আনন্দমঠ

গ্রন্থকথা

সম্পাদকীয়

এই পাতাটি মূল গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত নয়!

‘আনন্দমঠে’র ঐতিহাসিকত্ব সম্বন্ধে স্যর্ যদুনাথ সরকার লিখিত একটি ভূমিকা এই গ্রন্থমধ্যে সন্নিবিষ্ট হইয়াছে। ইতিহাসের দিক্‌ দিয়া ‘আনন্দমঠ’ সম্পর্কে যাবতীয় জ্ঞাতব্য তথ্য ঐ ভূমিকায় দেওয়া হইয়াছে। ‘দেবী চৌধুরাণী’র “বিজ্ঞাপনে” (১৮৮৪ খ্রীঃ) স্বয়ং বঙ্কিমচন্দ্ৰ ‘আনন্দমঠে’র ঐতিহাসিকত্ব সম্বন্ধে যাহা বলিয়াছেন তাহাও স্মরণীয়।

“আনন্দমঠ” প্রকাশিত হইলে পর, অনেকে জানিতে ইচ্ছা প্রকাশ করিয়াছিলেন, ঐ গ্রন্থের কোন ঐতিহাসিক ভিত্তি আছে কি না। সন্ন্যাসী-বিদ্রোহ ঐতিহাসিক বটে, কিন্তু পাঠককে সে কথা জানাইবার বিশেষ প্রয়োজনের অভাব। এই বিবেচনায় আমি সে পরিচয় কিছুই দিই নাই। ঐতিহাসিক উপন্যাস রচনা আমার উদ্দেশ্য ছিল না, সুতরাং ঐতিহাসিকতার ভাণ করি নাই। এক্ষণে দেখিয়া শুনিয়া ইচ্ছা হইয়াছে, আনন্দমঠের ভবিষ্যৎ সংস্করণে সন্ন্যাসী বিদ্রোহের কিঞ্চিৎ ঐতিহাসিক পরিচয় দিব। …পাঠক মহাশয়, অনুগ্রহপূর্ব্বক আনন্দমঠকে … ”ঐতিহাসিক উপন্যাস” বিবেচনা না করিলে বড় বাধিত হইব।

‘আনন্দমঠে’র তৃতীয় সংস্করণের (১৮৮৬ খ্রীঃ) দুইটি Appendix-এ Gleig’s Memoirs of the Life of Warren Hastings এবং Hunter’s Annals of Rural Bengal হইতে বঙ্কিমচন্দ্র সন্ন্যাসী-বিদ্রোহের কিঞ্চিৎ “ঐতিহাসিক পরিচয়” দিয়াছেন।

ইতিহাস ছাড়াও অন্য নানা কারণে ‘আনন্দমঠে’র প্রসিদ্ধি। এই উপন্যাস এবং ইহার অন্তর্গত ‘বন্দে মাতরম্’ সঙ্গীত সম্বন্ধে স্বদেশে ও বিদেশে যত আলোচনা হইয়াছে, বঙ্কিমচন্দ্রের অন্য কোনও রচনা ল‍ইয়া তত আলোচনা হয় নাই। পরবর্ত্তী কালে বঙ্গদেশে এবং পরে সমগ্র ভারতবর্ষে যে স্বদেশী-আন্দোলনের বন্যা দেশের আপামর সাধারণকে চঞ্চল এবং শাসক-সম্প্রদায়কে ব্যতিব্যস্ত করিয়াছিল, সরকারী এবং বেসরকারী সকল সমালোচক, সন্তান-বিদ্রোহের সহিত তাহার যোগসূত্র খুঁজিয়া বাহির করিয়াছেন; এই কারণে ‘আনন্দমঠ’ ও ‘বন্দে মাতরমে’র কম দুৰ্গতি হয় নাই। ক্ষুব্ধ মুসলমান-সম্প্রদায় এই পুস্তকে ইসলাম-বিরোধিতা এবং উক্ত সঙ্গীতে পৌত্তলিকতা প্রত্যক্ষ করিয়া বিরুদ্ধ আন্দোলন করিয়াছেন; এই আন্দোলনের শেষ এখনও হয় নাই।

