রাজসিংহ

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

এই পাতাটি মূলগ্রন্থের অংশ নয়!

‘রাজসিংহ’ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের একমাত্র ঐতিহাসিক উপন্যাস। বঙ্গদর্শন পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশের পর উপন্যাসটি প্রথম গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দে। এরপর ১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত চতুর্থ সংস্করণে আমূল পরিমার্জন ও পরিবর্ধনের পর উপন্যাসটির কলেবর পাঁচ গুণ বৃদ্ধি পায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই উপন্যাসটির বিস্তারিত আলোচনা করেছিলেন।

সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় ১২৮৪ বঙ্গাব্দের বৈশাখ মাস থেকে বঙ্গদর্শন পুনঃপ্রকাশিত হলে বঙ্কিমচন্দ্র প্রথম সংখ্যা থেকেই লিখতে শুরু করেন। ওই বছরের মাঘ সংখ্যায় তিনি কৃষ্ণকান্তের উইল শেষ করেন। এক মাস বাদ দিয়ে চৈত্র (১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দের মার্চ-এপ্রিল) সংখ্যা থেকে লিখতে শুরু করেন রাজসিংহ। ১২৮৫ সালের ভাদ্র মাস পর্যন্ত ছয়টি সংখ্যায় লিখে উপন্যাসটি বঙ্কিমচন্দ্র অসমাপ্ত অবস্থায় ফেলে রেখে দিয়েছিলেন। তিন বছর পরে ১২৮৮ বঙ্গাব্দে (৪ ফেব্রুয়ারি, ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দ) রাজসিংহ সরাসরি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। বইটির আখ্যাপত্রে রাজসিংহ নামটির পাশে আলাদা ভাবে “ক্ষুদ্র কথা”ও লেখা ছিল।

প্রথম সংস্করণে এর পৃষ্ঠাসংখ্যা ছিল ৮৩। ১২৯২ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত দ্বিতীয় সংস্করণে উপন্যাসটির পৃষ্ঠাসংখ্যা সামান্য বৃদ্ধি পেয়ে হয় ৯০। দ্বিতীয় সংস্করণের সময় বঙ্কিমচন্দ্র এটিকে তাঁর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উপন্যাস গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত করেন। তৃতীয় সংস্করণ পর্যন্ত সামান্য পরিবর্তনের ফলে পৃষ্ঠাসংখ্যা একই থাকে। ১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দের ১০ অগস্ট রাজসিংহ-এর চতুর্থ সংস্করণ প্রকাশিত হয়। এই সংস্করণটি ব্যাপক পরিমার্জন ও পরিবর্ধনের ফলে সম্পূর্ণ নতুন রূপ লাভ করে এবং পৃষ্ঠাসংখ্যা অনেকটাই বেড়ে হয় ৪৩৪।

রাজসিংহ উপন্যাসটি আটটি খণ্ড ও একটি উপসংহার অংশে বিন্যস্ত। আটটি খণ্ডের নাম যথাক্রমে “চিত্রে চরণ”, “নন্দনে নরক”, “বিবাহে বিকল্প”, “রন্ধ্রে রন্ধ্রে”, “অগ্নির আয়োজন”, “অগ্নি উৎপাদন”, “অগ্নি জ্বলিল” ও “আগুনে কে কে পুড়িল?” এবং উপসংহার অংশটি “গ্রন্থকারের নিবেদন” নামে নামাঙ্কিত।

জেমস টডের দ্য অ্যানালাস অ্যান্ড অ্যান্টিকুইটিজ অফ রাজস্থান গ্রন্থে রূপনগরের এক রাজকুমারের কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকারের মতে, রাজসিংহ উপন্যাসের চঞ্চলকুমারী আসলে কিসনগড় রাজ্যের রাজকুমারী চারুমতী। আওরঙ্গজেব চারুমতীকে বিয়ে করতে চাইলে তিনি কুলপুরোহিতকে দিয়ে রাজসিংহের কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন। তবে রাজসিংহের সঙ্গে চারুমতীর বিয়ে হলেও তা নিয়ে আওরঙ্গজেবের সঙ্গে রাজসিংহের বিরোধ বাধেনি।

রাজসিংহ ঐতিহাসিক চরিত্র। তাঁর নামানুসারেই উপন্যাসটির নামকরণ করা হয়েছে। অশোককুমার কুণ্ডুর মতে, “…তিনি যে নায়ক বলেই তাঁর নামে গ্রন্থের নামকরণ করা হয়েছে তা নয়, বঙ্কিমের প্রতিপাদ্য বিষয় যে হিন্দুর বাহুবলের প্রতিষ্ঠা তা রাজসিংহকে কেন্দ্র ক’রেই প্রকাশিত বলে, আদর্শ হিসাবে তাঁর নামানুসারেই গ্রন্থের নামকরণ করেছেন।” তবে রবীন্দ্রনাথ রাজসিংহকে এককভাবে উপন্যাসের নায়ক বলতে রাজি হননি। তাঁর মতে, “ঐতিহাসিক অংশের নায়ক ঔরঙ্গজেব, রাজসিংহ ও বিধাতাপুরুষ।”

