চক্রান্তের মূল নায়করা

বৈদেশিক চক্রান্তকারী

সুশীল চৌধুরী

পলাশি চক্রান্তের উদ্ভব ও বিকাশ সম্যক উপলব্ধি করতে হলে, এই চক্রান্তের মূল নায়কদের সম্পূর্ণ পরিচয় ও তাদের ধ্যানধারণা সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল হওয়া একান্ত প্রয়োজন। আমাদের প্রতিপাদ্য, যেহেতু ইংরেজরাই পলাশি ষড়যন্ত্রের প্রধান উদ্যোক্তা এবং তাদের সক্রিয় সমর্থন ও উৎসাহ ছাড়া পলাশির চক্রান্ত পরিপূর্ণতা লাভ করে বিপ্লব ঘটাতে পারত না[১], তাই ইংরেজদের মধ্যে যারা মুখ্য ভূমিকা নিয়েছিল তাদের নিয়ে প্রথমে আলোচনা করব, পরে দেশীয় ষড়যন্ত্রীদের। ইংরেজদের মধ্যে যে তিনজন সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অংশ নিয়েছিলেন, তাঁরা হলেন উইলিয়াম ওয়াটস, লিউক স্ক্র্যাফ্‌টন ও রবার্ট ক্লাইভ।

উইলিয়াম ওয়াট্‌স্‌

ওয়াটস ছিলেন কাশিমবাজার কুঠির প্রধান। যেহেতু কাশিমবাজারের অনতিদূরেই রাজধানী মুর্শিদাবাদ, তাই তিনি নবাবের দরবারে ইংরেজ কোম্পানির প্রতিনিধিও ছিলেন। ফলে, বাংলায় ইংরেজদের মধ্যে তাঁরই সবচেয়ে বেশি সুযোগ ছিল দরবারের সব খোঁজখবর রাখার। তা ছাড়া, এই সময় বাংলায় ইউরোপীয়দের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোম্পানির প্রধান হিসেবে বাংলার তিন প্রধান বণিকরাজার (merchant prince)—জগৎশেঠ পরিবার, খোজা ওয়াজিদ ও উমিচাঁদ—সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ পরিচয় থাকাটা স্বাভাবিক। কারণ কাশিমবাজার ছিল তখন বাংলার সবচেয়ে বড় বাণিজ্যকেন্দ্র—বিশেষ করে বাংলার দুই প্রধান রফতানি পণ্যের—কাঁচা রেশম ও বস্ত্র—উৎপাদন ও ব্যবসাকেন্দ্র হিসেবে। তা ছাড়া খুব সম্ভবত দরবারে ইংরেজ কোম্পানির প্রতিনিধি হিসেবে তাঁর সঙ্গে দরবারের প্রধান প্রধান রাজপুরুষের—মীরজাফর, রায়দুর্লভ, ইয়ার লতিফ, প্রমুখ—ভাল রকম যোগাযোগই ছিল। ফলে নবাবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র পাকাবার পক্ষে ইংরেজ কর্মচারীদের মধ্যে তিনিই সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি ছিলেন। ক্লাইভের বিশ্বস্ত অনুচর ওয়ালসকে লেখা লিউক স্ক্র্যাফ্‌টনের চিঠি থেকে তার প্রমাণ মেলে। আমরা আগেই দেখেছি, স্ক্র্যাফ্‌টন লিখেছেন, ক্লাইভ যদি ওয়াটসকে একটু ইঙ্গিত ও উৎসাহ দেন তা হলে ওয়াটস সঙ্গে সঙ্গে ‘একটি ‘দল’ [party] [নবাবের বিরুদ্ধে] গড়তে লেগে যাবেন।[২]’ তিনি আরও জানাচ্ছেন যে ক্লাইভ ওয়াটসকে ইংরেজদের সমর্থনে দরবারে একটি চক্র তৈরি করতে নির্দেশ দিলেন। এতেই পলাশি ষড়যন্ত্রের সুত্রপাত।[৩]

স্ক্র্যাফ্‌টনের লেখা থেকে জানা যায়, বাংলায় বহুদিন থাকার ফলে এখানকার রাজনীতি, ভাষা ও রীতিনীতি সম্বন্ধে ওয়াটসের যথেষ্ট ব্যুৎপত্তি জন্মেছিল।[৪] তাতে ইংরেজদের খুব সুবিধে হয়েছিল কারণ তাদের মধ্যে এমন একজন ছিলেন যাঁর এই দেশ ও এখানকার লোকজন সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা ছিল এবং যিনি দরবারের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে সোজাসুজি যোগাযোগ করে বাংলায় রাজনৈতিক পালাবদল ঘটানো সম্ভব কি না সে সম্বন্ধে তাদের চিন্তাভাবনা যাচাই করে নিতে পারেন। ওয়াটসই ফোর্ট উইলিয়াম কাউন্সিলকে পরামর্শ দেন যে ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ সুসংহত ও দুর্ভেদ্য করার কাজ চালিয়ে যেতে কারণ তাঁর ধারণা হয়েছিল যে নবাব আলিবর্দি ব্যাপারটা খেয়ালই করবেন না। তিনি কাউন্সিলকে এ-ভরসাও দিয়েছিলেন যে, তিনি এ-বিষয়ে সজাগ থাকবেন এবং এটা নিয়ে নবাবের সঙ্গে কোনও ঝামেলা হলে তার জন্য কোম্পানির ব্যবসা-বাণিজ্যের যাতে কোনও ব্যাঘাত না ঘটে তা তিনি দেখবেন।[৫] আবার ইংরেজরা যখন চন্দননগর আক্রমণ করার কথা ভাবছিল এবং কীভাবে এতে এগুনো যাবে তা নিয়ে চিন্তায় পড়েছিল, তখন ওয়াটসই সমস্যার সমাধানে সাহায্য করলেন। তিনি নিজেই লিখেছেন:[৬]

As Mr. Watts was on the spot, watched every motion of the Suba [Sirajuddaullah], knew exactly the character of his courtiers and prin- cipal Ministers, and had the most certain Intelligence of everything that passed, he continued to represent the Necessity of attacking Chandernagore.

