রাজসিংহ

ভূমিকা

‘রাজসিংহ’ রচনায় বঙ্কিমের উদ্দেশ্য

পর্ষৎ সংস্করণে যদুনাথ সরকার লিখিত ভূমিকা, এটি মূল গ্রন্থের অংশ নয়।

বঙ্কিমচন্দ্র কি উদ্দেশ্যে ‘রাজসিংহ’ লেখেন, তাহা তিনি নিজেই এই কথাগুলিতে বলিয়া দিয়াছেন, “ব্যায়ামের অভাবে মনুষ্যের সর্ব্বাঙ্গ দুর্ব্বল হয়। জাতি সম্বন্ধেও সে কথা খাটে। ইংরাজ সাম্রাজ্যে হিন্দুর বাহুবল লুপ্ত হইয়াছে। কিন্তু তাহার পূর্ব্বে কখনও লুপ্ত হয় নাই। হিন্দুদিগের বাহুবলই আমার প্রতিপাদ্য। উদাহরণ-স্বরূপ আমি রাজসিংহকে লইয়াছি। …যখন বাহুবলমাত্র আমার প্রতিপাদ্য, তখন উপন্যাসের আশ্রয় লওয়া যাইতে পারে।”

‘রাজসিংহে’র আরম্ভেই গ্রন্থকার বলিতেছেন, “আমি পূর্ব্বে কখন ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখি নাই ৷ দুর্গেশনন্দিনী বা চন্দ্রশেখর বা সীতারামকে ঐতিহাসিক উপন্যাস বলা যাইতে পারে না। এই প্রথম ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখিলাম।” বঙ্কিম ঐতিহাসিক উপন্যাসকে যে সংজ্ঞা দিয়াছেন, তাহাতে যদি ‘সীতারাম’ বাদ যায়, তবে ‘আনন্দমঠ’ ‘দেবী চৌধুরাণী’কেও বাদ দিতে হইবে।

আবার বঙ্কিম নিজেই এই পার্থক্যের কারণ নির্দ্দেশ করিয়াছেন। তাঁহার মতে এই শ্রেণীর উপন্যাসে মূল ঘটনা এবং অধিকাংশ ব্যক্তিগণ (নাম বদলাইয়া বা না বদলাইয়া লওয়া হইয়াছে, তাহাতে আসে যায় না) এবং অনেক কথাবার্ত্তা ও চরিত্রের গুণ দোষগুলি নিছক জ্ঞাত ইতিহাস হইতে লওয়া; এবং সেই সত্য ভিত্তি বা কাঠামোর উপর গ্রন্থকার নিজ কল্পনার বলে কতকগুলি কথাবার্ত্তা ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘটনা (যাহাকে episodes বলা যায়) এবং নায়ক-নায়িকা ও গার্হস্থ্যজীবনের সাধারণ দৈনন্দিন দৃশ্যগুলি অতিরিক্ত সৃষ্টি করিয়া দিয়াছেন।

বঙ্কিম বলিতেছেন, “সে কথা পাঠকের হৃদয়ঙ্গম করিতে গেলে … রাজসিংহের সঙ্গে মোগল বাদশাহের যে মহাযুদ্ধ হইয়াছিল, তাহা সমস্তই উপন্যাসভুক্ত করিতে হয়। …স্থূল ঘটনা অর্থাৎ যুদ্ধাদির ফল, ইতিহাসে যেমন আছে, প্রায় তেমনই রাখিয়াছি। কোন যুদ্ধ বা তাহার ফল কল্পনাপ্রসূত নহে। তবে যুদ্ধের প্রকরণ যাহা ইতিহাসে নাই, তাহা গড়িয়া দিতে হইয়াছে। ঔরঙ্গজেব, রাজসিংহ, জেব-উন্নিসা, উদিপুরী, ইহারা ঐতিহাসিক ব্যক্তি। ইহাদের চরিত্রও ইতিহাসে যেমন আছে, সেইরূপ রাখা গিয়াছে। তবে ইহাদের সম্বন্ধে যে সকল ঘটনা লিখিত হইয়াছে, সকলই ঐতিহাসিক নহে। উপন্যাসে সকল কথা ঐতিহাসিক হইবার প্রয়োজন নাই।”

‘আনন্দমঠ’, ‘দেবী চৌধুরাণী’ ও ‘সীতারাম’ হইতে ‘রাজসিংহে’র এইটি প্রথম পার্থক্য, এবং ইহা গ্রন্থকার-কর্ত্তৃক স্বীকৃত। দ্বিতীয় পার্থক্য যে কি, তাহা এই সংস্করণের ‘আনন্দমঠে’র আমার রচিত ভূমিকায় দেখাইয়াছি—“‘আনন্দমঠ’, ‘দেবী চৌধুরাণী’ ও ‘সীতারামে’র মধ্যে যে অমৃতরস আছে, তাহা…সত্য ঐতিহাসিক কোন উপন্যাসে পাওয়া যায় না। …এই গ্রন্থগুলিতে তিনি দৃষ্টান্ত দিয়া দেখাইয়াছেন যে, আত্মসংযম ও ধর্ম্ম-অনুশীলনের ফলে মানব-চিত্ত ক্রমেই উচ্চ হইতে উচ্চতর নৈতিক সোপানে উঠিতে থাকে, অবশেষে এই সব কর্ম্মযোগীরা আর পার্থিব রক্তমাংসের নরনারী থাকে না, নরদেহে দেবতা বা বোধিসত্ত্বে পরিণত হইয়া যায়।”

অতএব ‘রাজসিংহে’ ইতিহাসের সত্যের উপরই প্রধানতঃ জোর দিতে হইবে, ইহা বঙ্কিমের অভিপ্রায় ছিল। দেখা যাউক, ইহাতে তিনি কত দূর সফল হইয়াছেন। তিনি যখন ‘রাজসিংহ’ রচনা করেন, তখন “রাজসিংহের সঙ্গে মোগল বাদশাহের যে মহাযুদ্ধ হইয়াছিল”, তাহার পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস লেখা অসম্ভব ছিল। এজন্য ইতিহাস-প্রিয় বঙ্কিম দুঃখ করিয়াছেন— “রাজপুত্রগণের বীর্য্য [মহারাষ্ট্রীয়দিগের অপেক্ষা] অধিকতর হইলেও, এদেশে তেমন সুপরিচিত নহে। …প্রকৃত ঐতিহাসিক ঘটনা কি, তাহা স্থির করা দুঃসাধ্য। মুসলমান ইতিহাস-লেখকেরা অত্যন্ত স্বজাতিপক্ষপাতী; হিন্দুদ্বেষক। …রাজপুত ইতিহাসের উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করা যায় না— স্বজাতিপক্ষপাত নাই, এমন নহে। মনুষী নামে একজন বিনিসীয় চিকিৎসক মোগলদিগের সময়ে ভারতবর্ষে বাস করিয়াছিলেন। তিনিও মোগল সাম্রাজ্যের ইতিহাস লিখিয়া রাখিয়াছিলেন; কক্র নামা এক জন পাদ্রি তাহা প্রকাশিত করিয়াছিলেন। কিন্তু এই তিন জাতীয় ইতিহাসে পরস্পরের সহিত অনৈক্য আছে। ইহাদের মধ্যে কাহার কথা সত্য, কাহার কথা মিথ্যা, তাহার মীমাংসা দুঃসাধ্য। অন্ততঃ এ কার্য্য বিশেষ পরিশ্রমসাপেক্ষ।”

