শ্যামপুরে সীতারাম একটু স্থির হইলে, লক্ষ্মীনারায়ণ জিউর দর্শনে সস্ত্রীক হইয়া চলিলেন।
লক্ষ্মীনারায়ণ জিউর মন্দির নিকটস্থ এক জঙ্গলে ভূমিমধ্যে প্রোথিত ছিল। সীতারামের আজ্ঞাক্রমে ভূমি খননপূর্ব্বক, তাহার পুনর্বিকাশ সম্পন্ন হইয়াছিল। তন্মধ্যে প্রাচীন দেবদেবীমূৰ্ত্তি পাওয়া গিয়াছিল। অদ্য প্রথম সীতারাম তদ্দর্শনে চলিলেন। সঙ্গে শিবিকারোহণে নন্দা ও রমা চলিলেন।
যে জঙ্গলের ভিতর মন্দির, তাহার সীমাদেশে উপস্থিত হইয়া তিন জনেই শিবিকা হইতে অবতরণ করিলেন, এবং এক জন মাত্র পথপ্রদর্শক সঙ্গে লইয়া তিন জনে জঙ্গলমধ্যে পদব্রজে প্রবেশ করিলেন। কাননের অপূর্ব্ব শোভা নিরীক্ষণ করিয়া তাঁহাদিগের চিত্ত প্রফুল্ল হইল। অতিশয় শ্যামলোজ্জ্বল পত্ররাশিমধ্যে স্তবকে স্তবকে পুষ্প সকল প্রস্ফুটিত হইয়া রহিয়াছে। শ্বেত হরিৎ কপিল পিঙ্গল রক্ত নীল প্রভৃতি তন্মধ্যে নানা বর্ণের পাখী সকল নানা বর্ণের ফুল স্তরে স্তরে ফুটিয়া গন্ধে চারি দিক্ আমোদিত করিতেছে। বসিয়া নানা স্বরে কুজন করিতেছে। পথ অতি সঙ্কীর্ণ। গাছের ডালপালা ঠেলিতে হয়, কখন কাঁটায় নন্দা রমার আঁচল বাঁধিয়া যায়, কখন ফুলের গোছা তাহাদিগের মুখে ঠেকে, কখন ডাল নাড়া পেয়ে ভোমরা ভাল ছেড়ে তাদের মুখের কাছে উড়িয়া বেড়ায়, কখন তাহাদের মলের শব্দে ত্রস্তা হইয়া চকিতা হরিণী শয়ন ত্যাগ করিয়া বেগে পলায়ন করে। পাতা খসিয়া পড়ে, ফুল ঝরিয়া যায়, পাখী উড়িয়া যায়, খরা দৌড়িয়া যায়। যথাকালে তাঁহারা মন্দিরসমীপে উপস্থিত হইলেন। তখন তাঁহারা পথপ্রদর্শককে বিদায় দিলেন।
দেখিলেন, মন্দির ভূগর্ভস্থ, বাহির হইতে কেবল চূড়া দেখা যায়। সীতারামের আজ্ঞাক্রমে মন্দিরদ্বারে অবতরণ করিবার সোপান প্রস্তুত হইয়াছিল; এবং অন্ধকার নিবারণের জন্য দীপ জ্বলিতেছিল। তাহাও সীতারামের আজ্ঞাক্রমে হইয়াছিল। কিন্তু সীতারামের আজ্ঞাক্রমে সেখানে ভৃত্যবর্গ কেহই ছিল না; কেন না, তিনি নির্জ্জনে ভাৰ্য্যাদ্বয় সমভিব্যাহারে দেব দর্শনের ইচ্ছা করিয়াছিলেন।
সোপান সাহায্যে তাঁহারা তিন জনে মন্দিরদ্বারে অবতরণ করিলে পর, সীতারাম সবিস্ময়ে দেখিলেন যে, মন্দিরদ্বারে দেবমূৰ্ত্তিসমীপে এক জন মুসলমান বসিয়া আছে। বিস্মিত হইয়া সীতারাম জিজ্ঞাসা করিলেন, “কে বাবা তুমি?”
মুসলমান বলিল, “আমি ফকির।”
সীতারাম। মুসলমান?
ফকির। মুসলমান বটে।
সীতা। আ সৰ্ব্বনাশ!
ফকির। তুমি এত বড় জমীদার, হঠাৎ তোমার সর্ব্বনাশ কিসে হইল?
সীতা। ঠাকুরের মন্দিরের ভিতর মুসলমান!
ফকির। দোষ কি বাবা! ঠাকুর কি তাতে অপবিত্র হইল?
সীতা। হইল বৈ কি। তোমার এমন দুর্ব্বদ্ধি কেন হইল?