ওয়াটস ঘটনাস্থলে থাকার ফলে নবাবের কাজকর্মের ওপর নজর রাখতে পারতেন এবং দরবারের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের চালচলন সম্বন্ধে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহালও ছিলেন। দরবারে যে সব ঘটনা ঘটত সব তাঁর নখদর্পণে ছিল। তাই তিনি বারবার চন্দননগর আক্রমণ করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছিলেন। তিনি সবিস্তারে এটাও জানিয়েছেন কীভাবে তিনি নবাবের মুৎসুদ্দিকে ঘুষ দিয়ে নবাবের নামে অ্যাডমিরাল ওয়াটসনকে লেখা চিঠির এমন বয়ান করিয়েছিলেন যাতে ওই চিঠির অর্থ দাঁড়ায় যে নবাব ইংরেজদের চন্দননগর আক্রমণ করার অনুমতি দিচ্ছেন।[৭]

পলাশি ষড়যন্ত্রের উদ্ভব ও বিকাশে ইংরেজদের মধ্যে ওয়াটসই সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন। তিনিই উমিচাঁদের সাহায্যে দরবারের বিক্ষুব্ধ ও অসন্তুষ্ট রাজপুরুষদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং ধীরে ধীরে তাদের অনেককে ইংরেজদের দলে টেনে আনতে সমর্থ হন। রবার্ট ওরম লিখছেন যে সিরাজদ্দৌল্লাকে হঠানোর ব্যাপারে দরবারের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বাজিয়ে দেখার জন্য ওয়াটসই উমিচাঁদকে কাজে লাগান এবং এর ফলেই ইয়ার লতিফ ওয়াটসের সঙ্গে গোপনে সাক্ষাৎ করতে চান। ওয়াটস তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে উমিচাঁদকেই ইয়ার লতিফের কাছে পাঠান। লতিফ উমিচাঁদকে তাঁর বাসনার কথা জানান—সিরাজদ্দৌল্লাকে হঠিয়ে তিনি নিজে নবাব হওয়ার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন। ওরম যদিও বলছেন যে, মীরজাফর আর্মানি বণিক খোজা পেট্রুসের মারফত তাঁর প্রস্তাব ওয়াটসকে জানান, ওয়াটস নিজে কিন্তু তাঁর পিতাকে পরে লিখেছেন যে তিনি নিজেই মীরজাফরের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁকে ষড়যন্ত্রে সামিল করেছিলেন।[৮]

কাশিমবাজারের ফরাসি কুঠির প্রধান জাঁ ল’ নবাবের দরবারের রাজনীতি এবং ইংরেজদের অভিসন্ধি সম্বন্ধে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল ছিলেন। সেই ল’ পলাশি চক্রান্তে ওয়াটসের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার যথাযথ বর্ণনা দিয়েছেন:[৯]

দরবারে ইংরেজদের সপক্ষে ছিল তাদের অস্ত্রবল, সিরাজদ্দৌল্লার ভুলত্রুটি, শেঠদের অমিত প্রভাব ও সূক্ষ্ম কূটনীতি। তা ছাড়াও তাদের পক্ষে ছিল নবাবের সৈন্যবাহিনীর প্রায় সব সেনাপতি ও দরবারের প্রায় সব অমাত্য, এমনকী মুৎসুদ্দি ও ওয়াকিয়ানবিশরাও। এই সবগুলি শক্তিকে একত্রিত করে তাদের চালাবার জন্য ওয়াটসের মতো এমন একজন সুচতুর ব্যক্তি যখন ছিলেন, তখন ইংরেজরা কি না করতে পারত।

ওয়াটস কীভাবে পলাশি বিপ্লবের পরিকল্পনা ও রূপায়ণ করেছিলেন তার বর্ণনা নিজেই দিয়েছেন:[১০]

তিনি [ওয়াটস] বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ ও আলাপ আলোচনার কথা সবিস্তারে [কর্তৃপক্ষকে] জানিয়েছেন। তা ছাড়াও নবাবের তখনকার অবস্থা, তাঁর কাছাকাছি প্রধান অমাত্যদের চিন্তাভাবনা, শক্তিসামর্থ্য, ধ্যানধারণা ও কামনাবাসনার কথাও বিশদভাবে জানানো হয়েছে। সঙ্গে এটাও যে [আমাদের] পরিকল্পনা [সিরাজের বদলে মীরজাফরকে মসনদে বসানো] সফল হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। এটা করতে গেলে যে-সব বাধা বিপত্তি আসতে পারে এবং তা কী করে প্রতিহত করা যেতে পারে তাও তিনি জানিয়েছেন।

তবে ওয়াটস বিচক্ষণ বলে সতর্কতার সঙ্গে এগোতে চেয়েছিলেন। মীরজাফরকে নবাব করার প্রস্তাবে ক্লাইভ ও সিলেক্ট কমিটির উত্তর আসার জন্য যখন তিনি অপেক্ষা করছিলেন, তখন ক্লাইভকে লেখেন, তাঁর সঙ্গে আলোচনা না করে ক্লাইভ যেন অন্য কোনও পরিকল্পনা গ্রহণ না করেন। কারণ তিনি ঘটনাস্থলে আছেন বলে এবং দরবারের হালচালের সব খবর রাখেন বলে ‘আমাদের’ (ইংরেজদের) পরিকল্পনা রূপায়ণ করা যাবে কিনা এবং তা কী করে সুসম্পন্ন করা যাবে, সে সম্বন্ধে তিনিই সবচেয়ে ভাল বোঝেন।[১১] পলাশির ষড়যন্ত্র ও বিপ্লবে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ফোর্ট উইলিয়ামের গভর্নর ও কাউন্সিল তাঁকে সরকারিভাবে ধন্যবাদ জানান।[১২] ক্লাইভও লন্ডনের সিক্রেট কমিটিকে লেখেন যে ওয়াটসের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা না বললে তাঁর প্রতি সুবিচার করা হবে না।[১৩]