আওরংজীবের রাজপুত-যুদ্ধের ঐতিহাসিক উপকরণ উদ্ধার

কিন্তু আজ এরূপ দুঃখ করিবার কারণ নাই। বঙ্কিমের পর এই অর্দ্ধ শতাব্দীরও ক‍ম সময়ের মধ্যে যে সব ঐতিহাসিক উপাদান আবিষ্কৃত হইয়াছে, তাহার ফলে এই রাজপুত-মুঘল সংঘর্ষের ইতিহাস একমাত্র সময় বর্ণনা হইতে যেমন বিস্তৃত ও বিশুদ্ধ ভাবে রচনা করা যায়, এমন আর কোন যুগের ভারত-ইতিহাসে সম্ভব নহে। এখন এই সব নূতন উপাদান ও তাহার মূল্য সংক্ষেপে বর্ণনা করিবার পর, আমি এই মহাযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস পাঠকের সম্মুখে উপস্থিত করিব, তাহা হইতে দেখা যাইবে যে, বঙ্কিম কল্পনার বেগে সত্যকে অতিক্রম করেন নাই, সত্যকে জীবন্ত আলোকে উদ্ভাসিত করিয়াছেন মাত্র।

বঙ্কিম জানিতেন, শুধু টডের ‘রাজস্থান’ (যাহার ভিত্তি ততোধিক ভীষণ কল্পনাপ্রিয় ডাউ সাহেবের মুঘল ইতিহাস), ফারসীজ্ঞানহীন অর্ম্ম এবং মানুচী, এই তিন লেখক হইতেই তাঁহার ইতিহাস লওয়া, আর বর্ণনার জন্য বর্নিয়ারের ভ্রমণবৃত্তান্ত। ইহার মধ্যে অর্ম্ম আবার “বেশির ভাগ কথা মানুচী হইতে লইয়াছি” (Hist. Fragments, ed. of 1805, p. 169 ) বলিয়া স্বীকার করিয়াছেন।

কিন্তু ঐ যুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস জানিবার পক্ষে বিবিধ শ্রেণীর বিবরণ বিবিধ ভাষায় আজ পাওয়া যায়। ইহার সবগুলিই প্রথম শ্রেণীর বিশ্বাসযোগ্য সাক্ষী, অর্থাৎ প্রত্যক্ষদ্রষ্টার কাহিনী এবং সরকারী রিপোর্ট ও চিঠিপত্র এবং ইহাদের সংখ্যাও অগণ্য।

প্রথম, আওরংজীবের পুত্র মুহম্মদ আকবরের লিখিত সমস্ত ফারসী চিঠি; এগুলিতে ঐ মহাযুদ্ধের প্রধান অংশটি উজ্জ্বল হইয়া উঠে। ‘আদাব-ই-আলমগীরী’ নামক গ্রন্থের পরিশিষ্টে এগুলি সংগৃহীত হইয়াছে। স্বয়ং আওরংজীব রাজসিংহকে যে সব ফারসী পত্র লেখেন, তাহার মধ্যে যেগুলি এখনও উদয়পুরে রক্ষিত আছে, তাহা কবিরাজ শ্যামলদাসকৃত ‘বীরবিনোদ’ নামক হিন্দী গ্রন্থের ২য় খণ্ডে ছাপা হইয়াছে।

দ্বিতীয়, হাতে লেখা দৈনিক সংবাদপত্র, নাম “আখ্‌বারাৎ-ই-দর্‌বার-ই-মুয়াল্লা” (ফারসী)। প্রত্যহ বাদশাহী দরবারে কি কি ঘটনা ঘটিল, শহর প্রদেশ বা অভিযান হইতে যে সব রিপোর্ট বাদশাহের নিকট পৌঁছিল, তাহার মধ্যে যেগুলি প্রকাশ্য দরবারে পড়া হইল—তাহা, বাদশাহের উক্তি, এবং অন্যান্য সরকারী হুকুম (ঠিক আমাদের গভর্ণমেন্ট গেজেটের মত), এ সব শুনিয়া করদ রাজাদের নিযুক্ত লেখকগণ (নাম ওয়াকেয়ানবিস) তাহা তৎক্ষণাৎ লিখিয়া সাত দিন বা পনের দিন পরে পরে সেগুলি নিজ প্রভুর নিকট পাঠাইত। জয়পুরের রাজশেরেস্তায় এই সব আখ্‌বারাৎ রক্ষিত হইয়াছে, এই যুদ্ধের তিন বৎসরের কাগজ প্রায় হাজার পাতা হইবে। এগুলি হইতে অত্যন্ত খাঁটি, সমসাময়িক এবং এত কাল পর্য্যন্ত অবিকৃত অবস্থায় রক্ষিত সংবাদ পাওয়া যায়।

তৃতীয়, আওরংজীবের সরকারী ইতিহাস, নাম “মা’সির-ই-আলমগীরী”, ঐ বাদশাহের প্রিয় শিষ্য এবং সেক্রেটারী (মুরীদ্-ই-খাস্, মুন্সী) ইনায়েৎউল্লা খাঁর আদেশে এবং সরকারী দপ্তরখানার সব কাগজপত্র (বিশেষতঃ ওয়াকেয়া বা রিপোর্ট) দেখিয়া, বিশ্বস্ত রাজকর্ম্মচারী সাকী মুস্তাদ খাঁ কর্ত্তৃক রচিত। ইহাতে আওরংজীবের কার্য্য, চরিত্র ও উক্তি সম্বন্ধে যাহা বলা হইয়াছে, তাহা শত্রুর উক্তি বা বাজার গুজব বলিয়া উড়াইয়া দেওয়া যায় না, তাঁহার স্বীকৃত রাজনীতি ও মত বলিয়া গ্রহণ করিতেই হইবে।

চতুর্থ, ঈশ্বরদাস নাগর নামক একজন গুজরাতী ব্রাহ্মণ (বিখ্যাত প্রাচীন রাজধানী আনহিলওয়ারা পট্টননিবাসী) ঠিক এই সময় মাড়োয়ারে মুঘলদের অধীনে আমলার কাজ করিতেন; তাঁহার ফারসী ভাষায় রচিত ইতিহাস, হিন্দুর লেখা বলিয়া অপূৰ্ব্ব মূল্যবান্।

পঞ্চম, ভিনিশীয় ভ্রমণকারী নিকোলো মানুচীর সুদীর্ঘ বিবরণ, নাম Storia do Mogor অর্থাৎ ‘মুঘলদের ইতিহাস’ (ইতালীয়, পোর্তুগীজ ও ফরাসী ভাষায় লিখিত)। ইহার হস্তলিপি হইতে কত্রু (Catrou) নামক এক জন জেসুয়িট্ পাদ্রী চুরি করিয়া, ফরাসী ভাষায় সংক্ষিপ্ত অথচ অন্য উপাদানের সঙ্গে মিশ্রিত এক ফরাসী অনুবাদ প্রকাশ করেন (১৭০৫ এবং ১৭১৫ খ্রীষ্টাব্দে, দুই খণ্ডে)। ইহাই অর্ম্মের, টডের এবং বঙ্কিমের একমাত্র অবলম্বন ছিল। কিন্তু আসল গ্রন্থের বিশুদ্ধ ও অগাধ পাণ্ডিত্যপূর্ণ টীকা-সম্বলিত ইংরাজী অনুবাদ, উইলিয়ম আর্ভিন সাহেব ১৯০৭ এবং ১৯০৮ সালে চারি ভলুমে ছাপিয়াছেন।

রাজস্থানী হিন্দী অর্থাৎ ডিঙ্গল ভাষায় ‘রাজবিলাস’ নামক কাব্য (মান-কবিকৃত) মহারাণা রাজসিংহের প্রশস্তি মাত্র। তেমনই, রাজসমুদ্র নামক কৃত্রিম হ্রদের তীরে ২৫ খানা বৃহৎ প্রস্তরফলকে খোদা “রাজ প্রশস্তি মহাকাব্য” (সংস্কৃতে) এই মহারাণার কীর্তি ঘোষণা করিতেছে। ফলতঃ রাজস্থানী ভাষায় এই মহাযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস একখানাও পাওয়া যায় নাই। বঙ্কিম রাজপুত কবিদের বিবরণ অগ্রাহ্য করিয়া তাঁহার ন্যায়বিচার- শক্তিরই প্রমাণ দিয়াছেন।

