রাজসিংহ

ভূমিকা

সম্পাদকীয়

পর্ষৎ সংস্করণে যুক্ত ভূমিকা (সম্পাদকীয়), এটি মূল গ্রন্থের অংশ নয়।

১২৮১ বঙ্গাব্দের মাঘ মাসের ‘বঙ্গদর্শনে’ “বাঙ্গালার ইতিহাস” প্রসঙ্গে বঙ্কিমচন্দ্র লিখিয়াছিলেন–

ভারতবর্ষীয়দিগের যে ইতিহাস নাই, তাহার বিশেষ কারণ আছে। কতকটা ভারতবর্ষীয় জড় প্রকৃতির বলে প্রপীড়িত হইয়া, কতকটা আদৌ দস্যুজাতীয়দিগের ভয়ে ভীত হইয়া ভারতবর্ষীয়েরা ঘোরতর দেবভক্ত। বিপদে পড়িলেই দেবতার প্রতি ভয় বা ভক্তি জন্মে। যে কারণেই হউক, জগতের যাবতীয় কৰ্ম্ম দৈবানুকম্পায় সাধিত হয়, ইহা তাঁহাদিগের বিশ্বাস। … এজন্য তাঁহারা দেবতাদিগেরই ইতিহাস কীর্ত্তনে প্রবৃত্ত; পুরাণেতিহাসে কেবল দেবকীর্ত্তিই বিবৃত করিয়াছেন। যেখানে মনুষ্যকীৰ্ত্তি বর্ণিত হইয়াছে, সেখানে সে মনুষ্যগণ হয় দেবতার আংশিক অবতার, নয় দেবতানুগৃহীত; সেখানে দৈবের সংকীর্ত্তনই উদ্দেশ্য। মনুষ্য কেহ নহে, মনুষ্য কোন কার্য্যেরই কর্ত্তা নহে, অতএব মনুষ্যের প্রকৃত কীৰ্ত্তিবর্ণনে প্রয়োজন নাই।…

– ‘বিবিধ প্রবন্ধ’, পরিষৎ সংস্করণ, পৃ. ৩০৯

বঙ্কিমচন্দ্র ভারতীয় চরিত্রের এই কলঙ্ক ক্ষালনের জন্য উপন্যাসে এবং প্রবন্ধে মানুষের কীৰ্ত্তিকেই বড় করিয়া দেখাইতে চেষ্টা করিয়াছিলেন; ‘বঙ্গদর্শনে’র এই প্রবন্ধের পর হইতেই তাঁহাকে এই কার্য্যে সমধিক যত্নবান্ দেখি। ইহার পূর্ব্বে ‘দুর্গেশনন্দিনী’, ‘কপালকুণ্ডলা’, ‘মৃণালিনী’ এবং ‘চন্দ্রশেখরে’ এই উদ্দেশ্যে অল্পবিস্তর ঐতিহাসিক উপাদান ব্যবহার করিয়া থাকিলেও ঐতিহাসিক মানুষকে সৰ্ব্বপ্রথম জয়যুক্ত করিবার চেষ্টা ‘রাজসিংহে’ই প্ৰকাশ পায়। ১২৮৪ বঙ্গাব্দের চৈত্র সংখ্যা হইতে ১২৮৫ বঙ্গাব্দের ভাদ্র পর্য্যন্ত ক্রমান্বয়ে ছয় সংখ্যা ধরিয়া ইহা ‘বঙ্গদর্শনে’ প্রকাশিত হয়; কিন্তু গ্রন্থ সম্পূর্ণ হয় নাই। সম্পূর্ণ উপন্যাস ১২৮৮ বঙ্গাব্দে প্রথম প্রকাশিত হয় (কলিকাতার জনসন প্রেস, প্রকাশক– রাধানাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, পৃ. ৮৩, ঊনবিংশ পরিচ্ছেদ)।