লিউক স্ক্র্যাফ্‌টন

পলাশি ষড়যন্ত্রে ওয়াটসের পরে মুখ্য ভূমিকায় ছিলেন লিউক স্ক্র্যাফ্‌টন। ইংরেজরা এ ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হওয়ার আগে স্ক্র্যাফ্‌টন ঢাকায় ইংরেজ কুঠির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ক্লাইভই তাঁকে ঢাকা থেকে আনিয়ে মুর্শিদাবাদে পাঠান। আসলে ওয়াটসের মতো সতর্ক ও কিছুটা ভীরু লোকের চাইতে স্ক্র্যাফ্‌টনের মতো তারুণ্য ও উৎসাহে ভরতি যুবককে ক্লাইভের বেশি পছন্দ ছিল। স্বভাবতই ওয়াটস ও স্ক্র্যাফ্‌টনের মধ্যে সব বিষয়ে ঐকমত্য হত না। তাই ফোর্ট উইলিয়াম কাউন্সিল মুর্শিদাবাদ থেকে স্ক্র্যাফ্‌টনকে ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিল। কিন্তু ক্লাইভ তাতে কিছুতে রাজি হননি। কাউন্সিল অবশ্য জানিয়ে দিল যে ওখানকার সব ব্যাপারের তত্ত্বাবধানে থাকবেন ওয়াটসই।[১৪] স্ক্র্যাফ্‌টন মুর্শিদাবাদে উমিচাঁদের সঙ্গে বরাবর যোগাযোগ রেখেই চলতে লাগলেন এবং তার মতে, উমিচাঁদ ইংরেজদের জন্য যা করছেন, তাতে তাঁর যথেষ্ট প্রশংসা প্রাপ্য। তিনি প্রায়ই উমিচাঁদের সঙ্গে দেখা করতেন এবং তাঁর কাছ থেকেই জানতে পেরেছিলেন যে ইয়ার লতিফ খানকে মসনদে বসাবার পরিকল্পনা হচ্ছিল, যদিও উমিচাঁদের সঙ্গে মিলে সিরাজদ্দৌল্লাকে হঠাবার পরিকল্পনা করার জন্য ওয়াটসকেই ভার দেওয়া হয়েছিল। স্ত্র্যাফ্‌টন কিন্তু ওয়াটসকে নেহাত ‘গোবেচারি’ [simpleton] বলেই মনে করতেন।[১৫]

ওয়াটস ক্লাইভকে ২৩ এপ্রিল জানাচ্ছেন যে তিনিই উমিচাঁদকে ইয়ার লতিফের কাছে পাঠিয়েছিলেন কারণ লতিফ নবাব হওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু তার আগেই ২০ এপ্রিল স্ক্র্যাফ্‌টনই ক্লাইভের বিশ্বস্ত অনুচর ওয়ালসকে জানিয়েছিলেন যে, তাঁর মনে হয়, উমিচাঁদ ইয়ার লতিফকে নবাব করার পরিকল্পনা জানাতে জগৎশেঠদের কাছে গেছেন। এ-ব্যাপারে তিনি বেশ উত্তেজিতই বোধ করেন, যেটা ওয়াটস করতেন না। তিনি ওয়ালসকে লিখছেন:[১৬]

আমার মনে হয় আমি স্বদেশ ও স্বজাতির জন্য কিছু একটা করতে উদ্বুদ্ধ বোধ করছি। আমাকে ক্ষমতা দেওয়া হলে আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, দশদিনের মধ্যে আমি এমন ব্যবস্থা করতে পারি যাতে আপনারা উত্তর দিক থেকে যাত্রা করে দু’দিন এগুলেই এক বিরাট বাহিনী আপনাদের সঙ্গে যোগ দেবে। আপনাদের কী শর্ত [সন্ধির] তা আমাকে জানান, আমি কথা দিচ্ছি আমার যথাসাধ্য আমি করব।

স্ক্র্যাফ্‌টন এতেই ক্ষান্ত হননি। শর্তগুলি কী হওয়া উচিত তিনি নিজেই তা জানিয়ে দিয়েছেন। আসলে তিনি ওয়াটসের চেয়ে অনেক বেশি আক্রমণাত্মক নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। ওয়ালসকে তিনি ২০ এপ্রিল লেখেন:[১৭]

আমাদের অবস্থা মানুষের শরীরে একটা দুষ্ট ক্ষতের মতো, যেটা বাইরে থেকে শুকিয়ে যাবে মনে হবে কিন্তু ভেতরে ভেতরে পচে পুঁজ হতে শুরু করেছে। দক্ষ চিকিৎসকের মতো আমাদের এর সুরাহা করতে হবে। ক্ষতস্থান কেটে তার মধ্যে থেকে সব পচা জিনিস বার করে একেবারে পরিষ্কার করে ফেলতে হবে।

কিন্তু সরকারিভাবে ওয়াটসের অধঃস্তন হিসেবে কাজ করতে হত বলে তিনি মোটেই সন্তুষ্ট ছিলেন না। তাই তিনি ওয়ালসকে সতর্ক করে দেন, তিনি যে-সব খবরাখবর পাঠান সেগুলি যেন ওয়াটস ঘুনাক্ষরেও জানতে না পারেন। তা ছাড়াও তিনি ওয়ালসকে অনুরোধ করেন, তিনি যেন উমিচাঁদকে তাঁর সঙ্গে মিলে কাজ করার জন্য একটা চিঠি তাঁর কাছে পাঠিয়ে দেন। সঙ্গে সঙ্গে ওয়ালসকে এটাও জানিয়ে দেন যেন এ-সব কিছু গোপন থাকে এবং সিলেক্ট কমিটিকে যেন কিছুই না জানানো হয়। এই পর্যায়েও, যখন ষড়যন্ত্র দানাই বাঁধেনি, তিনি কিন্তু বিপ্লব সফল হওয়া সম্বন্ধে বেশ আশাবাদীই ছিলেন এবং ওয়ালসের মাধ্যমে ক্লাইভকে পরামর্শ দিলেন, ‘আমরা সম্পূর্ণ তৈরি হওয়া পর্যন্ত একটু ধৈর্য ধরে থাকুন—এটা অল্প কিছুদিনের ব্যাপার। মাত্র।’[১৮]

স্ক্র্যাফ্‌টনের নিজের অবশ্য ধৈর্য বিশেষ ছিল না। ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত হতে পেরে তিনি খুবই উত্তেজিত বোধ করতে থাকেন। তাই ওয়াটস ও উমিচাঁদ যখন সবেমাত্র সিরাজদ্দৌল্লার বিকল্প নবাব হিসেবে ইয়ার লতিফকে জোগাড় করতে পেরেছেন কিন্তু ষড়যন্ত্রের পরিকল্পনা কিছুই বিশেষ তৈরি হয়নি, তিনি কিন্তু ওয়ালসকে লিখে বসলেন (২১ এপ্রিল ১৭৫৭):[১৯]