‘রাজসিংহ’ উপন্যাসের মধ্যে ঐতিহাসিক ভুল

এই সকল উপাদান হইতে বিচারপূর্ব্বক তথ্য লইয়া ‘রাজসিংহে’ বর্ণিত ঐতিহাসিক ঘটনাটির প্রকৃত ইতিহাস পরে দিতেছি। তাহার পূর্ব্বে এই গ্রন্থের মধ্যে কয়েকটি ঐতিহাসিক ভুল দেখাইয়া দিব, যদিও এগুলি উপন্যাসের পক্ষে মারাত্মক নহে; কারণ, বঙ্কিম নিজেই বলিয়াছেন যে, “উপন্যাসে সকল কথা ঐতিহাসিক হইবার প্রয়োজন নাই।”

(১) ২য় খণ্ড, ৫ম পরিচ্ছেদ। “আওরংজীবের প্রধানা মহিষী যোধপুরী বেগম– যোধপুররাজকন্যা”। এই বাদশাহ কোন যোধপুর রাজকন্যাকে বিবাহ করেন নাই; তাঁহার একমাত্র হিন্দু পত্নীর নাম “নবাব-বাঈ”, কাশ্মীর প্রদেশের রাজাউর শহরের ক্ষুদ্র রাজার কন্যা। ইহারই পুত্র শাহ আলম পরে বাহাদুর শাহ নাম লইয়া দিল্লীর সম্রাট হন। নবাব-বাঈকে মুসলমান করিয়া তাহার পর আওরংজীবের সঙ্গে বিবাহ দেওয়া হয়। আকবরের পর বাদশাহী মহলে কোন হিন্দু মহিষী হিন্দু আচার-ব্যবহার রক্ষা করিতে পারিতেন না, তাঁহাদের মুসলমান হইয়া থাকিতে এবং মৃত্যুর পর কবরে আশ্রয় পাইতে হইত। এমন কি, যখন আওরংজীবের পুত্র আজম শাহের সঙ্গে বিবাহের জন্য বিজাপুরী রাজকন্যা শহরবাণু বেগমকে আনয়ন করা হইল, তাঁহাকে ছয় মাস ধরিয়া ধর্ম্মশিক্ষা দিয়া, শিয়া হইতে সুন্নী করিয়া, তাহার পর বিবাহকার্য সম্পন্ন করা হয়।

(২) ২য় খণ্ড, ২য় পরিচ্ছেদ। “পিসী-ভাইঝি (অর্থাৎ রৌশনারা এবং জেব-উন্নিসা) উভয়ে অনেক স্থলেই মদনমন্দিরে প্রতিযোগিনী হইয়া দাঁড়াইতেন।” কিন্তু যে মানুচী হইতে এই সংবাদ লওয়া হইয়াছে, তাহার গ্রন্থে জেব-উন্নিসার চরিত্রে কোন কলঙ্কপাত করা হয় নাই, তাঁহার কনিষ্ঠা ভগিনী ফখর-উন্নিসার উপর এই দুর্নাম দেওয়া হইয়াছে। (Storia do Mogor, Irvine’s trans, ii. 35.)

(৩) ৮ম খণ্ড, ২য় পরিচ্ছেদ এবং ৭ম খণ্ড, ৩য় পরিচ্ছেদ, আওরংজীব মহারাণার সৈন্য কর্ত্তৃক ঘেরাও হইয়া এক দিন অনাহারে কাটাইলেন, উদিপুরী বেগম বন্দিনী হইবার পর রাণা তাঁহাকে মুক্তি দিলেন।

টডের এই বিবরণ সত্য নহে, এবং জ্ঞাত ইতিহাসের অন্যান্য ঘটনা হইতে অসম্ভব প্রমাণ হয়। বাদশাহী সৈন্যদল মেবারে অনেক বার ঘেরাও হয় এবং আহারের অভাবে এবং রাজপুতদের ভয়ে আড়ষ্ট হইয়া থাকে–এ কথা সত্য, এবং ফারসী ইতিহাস হইতে প্রমাণ হইয়াছে, কিন্তু স্বয়ং বাদশাহ নহে। তবে কুচ করিবার সময় কখন কখন তাঁহার নিজ রক্ষীদলের মধ্যেও রসদ আনা রাজপুতেরা বন্ধ করিয়া দেয়। ফলতঃ টড, হসন আলি খাঁর বিযুক্ত দলের (detachment) এবং শাহজাদা আকবরের নিজ সৈন্যবিভাগের বিপদ ও ভয়ভীতিকে বাদশাহের নিজদলের উপর চাপাইয়াছেন। আমার History of Aurangzib, vol iii. pp. 840, 379তে এই বিষয় বিস্তৃত আলোচনা করিয়া দেখানো হইয়াছে।

ঐতিহাসিক সত্যের অন্যান্য কয়েকটি ছোট খাট ব্যতিক্রম এই গ্রন্থে আছে, তাহা এখানে উল্লেখ করিব না। আর, সেই যুগের এবং দেশের পক্ষে অসম্ভব কয়েকটি ঘটনাও আছে– রবীন্দ্রনাথ যাহাকে “রীতিমত নভেল” নাম দিয়া উপহাস করিয়াছেন, সেই শ্রেণীর বর্ণনা; তাহার আলোচনা করিবার এ স্থান নহে।

রূপনগরের সত্য রাজকুমারী

পূর্ব্বে জয়পুর-রাজ্য, পশ্চিমে যোধপুর, এবং দক্ষিণে বাদশাহী আজমীর সুবা, এই তিনটিতে ঘেরা একটি ক্ষুদ্র রাজপুত রাজ্য আছে, তাহার নাম কৃষ্ণগড়, এবং ইহার বর্তমান রাজধানীও “কিষণগড়” শহর। এই রাজ্যের উত্তর ভাগে রূপনগর নামে একটি নগর আছে, সুতরাং “রূপনগরের রাজকুমারী” বলিতে কিষণগড়ের রাজকন্যাই বুঝায়। এই দেশের রাজা রূপসিংহ রাঠোর দারা শুকোর পক্ষে সামুগড়ের যুদ্ধক্ষেত্রে (২৯ মে ১৬৫৮) প্রাণত্যাগ করিলে, তাঁহার পুত্র মানসিংহ রাজা হন, এবং চিরজীবন মুঘলদের বাধ্য থাকেন। ঐ যুদ্ধে বিজয়ী আওরংজীব রূপসিংহের জ্যেষ্ঠা কন্যা চারুমতীকে বিবাহ করিবার জন্য দাবি করিলেন, যাহাতে মৃত শত্রুর বংশ যথেষ্ট লজ্জিত ও অপমানিত হয়। কিন্তু মানিনী চারুমতী কুলপুরোহিতের হাত দিয়া মহারাণা রাজসিংহের নিকট নিজ বিবাহের প্রস্তাব পাঠাইলেন, এবং রাজসিংহও সদলবলে প্রকাণ্ড “বরাৎ” অর্থাৎ বরযাত্রীদের শোভাযাত্রা সঙ্গে লইয়া কিষণগড়ে গিয়া চারুমতীর পাণিগ্রহণ করিলেন।

আওরংজীব প্রতিশোধের ইচ্ছা আপাততঃ চাপিয়া রাখিয়া, মহারাণার দুইটি পরগণা কাড়িয়া লইয়া হরিসিংহ দেবলিয়াকে তাহা দান করিলেন। এই হুকুমের বিরুদ্ধে রাজসিংহ বাদশাহকে যে দরখাস্ত করেন, তাহাতে তিনি বলেন, “আমি যে বাদশাহের অনুমতি না লইয়া বিবাহের জন্য কিষণগড় গিয়াছিলাম, তাহাতে বাদশাহের প্রতি উদ্ধতা দেখানো হইয়াছে, এরূপ আপনি লিখিয়াছেন। কিন্তু রাজপুতের সঙ্গে রাজপুতের সম্বন্ধ বহু দিন হইতে চলিয়া আসিতেছে, ইহাতে যে কোন মানা হইবে, এরূপ আমি কল্পনা করি নাই। …আমি বাদশাহের অনুমতির অপেক্ষা করি নাই, এবং বাদশাহী রাজ্যে (অর্থাৎ বরাৎ যাতায়াতের পথে আজমীর সুবাতে) কোন প্রকার উপদ্রব করি নাই।” ইত্যাদি (মূল ফারসী পত্র, ‘বীরবিনোদ,’ ২য় খণ্ড, ৪৪০-৪৪১ পৃষ্ঠা)। রূপসিংহের মৃত্যুর প্রায় চারি বৎসর পরে তাঁহার দ্বিতীয় কন্যার সহিত আওরংজীবের পুত্র মুয়াজ্জম ওরফে শাহ আলমের বিবাহ হয় (২৬ জানুয়ারি ১৬৬২)।