সাহিত্য ও সমাজের দিক্ দিয়াও বঙ্কিমচন্দ্র তাঁহার পূর্ব্ববর্ত্তী উপন্যাসের ধারা ত্যাগ করিয়া ‘আনন্দমঠে’ সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ ধরিয়াছেন; এখানে তাঁহার সৃষ্টি উদ্দেশ্যমূলক হইয়া উঠিয়াছে। তাঁহার পরবর্ত্তী দুইটি উপন্যাসে ‘দেবী চৌধুরাণী’ ও ‘সীতারাম’— এই শেষোক্ত ধারারই পরিণতি; বস্তুত, তাঁহার এই শেষ উপন্যাস তিনটি উদ্দেশ্য ও প্রচারদোষ-দুষ্ট বলিয়া বহু সাহিত্যিকের নিন্দাভাজন হইয়াছে; আবার অনেকে এই “উপন্যাস-ত্রয়ী”কে তাঁহার পরিণত বয়সের মহোত্তম কীৰ্ত্তি বলিয়া ঘোষণা করিয়াছেন। প্রথমোক্ত দলে রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র এবং শেষোক্ত দলে শ্রীঅরবিন্দ, পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায় ও মোহিতলাল মজুমদার।

১২৮৭ বঙ্গাব্দের চৈত্র মাস হইতে সঞ্জীবচন্দ্র-সম্পাদিত ‘বঙ্গদর্শনে’ ‘আনন্দমঠ’ ধারাবাহিক ভাবে বাহির হইতে থাকে; ১২৮৯ বঙ্গাব্দের জ্যৈষ্ঠ মাসে উহা সমাপ্ত হয়। ১২৮৯ সালেই (ইংরেজী ১৮৮২ খ্রী.) পুস্তকাকারে ‘আনন্দমঠে’র প্রথম সংস্করণ “কলিকাতা জন্‌সন্ প্রেসে শ্রীরাধানাথ বন্দ্যোপাধ্যায় কর্তৃক মুদ্রিত” হইয়াছিল। এই পুস্তক স্বৰ্গীয় দীনবন্ধু মিত্রকে উৎসর্গীকৃত হয়। প্রথম সংস্করণ— উপক্রমণিকা ১, প্রথম খণ্ড ২৫ ও দ্বিতীয় খণ্ড ২০,—মোট ৪৬ পরিচ্ছেদে ১৯১ পৃষ্ঠায় সম্পূর্ণ হইয়াছিল। বঙ্কিমচন্দ্রের জীবিতকালের শেষ সংস্করণে (৫ম সং.) ইহা উপক্রমণিকা ১, প্রথম খণ্ড ১৮, দ্বিতীয় খণ্ড ৮, তৃতীয় খণ্ড ১২ ও চতুর্থ খণ্ড ৮—মোট ৪৭ পরিচ্ছেদে ২১১ পৃষ্ঠায় সম্পূর্ণ হয়। এখনকার দ্বিতীয় খণ্ড, প্রথম পরিচ্ছেদটি চতুর্থ সংস্করণের পর ও পরিশিষ্ট দুইটি দ্বিতীয় সংস্করণের পর নুতন সংযোজন। ‘বঙ্গদর্শনে’ প্রকাশিত “উপক্রমণিকা”র সহিত গ্রন্থাকারে প্রকাশিত “উপক্রমণিকা”র বিশেষ পার্থক্য আছে—

প্রতিশব্দ হইল, “এ পণে হইবে না।”

“আর কি আছে? আর কি দিব।”

তখন উত্তর হইল, “তোমার প্রিয়জনের প্রাণসৰ্ব্বস্ব।”

—‘বঙ্গদর্শন’, চৈত্র ১২৮৭, পৃ. ৫৩৯।

পুস্তকে “এ পণে হইবে না” স্থলে “জীবন তুচ্ছ; সকলেই ত্যাগ করিতে পারে” এবং “তোমার প্রিয়জনের প্রাণসর্বস্ব” স্থলে “ভক্তি” লিখিত হইয়াছে। এই সামান্য পরিবর্ত্তনেই পুস্তকের মূল আদর্শের সম্পূর্ণ পরিবর্ত্তন ঘটিয়াছে।

১২৮১ সালের কাৰ্ত্তিক সংখ্যা ‘বঙ্গদর্শনে’ “কমলাকান্তের দপ্তর। একাদশ সংখ্যা। আমার দুর্গোৎসব” প্রকাশিত হয়। বঙ্কিমচন্দ্র সেই প্রথম জন্মভূমির মাতৃরূপ দর্শন করিলেন। ‘আনন্দমঠে’র মূল আদর্শ এই পরিকল্পনারই পরিণতি। এই পরিণতি বুঝিতে হইলে আমাদিগকে গোড়ার কথাগুলিও স্মরণ করিতে হইবে—