আমার মাথার মধ্যে এখন রাজনীতির চিন্তা কিলবিল করছে, আমার ঘুম হচ্ছে না। নানা পরিকল্পনা ও চিন্তাভাবনা মাথায় ঘুরছে। ওয়াটসের কিন্তু এরকম অবস্থা হয়নি। তিনি চিন্তাভাবনা দূরে সরিয়ে বেশ নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন। আমার কিন্তু তা হবার জো নেই। খারাপ কিছু হলেও আমি কিন্তু মোটেই ভয় পাব না—ভয় পাওয়ার লোক আমি নই।

ওয়ালসের মাধ্যমেই তিনি সব কিছু ক্লাইভকে জানাতেন। কিন্তু ২৪ এপ্রিল তিনি সোজা ক্লাইভকে চিঠি লিখলেন কারণ ‘ব্যাপারটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’ ওই চিঠিতে তিনি ক্লাইভকে জানালেন যে নবাব কিছুতেই ইংরেজদের রেহাই দেবেন না, সুযোগ পেলেই তাদের বিরুদ্ধে ফরাসিদের সঙ্গে যোগ দিয়ে ইংরেজদের দেশ থেকে বিতাড়িত করবেন। একই সঙ্গে তিনি ক্লাইভকে ওয়াটসের ভীরুতার সম্পর্কে সতর্ক করে দেন এবং বিপ্লবের ব্যাপার কতটা এগিয়েছে তা জানান। তিনি লেখেন:[২০]

ওয়াটস কখনও এ-সব ব্যাপারে লেখার সাহস জোগাড় করে উঠতে পারেননি। উপরন্তু আমি যখন তাঁকে সব জানালাম তখন তিনি আমাকে দোষারোপ করলেন যে আমি নাকি ঘোঁট পাকাচ্ছি। কিন্তু এখন তো আর করার কিছু নেই। উমিচাঁদ বরং আমার মতো একজন লড়াকুকে পেয়ে খুব খুশি। তাঁর মাথায় মস্ত বড় একটা প্ল্যান কাজ করছে। তিনি আমাকে গতকাল বলেছেন, তাঁকে খুব গোপনীয়তার সঙ্গে এগুতে হবে কিন্তু আমরা যেন প্রস্তুত থাকি—সময় হলেই তিনি আপনাকে সব জানাবেন। ব্যাপারটা কী আমি বেশ আন্দাজ করতে পারছি—তা হচ্ছে জগৎশেঠের সঙ্গে মিলে লতি[ফ]কে নবাব করা….মহাশয়, আপনাকে এও জানাচ্ছি ওয়াটসের মতো ভীরু লোকের ওপর নির্ভর করলে আপনার [অর্থাৎ ইংরেজদের] সমূহ ক্ষতির সম্ভাবনা।

কিন্তু তিনি যেহেতু ষড়যন্ত্রে মুখ্য ভূমিকা নিতে চেয়েছিলেন, তাই ক্লাইভকে সতর্ক করে দিলেন তিনি যেন উমিচাঁদকে সম্পূর্ণ বিশ্বাস না করেন, এবং তাঁকে অনুরোধ জানালেন তিনি যেন উমিচাঁদকে লেখেন যাতে উমিচাঁদ পুরো পরিকল্পনার কথা তাকে [স্ক্র্যাফ্‌টনকে] খুলে বলেন।

এ সময় কোম্পানির অন্যান্য কর্মচারীর মতো স্ক্র্যাফ্‌টনও ব্যক্তিগত বাণিজ্যে লিপ্ত ছিলেন। ক্লাইভকে একটা চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন যে ক্লাইভের নির্দেশে একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য [পলাশির ষড়যন্ত্র করার?] তাঁকে ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদ চলে আসতে হওয়ায় তাঁর ব্যক্তিগত কাজে [ব্যবসায়?] যথেষ্ট ক্ষতি স্বীকার করতে হয়েছে। ক্লাইভকে তিনি অনুরোধ করেন সিলেক্ট কমিটিকে জানাতে যে তিনি মুর্শিদাবাদে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি সমাধা করার জন্যই ওখানে চলে এসেছিলেন এবং সেজন্যই লখিপুর [Luckipore] কুঠির প্রধানের কাজটি গ্রহণ করতে পারেননি, যদিও এই পদটি বাংলায় কোম্পানির দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদ। বলা বাহুল্য, লখিপুরে ব্যক্তিগত ব্যবসার সুযোগও অনেক বেশি ছিল যার জন্য পদটি খুব লোভনীয় বলে গণ্য হত। তাই স্ক্র্যাফ্‌টন ক্লাইভকে জানিয়ে রাখেন তিনি যেন সিলেক্ট কমিটিকে অনুরোধ করেন, মুর্শিদাবাদের কাজটি সম্পন্ন হলে তাঁকে যেন অন্তত ঢাকায় ফিরে যাবার [লখিপুরের পদটি ততদিনে শূন্য থাকবে না বলে হয়তো] অনুমতি দেওয়া হয়। ঢাকায় ফিরে যাবার জন্য তাঁর ব্যগ্রতা থেকে অনুমান করা সহজ যে তিনি ওখানে ব্যক্তিগত ব্যবসায় লিপ্ত ছিলেন।[২১]

রবার্ট ক্লাইভ

ওয়াটস ও স্ক্র্যাফ্‌টন যখন ঘটনাস্থল থেকে ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করার চেষ্টায় ব্যস্ত, তখন ক্লাইভ দূরে অন্তরাল থেকে সবকিছুর তদারকি করছিলেন। সিরাজদ্দৌল্লা কলকাতা থেকে ইংরেজদের তাড়িয়ে দেবার পর যখন মাদ্রাজ থেকে ক্লাইভ ও ওয়াটসনের নেতৃত্বে অভিযাত্রী সৈন্যদলকে বাংলায় পাঠানো হল, তখন ক্লাইভকে শুধু সমর বিষয়েই সিদ্ধান্ত নেবার অধিকার দেওয়া হয়নি, বাংলায় কোম্পানির রাজনৈতিক ব্যাপারেও উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা তাঁকে দেওয়া হয়েছিল। অবশ্য তাঁকে কলকাতার সিলেক্ট কমিটির—যার সদস্য ছিলেন তিনি, গভর্নর ড্রেক, ওয়াটস, ম্যানিংহাম ও রিচার্ড বেচার—সঙ্গে পরামর্শ করে কাজ করতে বলা হয়েছিল। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এটাও জানানো হয়েছিল যে প্রয়োজন হলে ওই কমিটিকে অগ্রাহ্য করেও কাজ করার স্বাধীনতা তাঁকে দেওয়া হল।[২২]