‘রাজসিংহ’ উপন্যাসের বিষয় যে বড় ঘটনাটি, তাহার প্রকৃত ঐতিহাসিক বিবরণ এইরূপ—

মাড়োয়ারে আগুন জ্বলিল

যোধপুরের মহারাজা যশোবন্ত সিংহ আওরংজীবের সর্ব্বপ্রধান হিন্দু সেনাপতি ছিলেন এবং বড় প্রদেশের সুবাদারীও করেন। ১৬৭৮ খ্রীষ্টাব্দের ১০ই ডিসেম্বর আফঘানিস্থানের জম্‌রুদ গিরি-সঙ্কটের ফৌজদারের পদে নিযুক্ত থাকিবার সময় তাঁহার মৃত্যু হইল। অপর সর্ব্বোচ্চ হিন্দু মনসবদার, আম্বেরের রাজা জয়সিংহ, ইহার এগারো বৎসর আগে মারা গিয়াছিলেন, সুতরাং এখন হিন্দুস্থান একেবারে হিন্দুনেতা-শূন্য হইল। যশোবন্তের মৃত্যু-সংবাদ দিল্লীতে পাইবামাত্র আওরংজীব মাড়োয়ার রাজ্য খাস করিয়া মুঘল শাসনে আনিলেন, মুসলমান ফৌজদার, কিলাদার, কোতোয়াল ও আমিন পাঠাইয়া যোধপুর শহর দখল করিলেন। ইহার কয়েক দিন পরে (৯ জানুয়ারি ১৬৭৯) স্বয়ং বাদশাহ আজমীর রওনা হইলেন, যেন মাড়োয়ারের সীমানায় বসিয়া সেখানকার রাজপুতদের ভীত ও নিশ্চল করিয়া রাখিতে পারেন। মাড়োয়ারের রাঠোরেরা সদ্য রাজাকে হারাইয়াছে, তাহাদের রাজ-পরিবার, সৈন্যদল এবং স্বজাতীয় নেতারা তখনও আফঘানিস্থান হইতে ফেরে নাই, সেখানে মুঘল-শক্তি দ্বারা ঘেরা ছিল। সুতরাং রাঠোরেরা কোনই বাধা দিতে পারিল না; আওরংজীবের হুকুম অনুসারে এক প্রকাণ্ড সৈন্যদল খাঁ জহান বাহাদুরের নেতৃত্বে (৭ ফেব্রুয়ারি) মাড়োয়ারে ঢুকিয়া, সব মন্দির ধ্বংস করিয়া, রাজধানীর তোষাখানা খুলিয়া এবং দুর্গের মাটি খুঁড়িয়া যশোবন্তের সমস্ত সম্পত্তি লুঠ করিতে লাগিল। (ইহা আওরংজীবের সরকারী ঐতিহাসিক মুস্তাদ খাঁর কথা; মাসির, ফারসী মূল, ১৭২ পৃষ্ঠা)। যশোবন্তের মৃত্যুর পর তাঁহার পাঁচ জন রাণী তাঁহার চিতায় সহমরণ করেন। অপর দুই জন অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন, তাঁহারা দেশে ফিরিবার পথে লাহোর পৌঁছিয়া, প্রত্যেকে এক একটি পুত্রসন্তান প্রসব করেন (১০ ফেব্রুয়ারি ১৬৭৯), তাহাদের নাম অজিত সিংহ ও দলমন্থন। এই দ্বিতীয় শিশুটি কয়েক দিন পরে মারা গেল। কিন্তু আওরংজীব অজিতকে তাঁহার শত শত বর্ষব্যাপী পিতৃপুরুষদের অর্জিত রাজ্য দিলেন না, এবং যখন অজিত মাতা সহ দিল্লী পৌঁছিলেন, তখন বাদশাহ হুকুম দিলেন যে, শিশু রাঠোর-রাজকুমারকে নিজ হারেম মহলে আনিয়া রাখিতে হইবে এবং বড় হইবার পর তাঁহাকে মনসব ও রাজপদ দেওয়া যাইবে। অজিত যদি মুসলমান হন, তবে তিনি মাড়োয়ার রাজ্য পাইতে পারেন, এরূপও বলা হইল (মুখা-ই-দিলকষা, হস্তলিপি, পৃ. ১৬৪)।

রাঠোর-প্রধানগণ এই প্রস্তাব শুনিয়া মর্ম্মাহত হইলেন, কিন্তু তাঁহাদের নেতা দুর্গাদাস (‘এবং তাঁহার যোগ্য সহকারী সোনঙ্গ) অসাধারণ বুদ্ধি, ধৈর্য্য ও সাহসের সহিত শিশু রাষ্ট্রপতিকে শত্রুর রাজধানীর মধ্যে শত্রুর গ্রাস হইতে উদ্ধার করিয়া মাড়োয়ারে লইয়া গেলেন। ১৫ই জুলাই আওরংজীব দিল্লীর কোতোয়ালের অধীনে বাদশাহী গার্ড সৈন্যদল পাঠাইয়া অজিত ও রাণীদের বন্দী করিবার চেষ্টা করিলেন। রাঠোরদের রণকৌশল এইরূপ হইল—বাদশাহী সৈন্য রাণীদের শিবির ঘেরাও করিলে, রঘুনাথ ভাটি নামক যোধপুরী সামন্ত এক শত যোদ্ধা লইয়া ছুটিয়া বাহির হইয়া তাহাদের আক্রমণ করিলেন, আর যেই সম্মুখের মুঘল সৈন্য পিছু হটিল, সেই অবসরে দুর্গাদাস, রাণী দুই জনকে পুরুষ-বেশ পরাইয়া ঘোড়ায় চড়াইয়া অজিতকে লইয়া অবশিষ্ট রাঠোর সৈন্যসহ যোধপুরের পথে ছুটিলেন। রঘুনাথ ও তাঁহার সঙ্গিগণ দেড় ঘণ্টাকাল মুঘলদের রোখ্ করিয়া রাখিয়া সকলে নিহত হইলেন। কিন্তু ততক্ষণে দুর্গাদাসের দল পাঁচ ক্রোশ পথ আগাইয়াছে। আবার যখন মুঘলেরা পশ্চাদ্ধাবন করিতে করিতে কাছে আসিয়া পৌঁছিল, তখন রণছোড়দাস যোধা তাহাদের দেড় ঘণ্টা ঠেকাইয়া রাখিয়া প্রাণ দিলেন। তিনবার এইরূপ রাঠোর-আত্মবিসর্জ্জন ঘটিল। অবশেষে মুঘল-সৈন্য ক্লান্ত হইয়া এই বৃথা ও মারাত্মক পশ্চাদ্ধাবন ছাড়িয়া দিয়া দিল্লীতে ফিরিল, অজিত ও রাণীসহ দুর্গাদাস মাড়োয়ারে পৌঁছিলেন (২৩ জুলাই)। আওরংজীবের অপচেষ্টা পণ্ড হইল; আবার রাজা ও নেতাকে দেশে পাইয়া রাঠোরেরা মাথা খাড়া করিল, রাজপুতানার স্বাধীনতার সংগ্রাম আরম্ভ হইল, এই আগুন ত্রিশ বৎসর জ্বলিয়া দিল্লীর বাদশাহী ধ্বংস করিল, আওরংজীবের মৃত্যুর পর অজিত সিংহ পিতৃরাজ্যের উত্তরাধিকারী বলিয়া তৎপুত্র বাহাদুর শাহ কর্ত্তৃক স্বীকৃত হইলেন (১৭০৯)।