বঙ্কিমচন্দ্র উপরোক্ত মনোবৃত্তি হইতে শুধু যে মানুষ রাজসিংহেরই জয় ঘোষণা করিয়াছেন, তাহা নয়, তিনি সমগ্র হিন্দুসমাজের আরাধ্য শ্রীকৃষ্ণেরও মানবীয় মহিমা পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে আলোচনা করিয়াছেন তাঁহার ‘কৃষ্ণচরিত্রে’, এই কারণে তাঁহাকে শ্রীকৃষ্ণের গোঁড়া ভক্তদের বিরাগভাজন হইতে হইয়াছিল। তৎসত্ত্বেও তিনি তাঁহার মতবাদ বর্জ্জন বা পরিবর্ত্তন করেন নাই।

‘কৃষ্ণচরিত্র’ বঙ্কিমচন্দ্রের এই মতবাদের চরম পরিণতি; তিনি শ্রীকৃষ্ণকেও ইতিহাসের ক্ষেত্রে টানিয়া আনিয়াছেন। প্রারম্ভে সত্যকারের ইতিহাসের আশ্রয় তাহাকে বাধ্য হইয়াই গ্রহণ করিতে হইয়াছে; রাজসিংহকে খুঁজিয়া বাহির করিতে বিশেষ বেগ পাইতে হয় নাই। তিনি প্রথমে এই রাজপুত-মোগল সঙ্ঘর্ষের একটি সামান্য ঘটনা মাত্র গ্রহণ করিয়াছিলেন, পরে চতুর্থ সংস্করণে (১৮৯৩ খ্রীষ্টাব্দে, পৃ. ৪৩৪) ইতিহাসকে সম্পূর্ণভাবে গ্রহণ করিতে চেষ্টা করিয়াছেন। চতুর্থ সংস্করণের “বিজ্ঞাপনে” তিনি স্বয়ং লিখিয়াছেন–

…পূর্ব্ব পূর্ব্ব সংস্করণে যে ক্ষুদ্র ঘটনাটি অবলম্বন করা গিয়াছিল, তদ্বারা অভীষ্ট সিদ্ধ হয় না। রাজসিংহের সঙ্গে মোগল বাদশাহের যে মহাযুদ্ধ হইয়াছিল, তাহা সমস্তই উপন্যাসভুক্ত করিতে হয়। তাহা করিতে প্রয়াস পাইয়াছি।

পরিশেষে বক্তব্য যে, আমি পূর্ব্বে কখন ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখি নাই। দুর্গেশনন্দিনী বা চন্দ্রশেখর বা সীতারামকে ঐতিহাসিক উপন্যাস বলা যাইতে পারে না। এই প্রথম ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখিলাম।…

এবং ইহাই শেষ। মতবাদের কথা বলিলাম। ইতিহাসের দিক্ দিয়া তিনি কতখানি সাফল্য লাভ করিয়াছেন, তাহার বিচার সার শ্রীযুক্ত যদুনাথ সরকার তাঁহার ভূমিকায় করিয়াছেন।

বঙ্কিমচন্দ্রের জীবিতকালে ‘রাজসিংহ’ লইয়া সবিশেষ আলোচনা হয় নাই। ১৮৯৪ খ্রীষ্টাব্দের ৮ এপ্রিল বঙ্কিমের মৃত্যু হয়, ‘রাজসিংহে’র পরিবর্ধিত চতুর্থ সংস্করণ বাহির হয় ১৮৯৩ সনের আগষ্ট মাসে, তৎপূর্ব্বে ইহা “ক্ষুদ্র কথা” বা ছোট গল্প মাত্র ছিল, বিশেষ আলোচনার বস্তু ছিল না। ‘বঙ্গদর্শনে’, প্রথম সংস্করণে, দ্বিতীয় সংস্করণে (১২৯২, পৃ. ৯০ ) এবং তৃতীয় সংস্করণে ‘রাজসিংহ’ ক্ষুদ্রাবয়ব ছিল; কোনও চরিত্রই বিকাশলাভ করে নাই। পরবর্ত্তী কালেও ‘রাজসিংহ’ লইয়া খুব বেশী সাহিত্যিক আলোচনা হয় নাই। যাহা হইয়াছে, তন্মধ্যে ১৩০০ বঙ্গাব্দের চৈত্র সংখ্যার (বঙ্কিমচন্দ্রের মৃত্যু-মাস) ‘সাধনা’য় প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথের “রাজসিংহ” (পৃ. ৪০২-৪১৬) প্রবন্ধটিই উল্লেখযোগ্য। অবশ্য সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষবশে অনেক আলোচনা হইয়াছে, সেগুলির উল্লেখ নিষ্প্রয়োজন।