ক্লাইভ প্রথমদিকে কোম্পানির একজন সাধারণ কর্মচারীই ছিলেন কিন্তু করমণ্ডলে তাঁর নেতৃত্বে ইংরেজদের গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধবিজয়ের পর তিনি রাতারাতি খ্যাতনামা হয়ে যান। স্ক্র্যাফ্‌টন লিখছেন:[২৩]

কর্নেল ক্লাইভ সাধারণ কর্মচারী হয়েও করমন্ডল উপকূলে যুদ্ধ করে বেশ খ্যাতি অর্জন করেন। ওখানে কোম্পানির অবস্থা বেশ সংকটজনক হয়ে পড়েছিল। তিনি আমাদের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী ফরাসিদের বেশ কয়েকবার পরাজিত করে ওখানে কোম্পানিকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। সম্প্রতি তিনি অ্যাংগ্রিয়াদের (Angria) বিরুদ্ধে সফল অভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং এখন যোগ্যতম ব্যক্তি হিসেবেই বাংলায় কোম্পানির একটা সুরাহা করতে এসেছেন।

আসলে ক্লাইভ কিন্তু মোটেই প্রতিভাসম্পন্ন সেনানায়ক ছিলেন না, যদিও তখনকার ফারসি ইতিহাসে তাঁকে ‘সবিৎ জঙ্গ’ বা ‘সাহসী, যুদ্ধজয়ী’ (‘the brave, tried in battles’) বলে উল্লেখ করা হয়েছে।[২৪] বাংলায় এসে বজবজে রাজা মানিকচাঁদের সঙ্গে তাঁর যে প্রথম সংঘর্ষ হয়, তাতে সমরনায়ক হিসেবে তাঁর বুদ্ধিমত্তা ও কুশলতার তেমন পরিচয় পাওয়া যায়নি। একটু শরীর খারাপ হলেই তিনি সহজে মুষড়ে পড়তেন। তাঁর রোগ রোগ একটা বাতিক ছিল (hypocondriac) এবং সর্বক্ষণই তিনি স্বাস্থ্য নিয়ে দুশ্চিন্তা করতেন। প্রায়ই তিনি নিরাশাগ্রস্ত হয়ে পড়তেন এবং নিজের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলতেন। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় গুণ ছিল তিনি খুব তাড়াতাড়ি এ-সব কাটিয়ে উঠতে পারতেন। কিছুদিন আগে তাঁর এক জীবনীকার লিখেছেন:[২৫]

ক্লাইভ কিন্তু মোটেই যোদ্ধা ছিলেন না। যুদ্ধ বিষয়ে তাঁর জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাও ছিল খুব সীমিত। তাঁর সমসাময়িক সমরনায়কদের দক্ষতার মান বেশ নিচুই ছিল। তাঁদের তুলনায়ও তাঁকে খুব একটা উন্নতমানের সৈন্যাধ্যক্ষ বলা যায় না। বস্তুতপক্ষে তিনি গেরিলাযুদ্ধে সাফল্য লাভ করেই সুনাম অর্জন করেছিলেন। কিন্তু এ-সব সাফল্য সত্ত্বেও তিনি দক্ষ সেনানায়ক হয়ে উঠতে পারেননি।

বাংলায় অভিযাত্রী দলের সর্বাধ্যক্ষ নিযুক্ত হওয়ায় ক্লাইভ খুবই পুলকিত হন এবং এই অভিযানের মাধ্যমে অনেক কিছু সম্পন্ন করার উচ্চাভিলাষ তাঁর মনে জাগে। যেদিন তিনি ওই পদে নিযুক্ত হওয়ার খবর পেলেন সেদিনই লন্ডনে সিক্রেট কমিটিকে তিনি লেখেন (১১ অক্টোবর ১৭৫৬): ‘আমি গর্ব করে বলতে পারি শুধু কলকাতা পুনরুদ্ধার করে এই অভিযানের কাজ শেষ হবে না—কোম্পানির জন্য এমন ব্যবস্থা করতে পারব যা আগের চেয়ে শুধু অনেক ভালই হবে না, আগে কোনওদিন যা হয়নি তাই এবার হবে।’[২৬] মাদ্রাজ থেকে যাত্রা করবার আগেই তিনি লেখেন যে ‘সিরাজদ্দৌল্লা একজন দুর্বল নবাব এবং তাঁর দরবারের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের মধ্যে অধিকাংশ তাঁর প্রতি বিরূপ।’[২৭] দরবারের মধ্যে এই যে অসন্তোষ তাকে কাজে লাগিয়ে, ক্লাইভের ভাষায়, ইংরেজরা ‘রাজনীতির দাবা খেলায় বাজিমাৎ করেছিল’ এবং এভাবেই তারা ষড়যন্ত্র পাকা করে পলাশিতে সিরাজদ্দৌল্লার পতন ঘটিয়েছিল। ক্লাইভ যখন তাঁর পিতাকে লিখছেন, ‘বাংলায় এ-অভিযান সার্থক হলে আমি বিরাট কিছু করতে পারব’, তখন তিনি নিশ্চয়ই কল্পলোকে বাস করছিলেন না।[২৮] এখানে উল্লেখযোগ্য, পঞ্চাশের দশকের প্রথমদিকে কলকাতার ইংরেজ ইঞ্জিনিয়র কর্নেল স্কট বাংলা বিজয়ের পরিকল্পনার যে প্ল্যান তৈরি করেছিলেন, ক্লাইভ ও ওরম দু’জনেই সে সম্বন্ধে সম্পূর্ণ অবহিত ছিলেন এবং এই পাণ্ডুলিপিটি তখন মাদ্রাজেই ছিল, যেখানে তখন ওঁরা দু’জনও ছিলেন। তা ছাড়াও ক্লাইভ যখন ১৭৪৯-৫০-এর শীতকালে কলকাতায় এসেছিলেন, বাংলার অগাধ ঐশ্বর্য তখন তাঁর মনে প্রচণ্ড রকমের দাগ কেটেছিল। তিনি খুব সম্ভবত মনে মনে ভাবছিলেন, আর্কটের যুদ্ধের পর তাঁর ব্যক্তিগত ব্যবসার এক সহযোগী ভবিষ্যৎবাণী করেছিল যে বাংলায় যদি যুদ্ধ লাগে তা হলে ক্লাইভ রাতারাতি খুব বড়লোক হয়ে যাবেন।[২৯] এই পরিপ্রেক্ষিতেই বাংলা বিজয়ের আগে তাঁকে মাদ্রাজ থেকে ডেকে পাঠাতে পারে বলে ক্লাইভের যে উদ্বেগ দেখা গেছে তা সহজে বোধগম্য।