ইতিমধ্যে প্রথমে রাঠোর জাতিকে অসহায়, নিশ্চল এবং কিংকর্তব্যবিমূঢ় দেখিয়া আওরংজীব আজমীর হইতে দিল্লী ফিরিয়াছিলেন (২ এপ্রিল ১৬৭৯) এবং সেই দিনই অমুসলমানদের উপর জিজিয়া কর আবার চাপাইয়া দিলেন। উদার-চরিত্র বাদশাহ আকবর শত বৎসর পূর্ব্বে এই কর উঠাইয়া দিয়াছিলেন। মাড়োয়ার হইতে মন্দির ভাঙ্গিয়া দেবদেবীর মূর্ত্তি গরুর গাড়ী বোঝাই করিয়া দিল্লী আনা হইল, এবং বাদশাহের হুকুমে তাহা দিল্লী-দুর্গের প্রাঙ্গণে এবং শহরের জমা মসজিদের সিঁড়ির নীচে ফেলিয়া রাখা হইল, “যে সকলে তাহা পদদলিত করিতে থাকিবে” (মাসির, ফারসী মূল, ১৭৫ পৃষ্ঠা)।

কিন্তু অজিত সিংহের স্বদেশে প্রত্যাবর্ত্তনের ফলে রাজনৈতিক চিত্রপট একেবারে উল্টাইয়া গেল। রাষ্ট্রনেতা পাইয়া মাড়োয়ার জাগিয়াছে জানিয়া, বাদশাহ তৎক্ষণাৎ (১৭ আগষ্ট) এক প্রবল সৈন্যদল সেই দেশে পাঠাইলেন এবং তাহার দুই সপ্তাহ পরে স্বয়ং দিল্লী ছাড়িয়া আজমীরে গেলেন। চারি দিক্ হইতে ভিন্ন ভিন্ন নিজ সৈন্যদল ডাকিয়া আনিয়া, আজমীরকে নিজের হেডকোয়ার্টার্স করিয়া, আওরংজীব যুদ্ধ লুঠ হত্যা ও অগ্নিকাণ্ড মাড়োয়ারের উপর ঢালিয়া দিলেন। পুষ্করহ্রদের নিকট এক মহাযুদ্ধে রাজপুত দেশরক্ষিগণ তিন দিন যুঝিয়া নিঃশেষ হইয়া গেল। “যেমন মেঘ পৃথিবীর উপর জলধারা ঢালিয়া দেয়, তেমনই আওরংজীব এই দেশের উপর বর্ব্বর সৈন্য বর্ষণ করিলেন…মাড়োয়ারের সব বড় শহর লুট হইল, মন্দির ধ্বংস করিয়া তাহার স্থানে মসজিদ গড়া হইল।” মাড়োয়ার দেশকে ঠিক মুঘল সাম্রাজ্যের এক সুবার মত ঘোষণা করিয়া, কয়েকটি ফৌজদারীতে (অর্থাৎ সব্-ডিভিশনে) বিভক্ত করিয়া, প্রত্যেকটির উপর এক-এক জন মুঘল শাসনকর্তা রাখা হইল।

আগুন মেবারে ছড়াইয়া পড়িল

যখন এইরূপে মাড়োয়ার রসাতলে গেল, তখন আওরংজীর মেবারের বিরুদ্ধে লাগিলেন। মহারাণা রাজসিংহের রাজ্য হইতে জিজিয়া করের দাবি করিয়া পাঠানো হইল। আর অজিত সিংহের মাতা, মহারাণার ভাইঝি, অজিতকে রক্ষা করিবার জন্য রাজসিংহের শরণ লইলেন। রাণা আত্মরক্ষার জন্য যুদ্ধের উদ্যোগ আরম্ভ করিলেন।

আজমীর হইতে পুর ও মণ্ডল পরগণা হইয়া সোজা দক্ষিণে চিতোর দুর্গ পর্য্যন্ত প্রায় সমতলভূমির উপর দিয়া পথ। আর, চিতোর হইতে পশ্চিমে উদয়পুরে যাইতে হইলে মধ্যে দেবারী গিরিসঙ্কট পড়ে। ফলতঃ মেবারের কেন্দ্রস্থলটা প্রায় গোলাকার, কতকগুলি গিরিশ্রেণীর দ্বারা চারি দিকে ঘেরা। এই কেন্দ্রের মধ্যস্থলে উদয়পুর, গিরিপ্রাচীর ভেদ করিয়া পূর্ব্বদ্ধার দেবারী, উত্তরদ্বার রাজসমুদ্র হ্রদ, এবং পশ্চিমদ্বার দেবসুরী-ঝিলওয়ারা গিরিসঙ্কট, যাহার নিকটে রাণাদের শেষ আশ্রয় গোগুণ্ডা এবং কমলমীর (বিশুদ্ধ নাম “কুম্ভালগড়”) অবস্থিত। এই পশ্চিম দিকের সীমানায় আরাবলী পর্ব্বত উত্তর-দক্ষিণে বহুদূর লম্বা হইয়া বিস্তৃত, যাহার পূর্ব্বদিকে মেবার, পশ্চিম দিকে মাড়োয়ার রাজ্য।

আওরংজীবের অগণ্য সুসজ্জিত অশ্বারোহী সৈন্য এবং ফিরিঙ্গী গোলন্দাজের চালিত অতি উৎকৃষ্ট নবীন কামানগুলির সামনে সমতল ক্ষেত্রে দাঁড়াইয়া যুদ্ধ করিবার মত শক্তি রাজপুতদের ছিল না। সেজন্য রাজসিংহ লোহার বড় বড় দরজা ও কাঠের খুটা দ্বারা দেবারী গিরিরন্ধ্র বন্ধ করিলেন, সমস্ত প্রজাদের সমতল দেশ হইতে উঠাইয়া লইয়া পাহাড়ে আশ্রয় দিলেন, এমন কি, রাজধানী উদয়পুর পর্য্যন্ত জনমানবশূন্য করিয়া রাখিয়া গেলেন।

আওরংজীব স্বয়ং প্রথম আক্রমণ করিলেন; নবেম্বর ১৬৭৯-এর শেষদিন আজমীর ত্যাগ করিয়া উদয়পুরের দিকে অভিযান চালাইলেন; ৪ জানুয়ারি ১৬৮০ মুঘল সৈন্য জনশূন্য দেবারী-গিরিসঙ্কট দখল করিল, এবং তাহার কয়েক দিন পরে নির্ব্বিবাদে উদয়পুরে প্রবেশ করিল। মহারাণা তখন সসৈন্যে উদয়পুরের উত্তর-পশ্চিমে আরাবলী পর্ব্বতক্রোড়ে গোগুণ্ডা-কমলমীর প্রদেশে লুক্কায়িত। উদয়পুর হইতে বাদশাহ, সৈয়দ হসন আলি খাকে একদল সৈন্যসহ এই পর্ব্বতমধ্যে পাঠাইলেন, এবং তিনি অতি দৃঢ়তা ও দক্ষতার সহিত এই আহাৰ্য্যশূন্য অজ্ঞাত শত্রু অঞ্চলে নিজকে বাঁচাইয়া এক যুদ্ধে মহারাণাকে হারাইয়া তাঁহার শিবির ও পথে রসদ লুঠ করিলেন। এই বিজয়কালে উদয়পুরে ১৭৩টি ও চিতোরে ৬৩টি মন্দির ভাঙ্গিয়া ফেলা হইল। তাহার পর মেবার-পতন সুসম্পন্ন ভাবিয়া বাদশাহ আজমীরে ফিরিয়া গেলেন, পুত্র আকবরকে চিতোরে ঘাটি করিয়া সৈন্য সহিত মেবার-দমনের জন্য রাখিয়া গেলেন ; উদয়পুরে মুঘল থানা রহিল না (মার্চ মাসের শেষ)।