বঙ্কিমচন্দ্রের সমসাময়িক সাহিত্যিকগণের মধ্যে ‘রাজসিংহে’র সামান্য উল্লেখ করিয়াছেন শ্রীশচন্দ্র মজুমদার মহাশয়। তাঁহার “বঙ্কিমবাবুর প্রসঙ্গ” ১৩০১ সালের ‘সাধনা’য় (শ্রাবণ, পৃ. ২৩৩-২৫২) প্রকাশিত হয়। তাহার এক স্থলে আছে (পৃ. ২৩৫)–

…কলিকাতায় প্রায় দুই বৎসর পরে [১২৮৫-১২৮৮ সাল] বঙ্কিম বাবুর সঙ্গে দেখা হয়, তখন তাঁর বাসা বহুবাজারে। আমি প্রিয় সুহৃৎ বাবু নগেন্দ্রনাথ গুপ্তের সঙ্গে মাঝে মাঝে তাঁর কাছে যাইতাম। “উদ্‌ভ্রান্ত-প্রেম” প্রণেতা বাবু চন্দ্রশেখর মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে এক দিন গিয়াছিলাম। “রাজসিংহ” তাহার কিছু দিন আগে বঙ্গদর্শনে ক্রমশঃ প্রকাশিত হইয়া বন্ধ হইয়া গিয়াছিল। চন্দ্রশেখর বাবু জিজ্ঞাসা করিলেন, তাহা সম্পূর্ণ করা হইতেছে না কেন? বঙ্কিম বাবু তাঁর কোন বন্ধুর নাম করিয়া বলিলেন, “এঁরা বলেন, আমার সৃষ্ট চরিত্রগুলিতে এখনকার ছেলে পুলে মাটি হইতেছে। তাই আর ডাকাত মাণিকলালকে আঁকিতে ইচ্ছা করে না।” …চন্দ্রশেখর বাবুতে এবং আমাতে একযোগে বলিলাম, মাণিকলালের মত ২|১টা ডাকাতের চিত্র দেশের সম্মুখে ধরিলে উপকার ভিন্ন অপকার হইবে না। এই কথায় বঙ্কিম বাবু কি ভাবিয়াছিলেন বলিতে পারি না, কিন্তু ইহার অল্প দিন পরে রাজসিংহের প্রথম সংস্করণ বাহির হইল।

রবীন্দ্রনাথ ‘রাজসিংহে’র ক্ষুদ্র সংস্করণ পড়েন নাই, একেবারেই পরিণত বয়সে পরিবর্দ্ধিত চতুর্থ সংস্করণ পড়িয়াছিলেন; পড়িয়া তাঁহার যাহা মনে হইয়াছিল, বাংলা সাহিত্যে সমালোচনার ক্ষেত্রে তাহা অক্ষয় হইয়া আছে। ‘সাধনা’য় প্রথম প্রকাশিত সেই প্রবন্ধ তাঁহার ‘আধুনিক-সাহিত্য’ পুস্তকে কিছু পরিবর্জ্জিত হইয়া মুদ্রিত হইয়াছে। সেই বর্জিত অংশ হইতেই উদ্ধৃত করিতেছি–

রাজসিংহের মধ্যে… অপরূপ রহস্য অবশ্যই কিছু আছে, তাহার সন্ধানের ভার আমি বিজ্ঞ সমালোচকদের উপর রাখিয়া দিলাম। আমি কেবল এইটুকু বলিতে চাহি, আমার হৃদয়ে যে সাহিত্যরস-পিপাসা আছে, এ গ্রন্থ পাঠে তাহার কতটা পরিতৃপ্তি হইল।…

আমি নিজেকে জেরা করিয়া অবশেষে একটা নূতন উপমা প্রাপ্ত হইয়াছি। … সাহিত্যরণরঙ্গ- ভূমে কোন মহারথী ভীমের মত গদাযুদ্ধ করেন, আবার কেহ বা সব্যসাচী অৰ্জ্জুনের মত কোদণ্ডে ক্ষিপ্রহস্ত। কেহ বা প্রকাণ্ড ভার লইয়া পাঠকের মস্তকের উপর নিপাতিত করেন, কেহ বা মুহূর্ত্তের মধ্যে পুচ্ছবান্ অসংখ্য লঘু শরসমূহে উক্ত নিরুপায় নিঃসহায় ব্যক্তির একেবারে মর্ম্মস্থল বিদ্ধ করিয়া ফেলেন।