ক্লাইভ তথা ইংরেজদের বাংলা বিজয়ের পেছনে যে মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল—যা আমরা আগেই বিশদভাবে আলোচনা করেছি—তা হল তাদের ব্যক্তিগত ব্যবসার লাভ লোকসানের খতিয়ান। এ-বিষয়ে এর আগে কখনও দৃষ্টিপাত করা হয়নি। মাদ্রাজ থেকে রওনা হওয়ার আগেই ক্লাইভ তাঁর পিতাকে লেখেন যে ডডিংটন (Doddington) জাহাজ ডুবে যাওয়ার ফলে তাঁর প্রায় তিন হাজার পাউন্ড ক্ষতি হয়েছে (খুব সম্ভবত ব্যক্তিগত ব্যবসায়ে নিয়োজিত) এবং তাঁর ভয় যে বাংলায় তাঁর ক্ষতির পরিমাণ (সিরাজদ্দৌল্লার কলকাতা আক্রমণের ফলে) আরও বেশি হবে।[৩০] এ-সব থেকে স্পষ্ট যে তিনি ব্যক্তিগত বাণিজ্যে লিপ্ত ছিলেন। বস্তুতপক্ষে কলকাতা পুনরুদ্ধার করার ক’দিন আগে, সম্ভবত যখন তিনি তাঁর ব্যক্তিগত ব্যবসার হিসেবপত্র পান, তখন তিনি তাঁর পিতাকে আবার লেখেন যে নবাবের কলকাতা আক্রমণের ফলে তাঁর ক্ষতির পরিমাণ আড়াই হাজার পাউন্ডের কম নয়।[৩১] তা ছাড়া মনে হয় যে বাংলায় অভিযানকে তিনি তাঁর কিছু ব্যক্তিগত উচ্চাভিলাষ পূরণ করার উপায় হিসেবেও দেখেছিলেন। কলকাতা পুনরুদ্ধার ও নবাবের সঙ্গে আলিনগরের চুক্তি সম্পাদন (৯ ফেব্রুয়ারী ১৭৫৭) করার পর তিনি তাঁর পিতাকে লেখেন:[৩২]

আমার এই সাফল্যে যেহেতু কোম্পানি খুব বেঁচে গেছে, সেজন্য আমার নিজের স্বার্থ গুছিয়ে নেবার এটাই প্রকৃষ্ট সময়। আমি লর্ড চ্যান্সেলর, আর্চবিশপ, মি. ফক্স (Fox) ও যুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী লর্ড ব্যারিংটনকে আমার দিকটা দেখতে লিখেছি। তা ছাড়াও আমি কোম্পানির ডাইরেক্টর মি. ম্যাবট (Mabbot) , ড্রেক ও পেইন-কেও (Payne) লিখেছি আমার কথাটা মাথায় রাখতে। আমার খুব বাসনা আমাকে ভারতবর্ষের গভর্নর জেনারেলের পদে নিয়োগ করা হোক, যদি এরকম পদ সৃষ্টি করার প্রয়োজন হয়। আমি অবশ্য মি. ম্যাবটকে অনেকটা খোলাখুলি ব্যাপারটা নিয়ে লিখেছি। তবে আপনি এ-বিষয়টা অত্যন্ত গোপনে এবং খুব সাবধানে সম্পন্ন করার চেষ্টা করবেন। কিন্তু ওঁদের মধ্যে কেউ গভর্নর জেনারেল পদের ইঙ্গিত না দিলে আপনি কথাটা উচ্চারণ করবেন না।

ক্লাইভ যে প্রথম থেকেই সিরাজদ্দৌল্লার বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক ভূমিকা নেবেন তা মাদ্রাজ কাউন্সিল তাঁকে যে নির্দেশ দিয়েছিল তা থেকেই অনুমান করা যায়। তাতে বলা হয়েছিল, ‘কলমের সঙ্গে অস্ত্রও ব্যবহার করতে হবে’ এবং নবাবের বিরুদ্ধে খুব তাড়াতাড়ি এবং দৃঢ়তার সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করে দিতে হবে।[৩৩] সঙ্গে সঙ্গে এটাও মাদ্রাজ থেকে বলে দেওয়া হয়েছিল যে নবাবের কলকাতা আক্রমণের বদলা হিসেবে হুগলি বা অন্য কোনও মুসলিম শহর আক্রমণ করে তা ধ্বংস করতে হবে।[৩৪] মনে হয় ক্লাইভের কৌশল ছিল যে কূটনীতি ও আলাপ আলোচনার মাধ্যমে যদি কাজ হয় তো ভাল। তবে সঙ্গে সঙ্গে তিনি বদ্ধপরিকর ছিলেন যে নবাবকে যুদ্ধক্ষেত্রে এমনভাবে পর্যুদস্ত করতে হবে যে আর কোনওদিন তিনি ইংরেজদের এবং তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য আক্রমণ করতে সাহস করবেন না। হয়তো তিনি এটাও ভেবেছিলেন যে একটা কিছু নাটকীয় কাণ্ড করতে পারলে তিনি লন্ডনে কোম্পানির পরিচালকদের সুখ্যাতি অর্জন করতে পারবেন। কিন্তু তাঁর ভবিষ্যতের উচ্চাভিলাষ ও বর্তমান কৌশলের প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন কলকাতার গভর্নর ড্রেক ও ফোর্ট উইলিয়াম কাউন্সিল। মাদ্রাজের গভর্নর পিগটকে তিনি ৮ জানুয়ারি ১৭৫৭-তে লেখেন যে, ‘আমার ওপর যে ক্ষমতা ও দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তাতে কোম্পানির এখানকার লোকজন খুবই অসন্তুষ্ট মনে হয়। এরা যা বলে তাতে বিন্দুমাত্র বিশ্বাস করবেন না। বিশ্বাস করুন এই লোকগুলি অত্যন্ত বাজে ধরনের এবং এদের মনোবৃত্তি অত্যন্ত জঘন্য। আমার বিরুদ্ধে আপনার মন বিষিয়ে দিতে এরা সবকিছু করতে পারে।….পেরু এবং মেক্সিকোর সব ধনরত্ন দিলেও এদের মধ্যে আমি থাকতে চাই না।’[৩৫]

