বাল্যরচনা

ললিতা

দ্বিতীয় সর্গ

১২

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

থামিল ঝটিকারণ, হলো নিশাশেষ।
শ্বেতমেঘময়াকাশে, উদিল নিশেশ॥
জলে করে জলময়, কানন নিকুঞ্জ।
তরু লতা তৃণ ভূম, পুষ্পলতা পুঞ্জ॥
ফুলময় ছোট খাল বিমল চঞ্চল।
ছায়াকারী শাখা হতে ঝরে বিন্দুজল॥
উজ্জ্বল পুলিনতলে ম্লান তারা মত।
মরিয়ে রয়েছে ঝড়ে ললিতা মন্মথ॥
মানবের কি কপাল! সংসার কি ছার!
বহিতে জীবন ভার কে চাহিবে আর
নাথভুজে মাথা দিয়ে পড়েছে মোহিনী।
মুখে মুখে কাঁদে যেন দুটি সরোজিনী॥
ললিতার মুখশশী ভিজে বরিষায়।
সরোজ শিশির মাথা মাটিতে লোটায়॥
শীতল ললাটে জলে জ্বলে শশধর।
জলে ভিজে পড়ে আছে অলকানিকর॥
ফুটায় কবরী চারু, দীর্ঘ তৃণোপরে।
মন্মথ রয়েছে তবু নাহি তুলে ধরে॥
এখনো সুস্থির মুখ রূপের ছায়ায়।
প্রাণ গেল তবু রূপ নাহি ছাড়ে তায়॥
সেরূপ ঘুমায় যেন, সন্ধ্যা ধরাপরে;
ভয়ে প্রকৃতির যেন নিশ্বাস না সরে॥
স্থির শ্বেত ভাল সেই, নহে নিরমল।
দেখিলে শিহর হয় শরীর বিকল॥
পড়ি তায় মরণের ভয়ঙ্কর ছায়া।
চন্দ্রিকায় যেন কালো, কাদম্বিনী কায়া॥
যেন চন্দ্রকরে স্থির বারিধি বিস্তার।
পড়ে তায় শিখরীর ছায়া অন্ধকার॥
কোমল পল্লব নীল মুদেছে নয়ন।
এরি কি কটাক্ষে ছিল সুখের স্বপন?
এখনি কেঁদেছে কত কাঁদিবে না আর।
সফরী সমান নাহি নাচিবে আবার॥
বুঝি তার প্রিয় তারা মন্মথ বদনে।
চাহিতে চাহিতে বুঝি মুদেছে মরণে॥
মানবের কি কপাল! এই সে হৃদয়।
কোথা তার প্রেম মোহ কোথা আশা ভয়!
বিবাস বিমল পড়ি শশীর কিরণে।
ভিতরে নিস্পন্দ যেন জগৎ এক্ষণে॥
এক বৃন্তে দুটি ফুল মুখে মুখ দিয়ে।
সে হৃদি কুসুমাসনে পড়েছে ছিঁড়িয়ে॥
তেমনি একাঙ্গে এরা থেকে চিরকাল।
মরিল অধরাধরে কি সুখ কপাল॥
যার লাগি ছিল বেঁচে পারিত বাঁচিতে।
তারি সনে মরে গেল তাহারি হৃদিতে॥
সুখের কপাল! কত সংসার যাতনা।
বিকার বিয়োগ শোক সহিতে হলো না॥
ছিঁড়িয়াছে ভীম ঝড়ে একই প্রহারে।
কাটে নি ক্রমশঃ কীট, প্রাণের সুসারে॥
গভীর গোপনগামী সুখ-স্রোতোপরে।
পড়ে নাই ভেসে ভেসে ডুবিতে সাগরে॥
যা হবার হইয়াছে এই মাত্র স্থির।
এই আছে অবশেষ, সে প্রেমশশীর॥
ওইখানে দেহাম্বুজ মাটি হয়ে যাবে।
জানিবে কে? দেখিবে কে? কেঁদে কে ভিজাবে?