ইহাই রাজসিংহের রণকৌশল দেখাইবার সুযোগ হইল। কেন্দ্রস্থানীয় আরাবলী পৰ্ব্বতশৃঙ্গ হইতে তিনি ইচ্ছামত পূৰ্ব্ব দিকে নামিয়া অতি সহজে মেবারের মুঘল থানা ও রসদ লুঠিতেন, অথবা পশ্চিমে নামিয়া মাড়োয়ারে বিক্ষিপ্ত বাদশাহী ফৌজ আক্রমণ করিতেন। অথচ বাদশাহের পক্ষে মেবার হইতে মাড়োয়ারে সহায়ক সৈন্য পাঠাইতে হইলে এক ত্রিকোণের দুই দিক্ ঘুরিয়া যাইতে হইত, তাহাতে অনেক সময় লাগিত। তাহার উপর সমস্ত দেশবাসিগণ মুঘলদের শত্রু, গোপনে মহারাণার লোকদের সাহায্য করিত, শত্রুর সংবাদ দিত, রসদ জোগাইত। আকবর ২২ বৎসর বয়স্ক যুবক, বিলাসী রাজপুত্র, যুদ্ধে অকর্ম্মণ্য, আর তাঁহার অধীনে মাত্র বারো হাজার সেনা, তাহা দিয়া অতবড় প্রকাণ্ড দেশ রক্ষা করা অসম্ভব। বিক্ষিপ্ত মুঘল থানা (অর্থাৎ ঘাটি)গুলির ক্ষুদ্র রক্ষীদল রাজপুত আক্রমণে উদ্‌ব্যস্ত, কখন কখন পলায়িত, এবং সর্ব্বদা ভীত নিশ্চেষ্ট হইয়া পড়িত। বাদশাহ আজমীরে ফিরিয়া যাইবার পর হইতেই এপ্রিল মাসে রাজপুতদের আক্রমণ দ্বিগুণ বেগে আরম্ভ হইল এবং খুব সফলতা লাভ করিল। বাদশাহী সৈন্যমধ্যে এমন ভয় সঞ্চার করিল যে, কোন সেনানায়ক থানার ভার লইতে সম্মত হয় না, সকলেই সদরে থাকিয়া প্রাণ বাচাইতে চায়; সৈন্যগণ কোন গিরিসঙ্কটের মুখে পৌঁছিয়া ভিতরে ঢুকিতে সাহস করে না, সমতল স্থানে বসিয়া থাকে, কেন্দ্র হইতে যে সৈন্যদল বিযুক্ত (ডিটাচমেণ্ট) করিয়া পাঠানো হইল, তাহারা কিছু দূর কুচ করিয়া গিয়া আর অগ্রসর হইতে অস্বীকার করিতে লাগিল। (শাহজাদা আকবর, পিতাকে যে পত্র লেখেন, তাহা হইতে এ সব কথা লওয়া)।

রাজপুতদের হাতে মুঘল সৈন্যের লাঞ্ছনা

এর পর স্বয়ং আকবরের পালা আসিল। মে মাসের মাঝামাঝি এক রাত্রিতে মহারাণার সৈন্যদল ফাঁকি দিয়া চিতোর দুর্গের নীচে আকবরের শিবিরে ঢুকিয়া কতকগুলি মুঘলকে হতাহত করিল, দ্রব্যসামগ্রী লুঠ করিল। মহারাণা নিজে পৰ্ব্বত হইতে নামিয়া বেদনোর জেলা আক্রমণ করিয়া, আকবরের আজমীরে পলাইবার পথ বন্ধ করিয়া দিলেন। আর ঐ মাসের শেষে মহারাণা আকবরকে অতর্কিত আক্রমণ করিয়া প্রভূত লোকহানি করিলেন। তাহার কিছু দিন পরে রাজপুতেরা দশ হাজার শস্যবাহী বলদ সহ এক বঞ্জারার দলকে শাহজাদার শিবিরে রসদ আনিবার পথে বন্দী করিয়া সব লুঠিয়া লইল। রাজসিংহের জ্যেষ্ঠ পুত্র ভীমসিংহ আর এক দল সৈন্য লইয়া দেশময় ছুটিয়া বেড়াইতে লাগিলেন, যেখানে শত্রু দুর্ব্বল দেখেন, সেখানেই পড়িয়া তাহাদের কাটিয়া ফেলেন। রাণার দেওয়ান দয়ালদাস, বাণিয়া হইলেও, সৈন্য লইয়া অপর অপর অঞ্চলে মুঘল-ধ্বংসকাজে লাগিয়া রহিলেন। আকবর লজ্জায় অবনত ও হতভম্ব হইয়া পিতাকে লিখিলেন– “ঘৃণিত কাফিরদের আশ্চর্য্যজনক পরিশ্রম ও কার্য্যতৎপরতার ফলে যে ঘটনা ঘটিয়াছে, তজ্জন্য আমি যে লজ্জা ও মনঃকষ্ট পাইতেছি, তাহার অণুমাত্র আমার বাক্য ও জ্ঞানের অল্পতাবশতঃ প্রকাশ করা যায়। আমি কার্য্যক্ষেত্রে মাত্র ‘এক দুই তিন’ পাঠ করিতেছি এবং বিষয়বুদ্ধির বিদ্যালয়ে আমার শুধু অক্ষর পরিচয় হইতেছে। আমি সৰ্ব্ববিধ অজ্ঞ (হেচ্ মদান্); এই সমস্ত দোষ আমার স্বাভাবিক দুর্ব্বলতা ও অনভিজ্ঞতার ফলে ঘটিয়াছে। …ইন্‌শাল্লাতালা, ভবিষ্যতে আপনার নির্দ্দেশ অনুযায়ী সাবধানতা ও সতর্কতা হইতে লেশমাত্র অন্যথা করিব না। ঈশ্বরেচ্ছায় ও আপনার অনুগ্রহে হতভাগ্য শত্রু নিজ কর্ম্মের উপযুক্ত শাস্তি পাইবে।” [আদাব-ই-আলম্‌গীরী, আমার হস্তলিপি, ২৭০খ পৃষ্ঠা] আওরংজীব রাগে আকবরকে ভর্ৎসনা করিয়া চিতোর জেলা হইতে মাড়োয়ারে বদলি করিয়া পাঠাইলেন, চিতোরের ভার দ্বিতীয় পুত্র আজম্ শাহকে (বঙ্কিমের “আজীম” নামটা ভুল) দিলেন। আজম্ ইতিপূর্ব্বে বাঙ্গলার সুবাদার ছিলেন, পিতার আহ্বানে সেখান হইতে দ্রুতবেগে রাজপুতানায় আসিয়া পৌঁছিয়াছিলেন; জ্যেষ্ঠ পুত্র মুয়াজ্জম্ (অর্থাৎ শাহ আলম), আমাদের পরিচিত নিকোলে৷ মানুচী-সহ দাক্ষিণাত্য হইতে পিতার নিকট পৌঁছেন, তিনি উত্তর দিক্ হইতে মেবার আক্রমণে নিযুক্ত হইলেন। কিন্তু এই দুই ভাইয়ের চেষ্টাই বিফল হইল।