ফকির। তোমাদের এ ঠাকুর, কি ঠাকুর? ইনি করেন কি?
সীতা। ইনি নারায়ণ, জগতের সৃষ্টিস্থিতিপ্রলয়কৰ্ত্তা!
ফকির। তোমাকে কে সৃষ্টি করিয়াছেন?
সীতা। ইনিই।
ফকির। আমাকে কে সৃষ্টি করিয়াছেন?
সীতা। ইনিই—যিনি জগদীশ্বর, তিনি সকলকেই সৃষ্টি করিয়াছেন!
ফকির। মুসলমানকে সৃষ্টি করিয়া ইনি অপবিত্র হন নাই—কেবল মুসলমান ইহার মন্দিরদ্বারে বসিলেই ইনি অপবিত্র হইবেন? এই বুদ্ধিতে বাবা তুমি হিন্দুরাজ্য স্থাপন করিতে আসিয়াছ? আর একটা কথা জিজ্ঞাসা করি। ইনি থাকেন কোথা? এই মন্দিরের ভিতর থাকিয়াই কি ইনি সৃষ্টি স্থিতি প্রলয় করেন? না, আর থাকিবার স্থান আছে?
সীতা। ইনি সৰ্ব্বব্যাপী; সর্ব্বঘটে সর্ব্বভূতে আছেন।
ফকির। তবে আমাতে ইনি আছেন?
সীতা। অবশ্য—তোমরা মান না কেন?
ফকির। বাবা! ইনি আমাতে অহরহ আছেন, তাহাতে ইনি অপবিত্র হইলেন না—আমি উহার মন্দিরের দ্বারে বসিলাম, ইহাতেই ইনি অপবিত্র হইলেন?
একটি স্মৃতিব্যবসায়ী অধ্যাপক ব্রাহ্মণ থাকিলে ইহার যথাশাস্ত্র একটা উত্তর দিতে পারিত—কিন্তু সীতারাম স্মৃতিব্যবসায়ী অধ্যাপক নহেন, কথাটার কিছু উত্তর দিতে না পারিয়া অপ্রতিভ হইলেন। কেবল বলিলেন, “এইরূপ আমাদের দেশাচার।”
ফকির বলিল, “বাবা! শুনিতে পাই, তুমি হিন্দুরাজ্য স্থাপন করিতে আসিয়াছ, কিন্তু অত দেশাচারের বশীভূত হইলে, তোমার হিন্দুরাজ্য সংস্থাপন করা হইবে না। তুমি যদি হিন্দু মুসলমান সমান না দেখ, তবে এই হিন্দু মুসলমানের দেশে তুমি রাজ্য রক্ষা করিতে পারিবে না। তোমার রাজ্যও ধর্ম্মরাজ্য না হইয়া পাপের রাজ্য হইবে। সেই এক জনই হিন্দু মুসলমানকে সৃষ্টি করিয়াছেন; যাহাকে হিন্দু করিয়াছেন, তিনিই করিয়াছেন, যাহাকে মুসলমান করিয়াছেন, সেও তিনিই করিয়াছেন। উভয়েই তাঁহার সস্তান; উভয়েই তোমার প্রজা হইবে। অতএব দেশাচারের বশীভূত হইয়া প্রভেদ করিও না। প্রজায় প্রজায় প্রভেদ পাপ। পাপের রাজ্য থাকে না।
সীতা। মুসলমান রাজা প্রভেদ করিতেছে না কি?