দেখিলাম—অকস্মাৎ কালের স্রোত, দিগন্ত ব্যাপিয়া প্রবলবেগে ছুটিতেছে—আমি ভেলায় চড়িয়া ভাসিয়া যাইতেছি। দেখিলাম— অনন্ত, অকূল, অন্ধকারে, বাত্যাবিক্ষুদ্ধ তরঙ্গসঙ্কুল সেই স্রোত—মধ্যে মধ্যে উজ্জ্বল নক্ষত্রগণ উদয় হইতেছে, নিবিতেছে—আবার উঠিতেছে। আমি নিতান্ত একা—একা বলিয়া ভয় করিতে লাগিল—নিতান্ত একা—মাতৃহীন— মা! মা! করিয়া ডাকিতেছি। আমি এই কাল-সমুদ্রে মাতৃসন্ধানে আসিয়াছি। কোথা মা! কই আমার মা? কোথায় কমলাকান্ত-প্রস্থতি বঙ্গভূমি! এ ঘোর কাল-সমুদ্রে কোথায় তুমি? … চিনিলাম, এই আমার জননী জন্মভূমি—এই মৃণ্ময়ী—মৃত্তিকারূপিণী—অনন্তরত্নভূষিতা—এক্ষণে কালগর্ভে নিহিতা। রত্নমণ্ডিত দশভূজ দশ দিক্—দশ দিকে প্রসারিত; তাহাতে নানা আয়ুধরূপে নানা শক্তি শোভিত; পদতলে শত্রু বিমর্দ্দিত, পদাশ্রিত বীরজন কেশরী শত্রুনিপীড়নে নিযুক্ত! এ মূর্ত্তি এখন দেখিব না—আজি দেখিব না, কাল দেখিব না—কালস্রোত পার না হইলে দেখিব না—কিন্তু এক দিন দেখিব—দিগ্‌ভুজা, নানাপ্রহরণপ্রহারিণী, শত্রুমর্দ্দিনী, বীরেন্দ্রপৃষ্ঠবিহারিণী—দক্ষিণে লক্ষ্মী ভাগ্যরূপিণী, বামে বাণী বিদ্যাবিজ্ঞানমূর্ত্তিময়ী, সঙ্গে বলরূপী কার্ত্তিকেয়, কার্য্যসিদ্ধরূপী গণেশ, আমি সেই কালস্রোতোমধ্যে দেখিলাম এই সুবর্ণময়ী বঙ্গপ্রতিমা!

… তোমায় কি বলিয়া ডাকিব মা? এই ছয় কোটি মুণ্ড ঐ পদপ্রান্তে লুণ্ঠিত করিব —এই ছয় কোটি কণ্ঠে ঐ নাম করিয়া হুঙ্কার করিব, এই ছয় কোটি দেহ তোমার জন্য পতন করিব—না পারি, এই দ্বাদশ কোটি চক্ষে তোমার জন্য কাঁদিব। এসো মা, গৃহে এসো— যাঁহার ছয় কোটি সন্তান— তাঁহার ভাবনা কি?

এস, ভাই সকল! আমরা এই অন্ধকার কালস্রোতে ঝাঁপ দিই। এস, আমরা দ্বাদশ কোটি ভুজে ঐ প্রতিমা তুলিয়া, ছয় কোটি মাথায় বহিয়া, ঘরে আনি। এস, অন্ধকারে ভয় কি?…সেই স্বর্ণপ্রতিমা মাথায় করিয়া আনি। ভয় কি? না হয় ডুবিব; মাতৃহীনের জীবনে কাজ কি?