সে যাই হোক, এ-বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই যে পলাশির ষড়যন্ত্রের ব্যাপারে ক্লাইভই প্রথমে উদ্যোগ নিয়েছিলেন এবং তিনিই ওয়াটস ও স্ক্র্যাফ্‌টনকে নির্দেশ দিয়েছিলেন তাঁরা যেন মুর্শিদাবাদ দরবারে নবাবের বিরুদ্ধে একটি ‘দল’ (party) তৈরি করতে লেগে যান। রবার্ট ওরম পরিষ্কার লিখেছেন যে মীরজাফর নবাবের ওপর বিরূপ জানতে পেরে ক্লাইভ ওয়াটসকে মীরজাফরের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে নির্দেশ দেন। বলা বাহুল্য, উদ্দেশ্য ষড়যন্ত্রের ভিত তৈরি করা।[৩৬] আবার ক্লাইভই সিলেক্ট কমিটিকে অনুরোধ করেছিলেন যাতে স্ত্র্যাফ্‌টনকে মুর্শিদাবাদে থাকতে অনুমতি দেওয়া হয় কারণ ‘ওখানে প্রয়োজনীয় কাজে তাঁকে দরকার হবে।’ কমিটিও তাতে রাজি হয়ে গেল কারণ তারা বুঝেছিল ‘কাজটা’ হচ্ছে দরবারের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের বাজিয়ে দেখা কমিটি তাই ক্লাইভকে জানাল তিনি যেন উপযুক্ত লোক দিয়ে দরবারের বিশিষ্ট অমাত্যদের বাজিয়ে দেখেন, ইংরেজদের সঙ্গে যোগ দিয়ে তারা সিরাজদ্দৌল্লাকে হঠাতে রাজি কি না।[৩৭] স্ক্র্যাফ্‌টনও লিখেছেন যে ক্লাইভ ওয়াটসকে নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি যেন একটি ‘দল’ তৈরি করেন, যারা নবাবের বিরুদ্ধে ইংরেজদের সঙ্গে হাত মেলাবে।[৩৮] পলাশির ষড়যন্ত্র ও যুদ্ধের পূর্ববর্তী ঘটনাক্রম বিশ্লেষণ করে এ-কথা বলা যায় যে, ক্লাইভ ষড়যন্ত্রের সাফল্যের জন্য যে-কোনও উপায় অবলম্বন করতে প্রস্তুত ছিলেন। অ্যাডমিরাল ওয়াটসন নবাবের অনুমতি ছাড়া চন্দননগর আক্রমণ করতে রাজি ছিলেন না, এমন একটা ধারণা প্রচলিত আছে। এই বাধা দূর করতে ক্লাইভের নির্দেশেই নাকি ওয়াটসনের সই জাল করা হয়েছিল। আবার তাঁর উদ্যোগেই সাদা ও লাল চুক্তির কৌশল অবলম্বন করে উমিচাঁদকে প্রতারিত করা হয়েছিল অথচ এই ক্লাইভই কিছুদিন আগে তাঁর মত ব্যক্ত করে জানিয়েছিলেন যে, চুক্তিতে উমিচাঁদের জন্য বিশেষ প্রাপ্তির ব্যবস্থা থাকা উচিত। সর্বোপরি সিলেক্ট কমিটির চাইতে তিনিই বেশি অস্থির ও অধৈর্য হয়ে পড়েছিলেন যাতে মীরজাফর এবং অন্যান্যরা চক্রান্তে অনড় থাকে এবং শেষ পর্যন্ত ইংরেজদের যেন পরিত্যাগ না করে।[৩৯] এটা আমরা পরের অধ্যায়ে বিশদভাবে আলোচনা করব।