ফকির। করিতেছে। তাই মুসলমান রাজ্য ছারখারে যাইতেছে। সেই পাপে মুসলমান রাজ্য যাইবে; তুমি রাজ্য লইতে পার ভালই, নহিলে অন্যে লইবে। আর যখন তুমি বলিতেছ, ঈশ্বর হিন্দুতেও আছেন, মুসলমানেও আছেন, তখন তুমি কেন প্রভেদ করিবে? আমি মুসলমান হইয়াও হিন্দু মুসলমানে কোন প্রভেদ করি না। এক্ষণে তোমরা দেবতার পূজা কর, আমি অন্তরে যাইতেছি। যদি ইচ্ছা থাকে বল, যাইবার সময়ে আবার আসিয়া তোমাদিগকে আশীর্ব্বাদ করিয়া যাইব।
সীতা। দেখিতেছি, আপনি বিজ্ঞ। অবশ্য আসিবেন।
ফকির তখন চলিয়া গেল। সীতারামের দর্শন ও পূজা ইত্যাদি সমাপন হইলে, সে আবার ফিরিয়া আসিল। সীতারাম তাহার সঙ্গে অনেক কথাবার্তা কহিলেন। সীতারাম দেখিলেন, সে ব্যক্তি জ্ঞানী। ফারসী আরবী উত্তম জানে, তাহার উপর সংস্কৃতও উত্তম জানে, এবং হিন্দুধর্ম্মবিষয়ক অনেকগুলি গ্ৰন্থও পড়িয়াছে। দেখিলেন যে, যদিও তাহার বয়স এমন বেশী নয়, তথাপি সংসারে সে মমতাশূন্য বৈরাগী এবং সর্ব্বত্র সমদর্শী। তাহার এবম্বিধ চরিত্র দেখিয়া নন্দা রমাও লজ্জা ত্যাগ করিয়া, একটু দূরে বসিয়া তাহার জ্ঞানগর্ভ কথা সকল শুনিতে লাগিলেন।
বিদায়কালে সীতারাম বলিলেন, “আপনি যে সকল উপদেশ দিলেন, তাহা অতি ন্যায্য। আমরা সাধ্যানুসারে তাহা পালন করিব। কিন্তু আমার ইচ্ছা যে, আমার নূতন রাজধানীতে আপনি বাস করেন। আমি এ উপদেশের বিপরীতাচরণ করিলে, আপনি নিকটে থাকিলে আমাকে সে সকল কথা আবার মনে করিয়া দিতে পারিবেন। আপনার ন্যায় জ্ঞানী ব্যক্তি আমার নিকট থাকিলে, আমার রাজ্যের বিশেষ মঙ্গল হইবে।”
ফকির। তুমি একটি কথা আমার নিকট স্বীকৃত হইলে, আমিও তোমার কথায় স্বীকৃত হইতে পারি। তুমি রাজধানীর কি নাম দিবে?
সীতা। শ্যামপুর নাম আছে—সেই নামই থাকিবে।
ফকির। যদি উহার মহম্মদপুর নাম দিতে স্বীকৃত হও, তবে আমিও তোমার কথায় স্বীকৃত হই।
সীতা। এ নাম কেন?
ফকির। তাহা হইলে আমি খাতির জমা থাকিব যে, তুমি হিন্দু মুসলমানে সমান দেখিবে।
সীতারাম কিছুক্ষণ চিন্তা করিয়া, তাহাতে স্বীকৃত হইলেন। ফকির তখন বলিল, “আমি ফকির, কোন গৃহে বাস করিব না। কিন্তু তোমার নিকটেই থাকিব। যখন যেখানে থাকি, তোমাকে জানাইব। তুমি খুঁজিলেই আমাকে পাইবে।”
গমনকালে ফকির তিন জনকে আশীর্ব্বাদ করিল। সীতারামকে বলিল, “তোমার মনস্কাম সিদ্ধ হউক।” নন্দাকে বলিল, “তুমি মহিষীর উপযুক্ত; মহিষীর ধর্ম্ম পালন করিও। তোমাদের হিন্দু শাস্ত্রে স্বামীর প্রতি যেরূপ আচরণ করার হুকুম আছে, সেইরূপ করিও—তাহাতেই মঙ্গল হইবে।” রমাকে ফকির বলিল, “মা, তোমাকে কিছু ভীরু-স্বভাব বলিয়া বোধ হইতেছে। ফকিরের কথা মনে রাখিও; কোন বিপদে পড়িলে ভয় করিও না। ভয়ে বড় অমঙ্গল ঘটে; রাজার মহিষীকে ভয় করিতে নাই।”
তার পর তিন জনে গৃহে গমন করিলেন!