‘আনন্দমঠে’র মূলমন্ত্র ‘বন্দে মাতরম্’ সঙ্গীতের অন্তর্নিহিত তথ্য ইহাই—”মাতৃহীনের জীবনে কাজ কি?” ছয় কোটি বৃদ্ধি পাইয়া সপ্তকোটি হইয়াছে, তফাৎ এই মাত্র। আর তফাৎ “বন্দে মাতরম্” আশাবাদীর সঙ্গীত।

এই মাতৃপূজার সহিত ‘আনন্দমঠে’ অন্য যে একটি প্রবৃত্তি মাখামাখি হইয়া আছে, ১২৮১ বঙ্গাব্দের ফাল্গুন সংখ্যা ‘বঙ্গদর্শনে’র ‘কমলাকান্তের দপ্তরে’র “একটি গীতে” তাহার প্রথম দর্শন পাই; ‘আনন্দমঠ’ ঠিক ইহার আট বৎসর পরে পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়। হিন্দু জাতিকে স্বাধীন দেখিবার আকাঙ্ক্ষা বঙ্কিমের মনে কখনও নির্ব্বাপিত হয় নাই; যদিচ পরিণত বুদ্ধির সহায়তায় তিনি ভাল করিয়াই বুঝিয়াছিলেন, বর্ত্তমান অবস্থায় এই স্বাধীনতা হিন্দুর লক্ষ্য নয়। তাঁহার ‘আনন্দমঠে’র শেষ দৃশ্যে বিসর্জ্জন আসিয়া প্রতিষ্ঠাকে লইয়া গিয়াছে। তথাপি স্বাধীন হইবার এই প্রবৃত্তি তিনি কখনও পরিত্যাগ করেন নাই, এবং এই কারণেই ‘আনন্দমঠে’র সন্তানেরা মৃত্যু পণ করিয়াছিল। “একটি গীতে” দেখিতে পাই—

গণিব। আমার এক দুঃখ, এক সন্তাপ, এক ভরসা আছে। ১২০৩ শাল হইতে দিবস গণি। যে দিন বঙ্গে হিন্দুনাম লোপ পাইয়াছে, সেই দিন হইতে দিন গণি। যে দিন সপ্তদশ অশ্বারোহী বঙ্গজয় করিয়াছিল, সেই দিন হইতে দিন গণি! হায়! কত গণিব! দিন গণিতে গণিতে মাস হয়, মাস গণিতে গণিতে বৎসর হয়, বৎসর গণিতে গণিতে শতাব্দী হয়, শতাব্দীও ফিরিয়া ফিরিয়া সাত বার গণি।

…মনে মনে আমি সেই দিন কল্পনা করিয়া কাঁদি। মনে মনে দেখিতে পাই, মার্জ্জিত বর্শাফলক উন্নত করিয়া, অশ্বপদশব্দমাত্রে নৈশ নীরব বিঘ্নিত করিয়া, যবনসেনা নবদ্বীপে আসিতেছে। কালপূর্ণ দেখিয়া নবদ্বীপ হইতে বাঙ্গালার লক্ষ্মী অন্তর্হিতা হইতেছেন।

‘আনন্দমঠে’র সন্তানসম্প্রদায় বঙ্গজননীর এই লুপ্ত স্বাধীনতা ফিরাইয়া আনিবার সাধনা করিয়াছিলেন, কিন্তু বঙ্কিম স্বীয় অপরিসীম প্রবৃত্তি সত্ত্বেও তাঁহাদিগকে বিজয়-গৌরব দিতে পারেন নাই। ‘আনন্দমঠে’র ট্র্যাজেডি ইহাই।

১৮৮১ খ্রীষ্টাব্দের প্রারম্ভেই বঙ্কিমচন্দ্র হুগলী হইতে হাওড়ায় বদলি হন; হাওড়াতে আসিয়াই স্থানীয় কলেক্টর সি. ই. বাক্‌লণ্ডের সহিত তাঁহার বিবাদ বাধে, এবং ইহার অব্যবহিত পরেই তাঁহার পিতা যাদবচন্দ্রের মৃত্যু হয়। ‘আনন্দমঠ’ এই সময়ের রচনা। কেহ কেহ উপরি-উক্ত দুই ঘটনার সহিত ‘আনন্দমঠের কিছু সম্পর্ক খুঁজিয়া বাহির করিয়াছেন।[১]