কনিষ্ঠ শাহজাদা আকবরের মাড়োয়ার অভিযানও বাদশাহের পক্ষে ততোধিক হানিজনক হইল। তিনি কোনক্রমে আরাবলী পর্ব্বতশ্রেণীর পশ্চিম দিকে গোদোবার জেলায় পৌঁছিয়া চুপ করিয়া বসিয়া রহিলেন, দেবসুরী গিরিরন্ধ্র দিয়া মেবার আক্রমণের কোন চেষ্টাই করিলেন না। ইহার গুপ্ত কারণ তিন মাস পরে প্রকাশ হয়। দুর্গাদাস রাঠোর ও মহারাণা রাজসিংহ গোপনে দূত পাঠাইয়া শাহজাদাকে বলিলেন,–“আপনার পিতা মুঘল সাম্রাজ্য ধ্বংস করিতে দৃঢ়সংঙ্কল্প। রাজপুতদের সাহায্যে আপনার পূর্ব্বপিতৃগণ এই সাম্রাজ্য গড়িয়াছিলেন। আপনি যদি নিজ বংশপরম্পরার সম্পত্তি অক্ষুন্ন রাখিতে চান, তবে রাঠোর এবং শিশোদিয়া, এই দুই সৰ্ব্বশ্রেষ্ঠ হিন্দু জাতির সমস্ত বীরগণ আপনাকে সমর্থন করিবে, তাহাদের নেতা হইয়া যুদ্ধ করিয়া আওরংজীবের রাজমুকুট কাড়িয়া লইয়া অতি সহজেই আপনি নিজে বাদশাহ হইতে পারিবেন।” এই ষড়্‌যন্ত্র চলিতে লাগিল, ইতিমধ্যে ২২ অক্টোবর ১৬৮০ খ্রীষ্টাব্দে রাজসিংহ রোগে মারা গেলেন, এবং বারো দিবস অশৌচের পর তাঁহার পুত্র জয়সিংহ মহারাণার সিংহাসনে বসিলেন। তখন ষড়্‌যন্ত্রটি পাকা করা হইল। অবশেষে ১ জানুয়ারি ১৬৮১ সালে আকবর নিজেকে বাদশাহ ঘোষণা করিয়া শিবিরে সিংহাসন অধিরোহণ করিলেন, এবং আওরংজীবকে আক্রমণ করিবার জন্য মাড়োয়ার হইতে আজমীর রওনা হইলেন। তাঁহার এই চেষ্টা কিরূপে বিফল হইল এবং হতভাগ্য শাহজাদাকে মহারাষ্ট্র দেশে ও পরে পারস্যে জীবনের সমস্ত অবশিষ্ট অংশ কাটাইতে হইল, তাহা আমার “হিস্ট্রি অব আওরংজীবে” বর্ণনা করিয়াছি; সে সব ঘটনা ‘রাজসিংহ’ উপন্যাসের সময়-সীমার বাহিরে।

এইরূপে আওরংজীবের রাজপুতানা আক্রমণ ব্যর্থ হইল, এবং এই রাজনৈতিক দুষ্কৰ্ম্ম ও ধর্ম্মান্ধতার ফলে পরবর্ত্তী শতাব্দীতে “সোনার দিল্লী” সাম্রাজ্যও ধ্বংস হইল।

আওরং জীবের প্রকৃত চরিত্র

এখন দেখা যাউক, বঙ্কিমচন্দ্র তাঁহার এই উপন্যাসখানিতে নায়কের প্রতিদ্বন্দ্বী আওরংজীবের চরিত্র অঙ্কনে ঐতিহাসিক সত্যের ব্যতিক্রম করিয়াছেন কি? আওরংজীব যে গোঁড়া সুন্নী এবং ধর্ম্মের নামে হিন্দু ও শিয়াদের বিরুদ্ধে খড়্গহস্ত হইয়া লাগিয়াছিলেন, তাহার প্রমাণ তাঁহারই সরকারী ফারসী ইতিহাস ও সংবাদ-চিঠি হইতে তারিখ ও পৃষ্ঠাসহ উদ্ধৃত করিয়া আমার ইংরাজী ইতিহাস গ্রন্থে দিয়াছি। সেই যুগের মুসলমান-জগৎ তাঁহার কাৰ্য্যকলাপ কি ভাবে দেখিত, তাহার কয়েকটি দৃষ্টান্ত দিতেছি।

(১) পারস্যের রাজা দ্বিতীয় শাহ আব্বাস তাঁহাকে লিখিয়া পাঠান (১৬৬৬ খ্রীষ্টাব্দে )–

“আঁ খিলাফৎ-মাব্ পেদর্-গীরীরা আলম্‌গীরী নাম্ নেহাদা–ও আজ্ কুশ তনে বিরাদরান্… খাতির্‌জমা কর্দা… ইত্যাদি”—অর্থাৎ

তুমি নিজকে আলমগীর (জগৎ-জয়ী) নাম দিয়াছ, কিন্তু শুধু নিজ পিতাকে পরাজয় করিয়াছ (পেদর্-গীর্), এবং পৈতৃক জমি ও ধনের ন্যায্য অংশীদার নিজ ভ্রাতাদের খুন করিয়া মনের শান্তি লাভ করিয়াছ! রাজার কর্ত্তব্য প্রজারঞ্জন, ন্যায়বিচার এবং দানশীলতা ত্যাগ করিয়া তুমি সেই সব [শঠ] লোকের সঙ্গ লইয়া লিপ্ত থাক, যাহারা মন্ত্রপড়া ও শয়তানী জাদুগরীকে ঈশ্বর-জ্ঞান এবং সত্যের ব্যাখ্যা বলিয়া নাম দেয়। অতএব তুমি প্রত্যেক কাজেই মনুষ্যত্ব হারাইয়া কেবল চালাকি ও ফাঁকির জোরে বাজি জিতিয়াছ। তোমার রাজ্যে দুরস্ত লোকদের (বিশেষতঃ শিবাজীর) দমন করা তোমার সাধ্যের অতীত। অর্থাভাবে ও সেনাদের পরাজয়ে তুমি অসহায় হইয়া পড়িয়াছ। খোদা ও ইমামগণের আশীর্ব্বাদে, পীড়িতকে উদ্ধার করাই আমার প্রকৃতি; আমার পিতৃপুরুষগণ জগতের রাজাদের শরণের স্থল ছিলেন, যেমন হুমায়ুন বাদশাহের। তুমি হুমায়ুনের উত্তরাধিকারী, তুমি বিপদে পড়িয়াছ, এখন আমার অভিপ্রায় যে, আমি প্রকাণ্ড সৈন্যদল লইয়া হিন্দুস্থানে যাইব এবং আমার তরবারির তেজে তোমার রাজ্যের গোলযোগ থামাইয়া দিব”!!! (মূল ফারসী পত্র ফয়াজ-উল-কাওয়াণীন্, হস্তলিপি, ৪৯৬-৪৯৯ পৃষ্ঠা)।

(২) খাইবর পাসের উত্তর দিকে খটক্-বংশের সর্দ্দার খুষ্‌হাল্ খাঁ পষ্‌তু ভাষায় পদ্যে আওরংজীবকে ধিক্কার দিয়া গাহিয়াছিলেন–

“সে নিজ পিতার ঘরে এমন দুঃখ আনিয়া দিয়াছে যে, আরব্য ও পারস্য তাহার কার্য্য দেখিয়া স্তম্ভিত। আদমের বংশধরদের মধ্যে কে এমন দুষ্কর্ম্মের কথা শুনিয়াছে?” (Afghan Poetry in the 17th century, tr, by Biddulph, p. 54.)