পৃ. ৫০, পংক্তি ৯-১৯, “ভূষণায় যে হাঙ্গামা…স্থির করিলেন।” এই অংশের পরিবর্ত্তে ছিল— যাহারা তাঁহার সঙ্গে কারাগার হইতে পলায়ন করিয়াছিল, তাহারা সকলে ফৌজদারের কোপদৃষ্টিতে পড়িবার আশঙ্কায়, ভূষণা এবং তাহার পার্শ্ববর্ত্তী গ্রাম সকল পরিত্যাগ করিয়া, শ্যামপুরে তাঁহার নিকট আশ্রয় গ্রহণ করিল।
পৃ. ৫১, পংক্তি ১৭-১৮, “প্রকাশ্যে অস্ত্রধারী…উপস্থিত হয় নাই।” এই অংশের পরিবর্ত্তে ছিল— অস্ত্রধারী বা উৎসাহী ছিলেন না, ইহা ফৌজদার জানিত। কারাগার ভগ্ন করার নেতা যে তিনি, ইহা মুসলমান জানিতে পারে নাই। তিনি যে বন্দীর মধ্যে ছিলেন, তাহাও ফৌজদার অবগত হয়েন নাই।
পৃ. ৫১, পংক্তি ২৩, এই পংক্তির শেষে ছিল— আপাততঃ মুসলমানের সঙ্গে বিবাদ উপস্থিত হইলে, সকলই নষ্ট হইবে; অতএব যত দিন তিনি উপযুক্ত বলশালী না হয়েন, তত দিন কোন গোলযোগ না বাধে, ইহাই তাঁহার উদ্দেশ্য।
পৃ. ৫২, পংক্তি ১৩-১৭, “এই সময়ে চাঁদ শাহ…“মহম্মদপুর”।” এই অংশ ছিল না।
পৃ. ৫২, পংক্তি ২০, এই “দশম” পরিচ্ছেদটি প্রথম সংস্করণের “পঞ্চদশ” পরিচ্ছেদ।
পৃ. ৫২, পংক্তি ২০-২৫, “রমা বড় ছোট…ভয়ের বিষয়।” এই অংশ ছিল না।
পৃ. ৫৪, পংক্তি ২৩, “পতিপদসেবায় নিযুক্তা।” এই কথা কয়টির পর ছিল— লক্ষ্মীনারায়ণ জিউর মন্দিরে ফকির যে উপদেশ দিয়াছিলেন, নন্দা তাহা সম্পূর্ণরূপে রক্ষা করিতেছিলেন।
পৃ. ৫৬, পংক্তি ১, এই “একাদশ” পরিচ্ছেদটি প্রথম সংস্করণের “ষোড়শ” পরিচ্ছেদ।
একাদশ, দ্বাদশ, ত্রয়োদশ ও চতুর্দ্দশ পরিচ্ছেদে “সন্ন্যাসিনী” কথাটির স্থলে প্রথম সংস্করণে “ভৈরবী” ছিল। কেবল ৬৩ পৃষ্ঠার ১৫ পংক্তির “সন্ন্যাসিনী” কথাটি ঐরূপই ছিল।
পৃ. ৫৬, পংক্তি ১৪, এই পংক্তির পাদটীকা-চিহ্নটি এবং নিম্নের পাদটীকাটি (পংক্তি ২৭) ছিল না।
পৃ. ৫৮, পংক্তি ২৩, এই পংক্তির শেষে ছিল— শ্রী ভাবিল, “পুরুষ থাকিলে ভাবিত—এ ভৈরবীই বটে!”
পৃ. ৫৮, পংক্তি ২৬, “আমি তাহা হইতে বলিতেছি না।” এই কথা কয়টির পর ছিল— আমিও যথার্থ ভৈরবী নই। আর
পৃ. ৫৯, পংক্তি ১৫, “চন্দনের” কথাটির স্থলে “রক্তচন্দনের” ছিল।
পৃ. ৫৯, পংক্তি ১৮, এই “দ্বাদশ” পরিচ্ছেদটি প্রথম সংস্করণের “সপ্তদশ” পরিচ্ছেদ।
পৃ. ৬১, পংক্তি ১, এই “ত্রয়োদশ” পরিচ্ছেদটি প্রথম সংস্করণের “অষ্টাদশ” পরিচ্ছেদ।
পৃ. ৬৩, পংক্তি ৩, “ভবিষ্যৎ” কথাটির স্থলে “প্রারব্ধ” ছিল।
পৃ. ৬৩, পংক্তি ৭, এই পংক্তিটি ছিল না।
পৃ. ৬৪, পংক্তি ১৩, এই “চতুর্দ্দশ” পরিচ্ছেদটি প্রথম সংস্করণের “ঊনবিংশ পরিচ্ছেদ।
পৃ. ৬৫, পংক্তি ৪-৫, ৪ পংক্তির শেষ হইতে, পর-পংক্তির “আমার নাম জয়ন্তী” কথা কয়টির পূর্ব্ব পর্য্যন্ত নিম্নলিখিত অংশটি ছিল—
তুমি সে দিন বলিয়াছিলে, তুমি প্রকৃত ভৈরবী নও। তুমি তবে কি?
ভৈরবী। আমি বৈষ্ণবী। কিন্তু নেড়ার দলের বৈষ্ণবী নহি।
শ্রী। আবার বৈষ্ণবী কেমনতর? বৈষ্ণবীর এ বেশ ত নয়।
ভৈরবী। সে সকল রহস্য পরে জানিবে। এখন আমাকে বৈষ্ণবীই জানিও।
পৃ. ৬৬, পংক্তি ১২, “অকৌশল” কথাটির স্থলে “অকুশল” ছিল।
এই পর্যন্ত পুস্তকের প্রথম খণ্ড।
পৃ. ৬৭, পংক্তি ২, “জয়ন্তী” কথাটির স্থলে “ভৈরবী” ছিল।