সাহিত্য-কুরুক্ষেত্রে বঙ্কিম বাবু সেই মহাবীর অর্জুন। তাঁহার বিদ্যুদ্গামী শরজাল দশ দিক্‌ আচ্ছন্ন করিয়া ছুটিতেছে–তাহারা অত্যন্ত লঘু, কিন্তু লক্ষ্য বিদ্ধ করিতে মুহূর্ত্ত কাল বিলম্ব করে না।

রবীন্দ্রনাথের ‘আধুনিক-সাহিত্য’ হইতেই ‘রাজসিংহ’ সম্পর্কে তাঁহার মূল প্রশস্তি-অংশ উদ্ধৃত করিতেছি—

পৰ্ব্বত হইতে প্রথম বাহির হইয়া যখন নির্ঝরগুলা পাগলের মত ছুটিতে আরম্ভ করে, তখন মনে হয়, তাহারা খেলা করিতে বাহির হইয়াছে—মনে হয় না তাহারা কোনো কাজের। পৃথিবীতেও তাহারা গভীর চিহ্ন অঙ্কিত করিতে পারে না। কিছু দূর তাহাদের পশ্চাতে অনুসরণ করিলে দেখা যায়, নির্ঝরগুলা নদী হইতেছে—ক্রমেই গভীরতর হইয়া ক্রমেই প্রশস্ততর হইয়া পৰ্ব্বত ভাঙিয়া পথ কাটিয়া জয়ধ্বনি করিয়া মহাবলে অগ্রসর হইতেছে–সমুদ্রের মধ্যে মহাপরিণাম প্রাপ্ত হইবার পূর্ব্বে তাহার আর বিশ্রাম নাই।

রাজসিংহেও তাই। তাহার এক একটি খণ্ড এক একটি নির্ঝরের মত দ্রুত ছুটিয়া চলিয়াছে। প্রথম প্রথম তাহাতে কেবল আলোকের ঝিকিঝিকি এবং চঞ্চল লহরীর তরল কলধ্বনি—তাহার পর ষষ্ঠ খণ্ডে দেখি, ধ্বনি গম্ভীর, স্রোতের পথ গভীর এবং জলের বর্ণ ঘনকৃষ্ণ হইয়া আসিতেছে, তাহার পর সপ্তম খণ্ডে দেখি, কতক বা নদীর স্রোত, কতক বা সমুদ্রের তরঙ্গ, কতক বা অমোঘ পরিণামের মেঘগভীর গর্জ্জন, কতক বা তীব্র লবণাশ্ৰুনিমগ্ন হৃদয়ের সুগভীর ক্রন্দনোচ্ছ্বাস, কতক বা ব্যক্তিবিশেষের মজ্জমান তরণীর প্রাণপণ হাহাধ্বনি। সেখানে নৃত্য অতিশয় রুদ্র, ক্রন্দন অতিশয় তীব্র এবং ঘটনাবলী ভারত-ইতিহাসের একটি যুগাবসান হইতে যুগান্তরের দিকে ব্যাপ্ত হইয়া গিয়াছে।

পরবর্ত্তী কালে শ্রীঅক্ষয়কুমার দত্তগুপ্ত মহাশয় ‘বঙ্কিমচন্দ্র’ (১৩২৭) পুস্তকে ( পৃ. ২৯৮- ৩০৭) ও শ্রী শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় তাঁহার ‘বঙ্গসাহিত্যে উপন্যাসের ধারা’ (১৯৩৯) পুস্তকে (পৃ. ১৪২-১৫২) ‘রাজসিংহ’ সম্বন্ধে যে আলোচনা করিয়াছেন, তাহাও উল্লেখযোগ্য।

‘রাজসিংহে’র কোনও ভাষায় কোনও অনুবাদ হইয়াছে বলিয়া আমাদের জানা নাই।