‘আনন্দমঠ’ রচনা সম্পর্কে বঙ্কিম-সহোদর পূর্ণচন্দ্র লিখিয়াছেন,

বর্ষীয়ান খুল্লপিতামহের নিকট আমরা কয় ভ্রাতা ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের কথা প্রথম শুনি। ইহার গল্প করিবার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল।…কি প্রকারে তিল তিল করিয়া মন্বন্তর ভীষণ মূর্ত্তি ধারণ করিয়া বঙ্গদেশ ছারখার করিল, তাহা বিবৃত করিলেন। … এইরূপ অবস্থাতে বঙ্গে নানা প্রকার পীড়ার অবির্ভাব হইয়া, অবশেষে চুরি ডাকাতি আরম্ভ হইল। …এই গল্পটি আমি ভুলিয়া গিয়াছিলাম, কিন্তু আমার অগ্রজের উহা মনে ছিল; কেন না, ১৮৬৬ সালে উড়িষ্যায় দুর্ভিক্ষের সময়ে ঐ গল্পটি আবার তাঁহার মুখে শুনিলাম। আমার বোধ হয় ছিয়াত্তরের মন্বন্তর অবলম্বনে কোন উপন্যাস লিখিবার তাঁহার অনেক দিন ইচ্ছা ছিল, কিন্তু যৌবনে লেখেন নাই, কিঞ্চিৎ পরিণত বয়সে ‘আনন্দমঠ’ লিখিলেন। ‘বঙ্কিম প্রসঙ্গ, পৃ. ৫১-৫২।

জয়দেবের “ধীরসমীরে যমুনাতীরে বসতি বনে বনমালী” কবিতাটা তাঁহার বড় প্রিয় ছিল। কি বাল্যে, কি কৈশোরে, কি যৌবনে, এই কবিতাটা তাঁহার মুখে শুনিতাম; যখন নিষ্কৰ্ম্মা হইয়া বসিতেন, বাহিরের লোক কেহ ঘরে থাকিত না, তখন উহা আওড়াইতেন। ঐ কবিতাটা যে তাহার প্রিয় ছিল, তাহার স্মৃতি ‘আনন্দমঠে’ রাখিয়া গিয়াছেন, …

আর একটী গীত তাঁহার বড় প্রিয় ছিল। বাল্যকালে আপনি এই গীতটীতে মাতিয়াছিলেন, পরে আনন্দমঠের সন্তানদিগকেও এই গীতে মাতাইয়াছিলেন। একদিন মাঘ মাসের রাত্রিশেষে এই গীত তিনি প্রথম শুনিলেন।…এক বৈষ্ণব খঞ্জনী বাজাইয়া সদর রাস্তায় এই গানটা গাহিতেছিল, আমি তখন জাগ্রৎ— মধুর কণ্ঠে এই রাত্রে কে গীত গাহিতেছে শুনিয়া অগ্রজকে উঠাইলাম; গান শুনা যাইতেছিল না, অগ্রজ একটা জানালা খুলিয়া দিলে গীতটী শুনিতে পাইলাম— “হরে মুরারে মধুকৈটভারে গোপাল গোবিন্দ মুকুন্দসৌরে।” বৈষ্ণব এই গীতটী গাহিতে গাহিতে ঠাকুর বাটীর দিকে চলিয়া গেল। বঙ্কিমচন্দ্র “হরে মুরারে মধুকৈটভারে” আওড়াইতে আওড়াইতে জানালা বন্ধ করিলেন।

— পূর্ণচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ‘বঙ্কিম প্রসঙ্গ’, পৃ. ৩৯-৪০।

‘আনন্দমঠ’ রচনার সময় বঙ্কিমচন্দ্র কিছু কাল কলিকাতায় বাসা ভাড়া করিয়া অবস্থান করিতেছিলেন। চন্দ্রনাথ বসু মহাশয় লিখিয়াছেন,

বউবাজার ষ্ট্রীটের যে বাড়ীর সম্মুখের খণ্ডে এক্ষণে মুখুর্জী কোম্পানির হোমিওপেথিক ঔষধের দোকান দেখিতে পাওয়া যায় দিন কতক তিনি সেই বাড়ীতে ছিলেন। … এক দিন বৈকালে সেই বাড়ীতে গেলাম। বঙ্কিমবাবু আনন্দমঠের পাণ্ডুলিপি পড়িয়া শুনাইতে আরম্ভ করিলেন।[২]

শ্রীঅক্ষয়কুমার দত্তগুপ্ত লিখিয়াছেন,

বঙ্কিমের পিতৃগৃহ বৰ্ত্তমানসময়ে নিতান্ত ভগ্নাবস্থাগ্রস্ত। তাঁহার নিজ নির্ম্মিত বৈঠকখানাও ঘোরতর দুর্দ্দশাগ্রস্ত।…ঐ গৃহে বসিয়া বঙ্কিমচন্দ্রের “বন্দে মাতরম্” সঙ্গীত ও ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ রচিত হইয়াছিল।