পিতা-পুত্রে

(৩) আর সবচেয়ে বেশী মারাত্মক আওরংজীবের প্রিয় পুত্র আকবরের উক্তি। বিদ্রোহের পর এই শাহজাদা পিতাকে সিংহাসন ত্যাগ করিয়া মক্কায় গিয়া স্বকৃত দুষ্কর্ম্মের অনুতাপ করিয়া শেষ জীবন কাটাইতে আহ্বান করিয়া লিখিতেছেন–

“সত্য সত্যই আমার এই (পিতৃদ্রোহের) পথে পথপ্রদর্শক ও গুরু (মুর্শিদ বা হাদী) আপনিই। এ পথকে কিরূপে দুর্ভাগ্যপ্রদ বলিয়াছেন (অর্থাৎ ইহার পূর্ব্বে আমাকে যে উপদেশপূর্ণ পত্র লিখিয়াছেন, তাহাতে)?… “আজ তিন বৎসর ধরিয়া হিন্দুস্থানের বাদশাহ স্বয়ং, তাঁহার সম্ভ্রান্ত পুত্রগণ, নামজাদা উজীরগণ, এবং উচ্চ ওমরাহগণ রাজপুতদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিয়া হতভম্ব হইয়াছে, এখনও কোন ফল লাভ করে নাই। আর, কেনই বা এমন না হইবে? যেহেতু আপনার রাজত্বকালে মন্ত্রীদের হাতে ক্ষমতা নাই, ওমরাহদের উপর বিশ্বাস নাই, সৈন্যগণ দরিদ্র, লেখকশ্রেণী বেকার, বণিকেরা পুঁজিহীন, এবং রায়ৎগণ পদদলিত। দাক্ষিণাত্যের মত প্রশস্ত এবং ভূতলে স্বর্গস্বরূপ দেশ পাহাড় ও মরুভূমির মত বিনষ্ট ও উজাড় হইয়া গিয়াছে। …হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর দুই বিপদ্ পড়িয়াছে, শহরে শহরে জিজিয়া আদায় আর মাঠে মাঠে শত্রুদের প্রাধান্য।… আপনার সমস্ত সাম্রাজ্যের শাসনভার এবং রাজনৈতিক পরামর্শ-দানের কাজ কাহার হাতে দিয়াছেন? শ্রমিক লোক, নীচ লোক, পাজি, জোলা, তাঁতী, সাবান-ফেরীওয়ালা, দর্জি—এই শ্রেণীর সব কর্মচারী হইয়াছে। তাহারা প্রতারণার চোগা বগলে করিয়া, শয়তানের ফাঁস অর্থাৎ জপের মালা হাতে লইয়া, কতকগুলি কোরাণী প্রচলিত বাণী ও নীতি উপদেশ (রওরায়েৎ ব মসায়েল্) জিহ্বাতে আওড়াইতে থাকে; আর আপনি এই সব লোককে জেব্রিল ও আস্‌রাফিলের মত সহচর বন্ধু ও উপদেষ্টা বলিয়া মনে করিয়া নিজকে সম্পূর্ণরূপে ইহাদের হাতে সঁপিয়া দিয়াছেন। এই সব জুয়াচোরেরা এই সুযোগে নমুনা দেখায়, গম আর মাল দিবার সময় দেয় যব, পৰ্ব্বতকে বলে ঘাস আর ঘাসকে দেখায় পাহাড় বলিয়া। (পদ্য)

বা-দৌর্-ই-শাহ আলমগীর ঘাজী।

শুদা সাবুন্-ফরোশান্ সদর্ ব কাজী॥

বুদ্ জোলাহা ব বাফিন্দারা নাজ্।

কে দর্‌ই বজম্ মালিক্ গর্‌দিদ্ হম্‌রাজ॥

আরাজিল্‌রা শুদা আঁ দস্ত্‌গাহী।

কে ফাজিল্ বর্ দরশ জুয়েদ্ পনাহী॥ ইত্যাদি অর্থাৎ

 

রাজা মোদের শাহ আলমগীর ঘাজী।

তাঁর রাজ্যে হয়েছে সাবান-ওয়ালারা সদর আর কাজী॥

জোলা আর তাঁতির হ’ল কি গরবের চোট।

যে এই ভোজে প্রভু হলেন মোদের একজোট॥

ছোট লোক পেয়েছে এমন শক্তি ও বিষয়।

যে তাদের দ্বারে পণ্ডিতও খোঁজে আশ্রয়॥

এমন ভীষণ রাজ্য হ’তে মোদের বাঁচান খোদা।

যেখানে আরবী ঘোড়াকে লাথি মারে গাধা॥ ***

“যখন আমি এই সব দুরবস্থা দেখিলাম এবং আপনার চরিত্র সংশোধন হইবার কোন সম্ভাবনা নাই বুঝিলাম, তখন রাজকীয় আত্মসম্মান আমাকে বাধ্য করিল যে, আমি নিজেই হিন্দুস্থানের মুলুককে অত্যাচার ও অশান্তির খড়কাঁটা হইতে সাফ করিয়া দিই। [অতএব আমার এই বিদ্রোহী অভিযান !!!] … আহা, কি সুখের বিষয় হইবে, যদি ভগবান্ আপনাকে এমন সুবুদ্ধি দেন যে, আপনি রাজ্যভার আপনার এই অধমতম পুত্রের হস্তে সমর্পণ করিয়া এবং স্বয়ং পুণ্য তীর্থ দুইটির (অর্থাৎ মক্কা ও মদিনার) যাত্রী হইয়া, এই ব্যবহার দ্বারা জগৎকে নিজ গুণগান করিতে ইচ্ছুক করেন। “আপনি এপর্য্যন্ত সমস্ত জীবন কাটাইয়াছেন রাজ্য ও দুনিয়ার বস্তু লাভ করিতে, যাহা স্বপ্ন অপেক্ষাও অধিক অবিশ্বাসনীয় এবং ছায়া অপেক্ষাও অধিক অস্থায়ী। এখন সময় আসিয়াছে আপনার পরকালের পাথেয় সংগ্রহ করিবার জন্য; আপনি যৌবনকালে এই নশ্বর ইহজগতের প্রলোভনে নিজ পিতা ও ভ্রাতাগণের সঙ্গে যে ব্যবহার করিয়াছিলেন, তাহার জন্য প্রায়শ্চিত্ত করুন। (পদ্য)

বয়স হল আশীর উপর, ঘুমাচ্ছ এখনও!

এই ক’টা দিনের বেশী আর পাবে না কো॥

“আপনার পত্রে আমাকে [পিতৃভক্তি সম্বন্ধে] অনেক উপদেশ দিয়াছেন, কিন্তু মাফ করিবেন, যদি বলি– (পদ্য)

বাপকে তুমি করেছিলে কত ভাল কাজ

যে ছেলের কাছে চাচ্ছ সেবা আজ?

ওহে সাধু, উপদেশ দিচ্ছ অত মানবকে

নিজকে শিখাও যাহা তুমি বলছ অপরকে।”

[মূল ফারসী হস্তলিপি, লণ্ডনস্থ রয়াল এশিয়াটিক সোসাইটির পুস্তকাগারের MS. No. 71, কলিকাতার এশিয়াটিক সোসাইটির হস্তলিপি F. 56, এবং লিথো “জহুর-উল্-ইন্‌শা”।]

কি দুঃখের বিষয় যে, পুত্রবরের এই সব রসাল পত্র বঙ্কিমের পরে আবিষ্কার হইয়াছে, নচেৎ তিনি “রাজসিংহ”কে কত নবীন রঙ্গে উদ্ভাসিত করিয়া যাইতেন। দীনবন্ধু এগুলি পাইলে আরও একখানি অমর নাটক লিখিতেন। ধীরভাবে সেই যুগের সত্য ঐতিহাসিক উপাদান আলোচনা করিলে স্বীকার করিতে হইবে যে, আওরংজীবের কতকগুলি গুণ ছিল বটে, কিন্তু দোষগুলি ততোধিক এবং দেশের পক্ষে, মানবের পক্ষে, স্বজাতির পক্ষে মারাত্মক। ঠিক এইরূপ একজন ধর্মান্ধ ওম্মায়াদ খলিফার চরিত্র ইউরোপের সর্ব্বশ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক এক কথায় আঁকিয়াছেন, আওরংজীবের পক্ষে সে কথা অক্ষরে অক্ষরে খাটে:–“The throne of an active and able prince was degraded by the useless and pernicious virtues of a bigot,” (Gibbon’s Decline and Fall, ch. 52.) ‘রাজসিংহে’ বঙ্কিমচন্দ্র এই চিরসত্যই দৃষ্টান্ত দ্বারা প্রমাণ করিয়াছেন, তিনি এই গ্রন্থে প্রকৃত ইতিহাসকে লঙ্ঘন করেন নাই, অজ্ঞ ধর্ম্মান্ধতা দ্বারা লেশমাত্রও প্রণোদিত হন নাই।

শ্রীযদুনাথ সরকার