টিকা ও মন্তব্য

  1. .
    পূর্বতন ঐতিহাসিকদের মতো (পিটার মার্শাল, রজত রায় ইত্যাদি) সম্প্রতি কুমকুম চ্যাটার্জীও (Merchants, Politics and Society, 1996, p. 103) বলেছেন যে ভারতীয় ষড়যন্ত্রকারীরাই সিরাজদৌল্লাকে হঠাবার জন্য চক্রান্তে যোগ দিতে ইংরেজদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। এ বক্তব্য মোটেই যুক্তিগ্রাহ্য নয়। তিনি আরও বলেছেন যে ইংরেজরা নবাব-বিরোধী গোষ্ঠীতে যোগ দিয়েছিল কারণ তারা ভয় পেয়েছিল সিরাজদৌল্লা হয়তো ইংরেজদের বিরুদ্ধে ফরাসিদের সঙ্গে আঁতাত করবেন। আমরা অবশ্য তথ্য-প্রমাণ দিয়ে দেখিয়েছি তাঁর এই মতও গ্রহণ যোগ্য নয়।
  2. .
    ওয়ালসকে লেখা স্ক্র্যাফ্‌টনের চিঠি, ৯ এপ্রিল ১৭৫৭, Hill, III, p. 343.
  3. .
    Scrafton, Reflections, p. 81.
  4. .
    ঐ, পৃ. ৯৮।
  5. .
    Watts’ to Governor and Fort William Council, 15 Aug. 1755, BPC, Range 1, vol. 28; FWIHC, vol. 1, pp. 884-85.
  6. .
    Watts’ Memoirs, p. 37.
  7. .
    ঐ, পৃ. ৪২।
  8. .
    Orme, Military Transactions, vol. II, Sec, I, p. 148; তাঁর পিতাকে লেখা ওয়াটসের চিঠি, ১৩ আগস্ট ১৭৫৭, Hill, II, p. 468.
  9. .
    Law’s Memoirs, Hill, III, p. 191.
  10. ১০.
    Watts’ Memoirs, p. 80.
  11. ১১.
    ক্লাইভকে ওয়াটস, ২৩ মে ১৭৫৭, Hill, II, pp. 392-93.
  12. ১২.
    ওয়াটস তাঁর পিতাকে, ১৩ আগস্ট ১৭৫৭, Hill, II, p. 469.
  13. ১৩.
    লন্ডনের সিক্রেট কমিটিকে ক্লাইভ, ৬ আগস্ট ১৭৫৭, Hill, II, p. 465.
  14. ১৪.
    Hill, 1, p. clxxxiv; Hill, II, p. 367.
  15. ১৫.
    ওয়ালসকে স্ক্র্যাফ্‌টন, ১৮ এপ্রিল ১৭৫৭, Hill, II, pp. 342-43.
  16. ১৬.
    ঐ, ২০ এপ্রিল ১৭৫৭, Hill, II, p. 349.
  17. ১৭.
    ঐ, পৃ. ৩৫০৷
  18. ১৮.
    ঐ।
  19. ১৯.
    ওয়ালসকে স্ক্র্যাফ্‌টনের চিঠি, ২১ এপ্রিল ১৭৫৭, Hill, I, p. 351.
  20. ২০.
    ক্লাইভকে স্ক্র্যাফ্‌টনের চিঠি, ২৪ এপ্রিল ১৭৫৭, Hill, II, pp. 357-58.
  21. ২১.
    ঐ, পৃ. ৩৫৮।
  22. ২২.
    Fort St. George, Select Committee Consultations, 1 Oct. 1756, Hill, II, p. 225; ক্লাইভকে ফোর্ট সেন্ট জর্জ কাউন্সিল, ১৩ অক্টোবর ১৭৫৬, Hill, II, p. 234.
  23. ২৩.
    Scrafton, Reflections, p. 62.
  24. ২৪.
    সিয়র-উল-মুতাখারিন, ২য় খণ্ড, পৃ. ২১৯; মুজাফ্‌ফরনামা, পৃ. ৭১; রিয়াজ-উস-সলাতিন,পৃ. ৩৭০।
  25. ২৫.
    Michael Edwardes, Plassey, p. 84; Mark Bence-Jones, Clive of India, p. 189.
  26. ২৬.
    লন্ডনে সিক্রেট কমিটিকে ক্লাইভের চিঠি, ১১ অক্টোবর ১৭৫৬, Hill, I, pp. 232-33.
  27. ২৭.
    Ome Mss.,O.V.vol. 6, f. 1500.
  28. ২৮.
    পিতাকে লেখা ক্লাইভের চিঠি, ৫ অক্টোবর ১৭৫৬, Hill, I, p. 227.
  29. ২৯.
    Powe Collection, Box 20, John Brown to Clive, 27 Feb. 1752, quoted in Mark Bence-Jones, Clive, p. 93.
  30. ৩০.
    ক্লাইভ তাঁর পিতাকে, ৫ অক্টোবর ১৭৫৬, Hill, I, p. 227.
  31. ৩১.
    পিতাকে লেখা ক্লাইভের চিঠি, ৩ বা ৪ ফেব্রুয়ারি ১৭৫৭, Hill, II, p. 210.
  32. ৩২.
    ঐ, ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৭৫৭, Hill, II, p.243.
  33. ৩৩.
    ফোর্ট উইলিয়ামের সিলেক্ট কমিটিকে লেখা ফোর্ট সেন্ট জর্জের সিলেক্ট কমিটির চিঠি, ১৩ অক্টোবর ১৭৫৬, Hill, I, p.239.
  34. ৩৪.
    Fort St. George Public Consultations, 29 Sept. 1756, Hill, I, p. 222.
  35. ৩৫.
    পিগটকে লেখা ক্লাইভের চিঠি, ৮ জানুয়ারি ১৭৫৭, Hill, II, pp. 96-97.
  36. ৩৬.
    Robert Orme, Military Transactions, vol. II, Sec. I, p. 148.
  37. ৩৭.
    Select Committee Consultations, 23 April 1757; Orme Mss., India V, ff. 1212-14; Ome Mss. O.V. 170, f. 222.
  38. ৩৮.
    Scrafton, Reflections, p. 81.
  39. ৩৯.
    সম্প্রতি কুমকুম চ্যাটার্জী (Merchants, Politics and Society, pp. 103-04, fn. 4). আমার একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য মানতে দ্বিধা প্রকাশ করেছেন। আমি বলতে চেয়েছি যে প্রাক্‌-পলাশি বাংলায় ইংরেজদের সঙ্গে বাংলার ব্যবসায়ী ও বাণিজ্যিক শ্রেণীর কোনও রকমের ‘কোলাবোরেশন’ গড়ে ওঠেনি যাতে করে কেমব্রিজ স্কুলের পলাশি সম্বন্ধে কোলাবোরেশন থিসিস আমি খণ্ডন করতে চেয়েছি। কারণ হিসেবে আমি দেখিয়েছি যে ইংরেজ কোম্পানির সঙ্গে এই ব্যবসায়ীদের স্বার্থ নিবিড়ভাবে জড়িয়ে যাবার প্রশ্নই ওঠে না। কুমকুম বলছেন, যেহেতু আমার বক্তব্যে ইউরোপীয় এবং এশীয় বণিকদের বাণিজ্যের তুলনামূলক যথেষ্ট পরিসংখ্যানের অভাব আছে, তাই আমার বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়। তার মত যে সম্পূর্ণ ভ্রান্ত তা আমার বই, From Prosperity to Decline, ৫ম, ৭ম ও ৮ম অধ্যায় এবং এই বইয়ের ৪র্থ অধ্যায় ও আমার Etrafo 24h The Asian Merchants and Companies in Bengal’s Export Trade, Circa, mid-Eighteenth Century’, S. Chaudhury and M. Morineau, eds., Merchants, Companies and Trade: Europe and Asia in Early Modern Era’, পৃ. ৩০০-৩২০, একটু যত্ন করে পড়লেই স্পষ্ট হয়ে যাবে। এগুলিতে যথেষ্ট পরিমাণ পরিসংখ্যান আছে।