—‘বঙ্কিমচন্দ্র’ পৃ. ৩২-৩৩।

হুগলীতে অবস্থানকালে যে ‘আনন্দমঠে’র গোড়াপত্তন হইয়াছিল, অক্ষয়চন্দ্র সরকার তাহার সাক্ষ্য দিয়াছেন। তিনি লিখিয়াছেন,

যখন আনন্দমঠ সূতিকাগারে, তখন ক্ষেত্রনাথ মুখোপাধ্যায় এখানকার আর একজন ডেপুটি ছিলেন, বঙ্কিমবাবু ত একজন ছিলেন; উভয়ের পাশাপাশি বাসা। সন্ধ্যার পর তিনি আসেন, আমিও যাই। তিনি সুরজ্ঞ, বড় টেবল হারমোনিয়ম্ লইয়া তিনি ‘বন্দে মাতরম্’ গানে মল্লারের সুর বসান। বঙ্কিম বাবুকে সুরের খাতিরে যৎসামান্য অদল বদল করিতে হয়। একদিন ক্ষেত্রবাবু আসেন নাই, বঙ্কিম বাবু আনন্দমঠের শেষে যুদ্ধের ভাগ তাঁহার হাতের লেখা খাতায় আমাকে পড়িতে দিলেন। আমি দেখিলাম, অজয় নদের উভয় পার্শ্বে স্থান, আমি ‘সন্তান’ শব্দ বুঝিতে না পারিয়া ‘সন্তান’ পড়িতেছিলাম—মনে মনে। খানিক পরে জিজ্ঞাসা করিলাম, “এবার কি Santal Insurrection theme হইল না কি”। তিনি বলিলেন, “না Sanyasi Insurrection.” আমি বলিলাম এই যে, “আপনি লিখিয়াছেন অজয়ের ধারে আর বার বার বলিতেছেন, সন্তাল, সন্তালগণ”। তিনি তখন হো হো করিয়া হাসিয়া বলিলেন, “একটা তোমার অনিচ্ছাকৃত ভুল— সন্তাল নয়, ‘সন্তান’। আর একটা আমার নিজের ইচ্ছাকৃত ভুল–অজয় নদ ও বীরভূমি।” তখন হো হো করিয়া দুই জনে হাসিতে লাগিলাম।[৩]

“বন্দে মাতরম্” গান রচনা সম্পর্কে ইতিমধ্যেই বহু কিম্বদন্তী প্রচলিত হইয়াছে। অনেকের ধারণা ইহা ‘আনন্দমঠ’ লেখার পূর্ব্বে রচিত; কেহ কেহ মনে করেন বঙ্কিমচন্দ্র বহরমপুরে ডফিন্ সাহেব কর্ত্তৃক অপমানিত হইয়া প্রতিহিংসাপরবশচিত্তে ইহা রচনা করিয়াছিলেন। “বন্দে মাতরম্” গানের ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে বঙ্কিমচন্দ্রের নিজের যে উচ্চ ধারণা ছিল, শ্রীশচন্দ্র মজুমদার এবং বঙ্কিম-কন্যা প্রমুখ অনেকে তাহা বিবৃত করিয়াছেন।

‘আনন্দমঠ’, ‘আনন্দমঠে’র বিভিন্ন চরিত্র, দেশমাতৃকার পূজা ও “বন্দে মাতরম্” সম্পর্কে এদেশে এবং বিদেশে অসংখ্য আলোচনা হইয়াছে। নিম্নলিখিত আলোচনা উল্লেখযোগ্য—