রাজসিংহ রাজপুত বীর। তাঁর চরিত্রে বীরত্ব, মহত্ত্ব ও রণকৌশলের সমন্বয় ঘটেছে। এগুলি তাঁর ইতিহাস-সম্মত গুণাবলি। তিনি দেশপ্রেমিক। পরাধীনতার প্রতি তাঁর স্বাভাবিক ঘৃণা। কিন্তু এর বাইরে বঙ্কিমচন্দ্র যেখানে নিজের কল্পনা দ্বারা রাজসিংহের চরিত্রে নতুন ঘটনা যোগ করেছেন, সেখানেই চরিত্রটি সজীব হয়ে উঠেছে।

চঞ্চলকুমারীর বিপদে রাজসিংহের রূপনগর যাত্রার পিছনে তাঁর বীরত্বের অভিমান এবং শরণাগতের প্রতি কর্তব্যপালনের মনোভাবটি কাজ করেছে। তিনি বয়সে প্রৌঢ়। তাই নতুন নারীর প্রতি আকর্ষণ তাঁর পক্ষে অনিবার্য না হলেও মবারকের সামএন দাঁড়িয়ে চঞ্চলকুমারীর রূপ দেখে সেই সৌন্দর্যের কাছে হার মেনেছিলেন। তারপর রাজসিংহের হৃদয়ে ধীরে ধীরে চঞ্চলকুমারীর স্মৃতি জাগরিত হলেও রাজোচিত ও বয়সোচিত গাম্ভীর্যে তিনি তা দমন করেছেন। চঞ্চলকুমারীর মন পরীক্ষা তাঁর বিচক্ষণতার পরিচায়ক। চঞ্চলকুমারীর পিতার অমতে তাঁকে বিবাহ না করার সিদ্ধান্ত রাজসিংহের রাজনৈতিক বিচক্ষণতার পরিচয় দেয়। কারণ, সেই বিবাহের ফলে রাজপুতানাতেও তাঁর শত্রুবৃদ্ধি ঘটত। চঞ্চলকুমারী ও রাজসিংহের মিলনে বঙ্কিমচন্দ্র প্রেমের চাপল্য দেখাননি। তার কারণ সম্ভবত রাজসিংহের বয়স। তাছাড়া চঞ্চলকুমারী-সংক্রান্ত ঘটনা ছাড়া উপন্যাসে রাজসিংহের সাংসারিক জীবনের আর কোনো ছবি পাওয়া যায় না।

রাজসিংহের অন্যান্য গুণের মধ্যে দয়া ও কৃতজ্ঞতাবোধ অন্যতম। ডাকাত মাণিকলালকে তিনি দয়াপরবশ হয়ে রক্ষা করেছেন, আবার তার কাজে সন্তুষ্ট হয়ে তিনি তাকে উপযুক্ত মর্যাদাও দিয়েছেন। আবার মবারকের কাজে সন্তুষ্ট হয়ে তাঁর সঙ্গে জেব-উন্নিসার মিলন নিষ্কণ্টক করতে তৎপর হয়েছেন। যুদ্ধে ছলে-বলে শত্রুকে পরাজিত করা নীতি হলেও, রাজসিংহের নীতি ছিল স্বতন্ত্র। তাই পারিষদবর্গের বিরোধিতা সত্ত্বেও তিনি ক্ষুধার্ত ঔরঙ্গজেব ও তাঁর সৈন্যদের মুক্তি দিতে দ্বিধা করেননি।

১৩০০ বঙ্গাব্দের চৈত্র মাসে (যে মাসে বঙ্কিমচন্দ্রের মৃত্যু হয়) রবীন্দ্রনাথ রাজসিংহ উপন্যাসের চতুর্থ সংস্করণের একটি সমালোচনা লিখে সাধনা পত্রিকায় প্রকাশ করেন। গবেষক গোপালচন্দ্র রায় মনে করেন, বঙ্কিমচন্দ্র উক্ত সমালোচনাটি দেখেও থাকতে পারেন। পরে সমালোচনাটি রবীন্দ্রনাথের আধুনিক সাহিত্য গ্রন্থে “রাজসিংহ” নামে প্রকাশিত হয়। গবেষক অশোককুমার কুণ্ডুর মতে, রাজসিংহ-এর রবীন্দ্রনাথের এই মূল্যায়নটির তুলনায় সার্থক সমালোচনা আজ পর্যন্ত হয়নি। উপন্যাসটির গতি রবীন্দ্রনাথকে মুগ্ধ করেছিল। চলমান সৈন্যদলের সঙ্গে তিনি তুলনা করেছেন উপন্যাসের কাহিনিকে।

সমালোচক মোহিতলাল মজুমদার মনে করেন শেকসপিয়রীয় তথা ইউরোপীয় ট্র্যাজেডির ধারাটিকে বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর একাধিক উপন্যাসে পরিস্ফুট করে তুলেছিলেন। তিনি লিখেছেন, “…‘রাজসিংহে’ সেই য়ুরোপীয় ট্র্যাজেডিই এক নূতন ছন্দে তাঁহার কল্পনাকে পুনরায় আশ্রয় করিয়াছে।…পুরুষবীর মোবারককে প্রবৃত্তির ক্রীড়ানক করিয়া তাহার জীবনেও দৈবের সেই অট্টহাস-কোন অধ্যাত্মনীতি বা ন্যায়নীতি দ্বারা সেই ট্র্যাজেডির অন্ধকার ভেদ করা যায় না।”