত্রেও প্রজা অকথ্য দুর্দ্দশা স্বীকার করা হইয়াছে। C. H. I., v. 207.
- ↑আইডিয়ালিজ্ম্ কথাটাকে যদি ‘আদর্শবাদ’ বলি, তবে এ অনুবাদে ইংরাজীর গন্ধ থাকিয়া যাইবে, তাই উপরের কথাটি ব্যবহার করিব। তেমনি “শিক্ষার বাহন” (vehicle) এই অদ্ভুত শব্দটা শ্রীশ্রীশীতলা দেবীর বাহনকেই প্রথমে মনে পড়ে!
- ↑বর্তমানে একশত ত্রিশের অধিক।