The Encyclopædia Britannica, 11th Edition, Vol. VI, pp. 9-10; Dr. G. A. Grierson – The Times, Sept 12, 1906; Sir Henry Cotton– The Times, Sept. 13, 1906; J. D. Anderson–The Times, Sept. 24, 1906; গিরিজাপ্রসন্ন রায় চৌধুরী — ‘বঙ্কিমচন্দ্র। আনন্দমঠ’; S. M. Mitra– Indian Problems, London, 1908; Lord Ronaldshay– The Heart of Aryavarta, Chapter X; Verney Lovett– History of the Indian Nationalist Movement, pp. 62-63; G. T. Garratt– An Indian Commentary, p. 136 ; J. D. Anderson– The Modern Review, Jan 1919; হারাণচন্দ্র রক্ষিত– ‘বঙ্গ-সাহিত্যে বঙ্কিম’; Sir Surendranath Banerjee– A Nation in Making; Count Keyserling– The Book of Marriage; কালীপ্রসন্ন ঘোষ— “আনন্দমঠের মূলমন্ত্র”, ‘বান্ধব’, ৭ম বর্ষ; বিষ্ণুচরণ চট্টোপাধ্যায়– ‘নব্যভারত’, ১ম খণ্ড; পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়– “বঙ্কিমচন্দ্রের ত্রয়ী”, “নারায়ণ’, বৈশাখ, ১৩২২; কিরণশঙ্কর রায়— “আনন্দমঠ”, ‘সবুজপত্র’, ১৩২৬; ললিতচন্দ্র মিত্র ‘স্বদেশ প্রতিমা’; Sri Aurobindo– Rishi Bunkim Chandra; অক্ষয়কুমার দত্তগুপ্ত— ‘বঙ্কিমচন্দ্র’ পৃ. ৩০৮ ৩৩৮; নবীনচন্দ্র সেন ‘আমার জীবন’ ২য়-৩য় খণ্ড ; Jayanta Kumar Das Gupta– Life and Novels of Bankim Candra, pp. 102-111; শচীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়— ‘বঙ্কিম-জীবনী’, ৩য় সংস্করণ, পৃ. ২৮৬-৩০৩; পূর্ণচন্দ্র বসু— ‘কাব্যসুন্দরী’, পৃ. ২০০-২২৩; যতীন্দ্রমোহন গুপ্ত— “বাঙ্গালার মাতৃমূৰ্ত্তি”, ‘বঙ্গদর্শন’, অগ্রহায়ণ, ১৩১৭ ; ইত্যাদি।

এতদ্‌ব্যতীত উপাধ্যায় ব্রহ্মবান্ধব, শ্রীঅরবিন্দ, পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়, বিপিনচন্দ্র পাল, সুরেশচন্দ্র সমাজপতি প্রভৃতি স্বদেশী-যুগে নানা ইংরেজী ও বাংলা সাময়িক পত্রে ‘আনন্দমঠ’ ও “বন্দে মাতরম্” লইয়া অসংখ্য আলোচনা করিয়াছেন। ‘আনন্দমঠ’ সম্পর্কে অন্য অনেকের লেখাও সাময়িক পত্রে প্রকাশিত হইয়াছে, যাহার উল্লেখ সম্ভবপর নহে।

ললিতচন্দ্র মিত্র মহাশয় ১৩১৮ বঙ্গাব্দের অগ্রহায়ণের ‘সাহিত্যে’ ‘আনন্দমঠ’-সম্পর্কে বঙ্কিমের একটি উক্তি প্রচার করিয়াছেন; বঙ্কিমচন্দ্র নাকি বলিয়াছিলেন As a patriotic work ‘আনন্দমঠ’ খুব ভাল বটে, কিন্তু উহাতে আর্ট কম। কালীপ্রসন্ন ঘোষকে লিখিত একটি পত্রে বঙ্কিমচন্দ্র ‘আনন্দমঠ’-সম্পর্কে এই ভাবে উল্লেখ করিয়াছেন–

আমি বা আনন্দমঠ লিখিয়া কি করিব আর আপনি বা তাহার মূলমন্ত্র বুঝাইয়া কি করিবেন? এ ঈর্ষ্যাপরবশ আত্মোদরপরায়ণ জাতির উন্নতি নাই। বল “বন্দে উরদং।”

শ্রীযুক্ত নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত ১৯০৬ খ্রীষ্টাব্দে Abbey of Bliss নাম দিয়া ‘আনন্দমঠে’র ইংরেজী অনুবাদ প্রকাশ করেন। শ্রীঅরবিন্দ ইংরেজী গদ্যে ও পদ্যে ‘বন্দে মাতরম্’ গান অনুবাদ করিয়াছিলেন। অন্য অনুবাদও আছে। হিন্দী, মারাঠী, তামিল, তেলুগু, কানারিজ ভাষায়ও অনূদিত হইয়াছে।

এন্‌সাইক্লোপীডিয়ার সমালোচনা কৌতূহলোদ্দীপক বলিয়া আমরা তাহা হইতে উদ্ধৃত করিয়া ভূমিকা শেষ করিতেছি।…

Of all his works, however, by far the most important from its astonishing political consequences was the Ananda Math, which was published in 1882, about the time of the agitation arising out of the Ilbert Bill. The story deals with the Sannyasi (i. e. fakir or hermit) rebellion of 1772 near Purnes, Tirhut and Dinapur, and its culminating episode is a crushing victory won by the rebels over the united British and Mussulman forces, a success which was not, however, followed up, owing to the advice of a mysterions “physician” who, speaking as a divinely inspired prophet, advises Satyananda, the leader of “the children of the Mother,” to abandon further resistance, since a temporary submission to British rule is a necessity; for Hinduism has become too speculative and unpractical, and the mission of the English in India is to teach Hindus how to reconcile theory and speculation with the facts of science. The general moral of the Ananda Math, then, is that British rule and British education are to be accepted as the only alternative to Mussulman oppression, & moral which Bankim Chandra developed also in his Dharmatattwa, an elaborate religious treatise in which he explained his views as to the changes necessary in the moral and religious condition of his follow-countrymen before they could hope to compete on equal terms with the British and Mahommedans. But though the Ananda Math is in form an apology for the loyal acceptance of British rule, it is none the less inspired by the ideal of the restoration, sooner or later, of a Hindu kingdom in India. This is especially evident in the occasional verses in the book, of which the Bande Mataram is the most famous.

As to the exact significance of this poem a considerable controversy has raged. Bande Mataram is the Sanskrit for “Hail to thee, Mother!” or more literally “I reverence thee, Mother!”, and according to Dr. G. A. Grierson (The Times, Sept. 12, 1906) it can have no other possible meaning than an invocation of one of the “mother” goddesses of Hinduism, in his opinion Kali “the goddess of death and destruction.” Sir Henry Co on the other hand (ib. Sept. 13, 1906), sees in it merely an invocation of the “mother-land” Bengal, and quotes in support of this view the free translation of the poem by the late W. H. Lee, a proof which, it may be at once said, is far from convincing. But though, as Dr. Grierson points out, the idea of & “mother-land” is wholly alien to Hindu ideas, it is quite possible that Bankim Chandra may have assimilated it with his European culture, and the true explanation is probably that given by Mr. J. D. Anderson in The Times of September 24, 1906. He points but that in the 11th chapter of the 1st book of the Ananda Math the Sannyasi rebels are represented as having erected, in addition to the image of Kali, “the mother who Has Been,” a white marble statue of “the Mother that Shall Be,” which “is apparently a representation of the mother-land. The Bande Mataram hymn is apparently addressed to both idols.”

The poem, then, is the work of a Hindu idealist who personified Bengal under the form of a purified and spiritualized Kali. Of its thirty-six lines, partly written in Sanskrit, partly in Bengali, the greater number are harmless enough. But if the poet sings the praise of the “Mother”

“As Lachmi, bowered in the flower

That in the water grows,”

he also praises her as “Durga, bearing ten weapons,” and lines 10, 11 and 12 are capable of very dangerous meanings in the mouths of unscrupulous agitators. Literally translated these run, “She has seventy millions of throats to sing her praise, twice seventy millions of hands to fight for her, how then is Bengal powerless ?” As S. M. Mitra points out (Indian Problems, London, 1908), this language is the more significant as the Bande Mataram in the novel was the hymn by singing which the Sannyasis gained strength when attacking the British forces.

During Bankim Chandra Chatterji’s lifetime the Bande Mataram, though its dangerous tendency was recognized, was not used as a party war- ory; it was not raised, for instance, during the Ilbert Bill agitation, nor by the students who flocked round the court during the trial of Surendra Nath, Banerji in 1883. It has, however, obtained an evil notoriety in the agita- tions that followed the partition of Bengal. That Bankim Chandra himself foresaw or desired any such use of it is impossible to believe. According to S. M. Mitra, he composed it “in a fit of patriotic excitement after a good hearty dinner, which he always enjoyed. It was set to Hindu music, known as the Mallar-Kawali-Tal. The extraordinarily stirring character of the air, and its ingenious assimilation of Bengali passages with Sanskrit, served to make it popular.”

Circumstances have made the Bande Mataram the most famous and the most widespread in its effects of Bankim Chandra’s literary works.

টিকা ও মন্তব্য

  1. অক্ষয়কুমার দত্তগুপ্ত। ‘বঙ্কিমচন্দ্র’, পৃ. ২৭৩।
  2. ‘প্রদীপ’ — আষাঢ়, ১৩০৫, পৃ. ২১৮-১৯।
  3. বঙ্গদর্শন–ভাদ্র, ১৩১৯